একই পদ, ভিন্ন গ্রেড : প্রশাসনিক বৈষম্য নাকি কাঠামোগত জটিলতা?
দেশের প্রশাসনিক ও সেবা কাঠামোতে বর্তমানে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একই অফিস, একই বিভাগ, এমনকি একই পদবি হওয়া সত্ত্বেও কর্মীদের মধ্যে বেতন গ্রেডের বিশাল ব্যবধান বিদ্যমান। আপাতদৃষ্টিতে এটি অস্বাভাবিক মনে হলেও, স্বাস্থ্য ক্যাডার, বিচার বিভাগ এবং গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে এটি এখন নিত্যনৈমিত্তিক চিত্র। এই গ্রেড বৈষম্য একদিকে যেমন কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করছে, অন্যদিকে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন এই বৈষম্য?
একই পদে ভিন্ন ভিন্ন গ্রেড থাকার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:
-
সরাসরি নিয়োগ বনাম পদোন্নতি: অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একজন নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যে গ্রেডে যোগদান করছেন, একই পদে দীর্ঘ দিন কর্মরত অন্য একজন কর্মী পদোন্নতি পেয়ে একই পদবিতে অবস্থান করছেন। কিন্তু জ্যেষ্ঠতা ও অভিজ্ঞতার কারণে তাদের গ্রেড ভিন্ন হয়।
-
ক্যাডার ও টেকনিক্যাল জটিলতা: বিশেষ করে স্বাস্থ্য ক্যাডারে টেকনিক্যাল ও জেনারেল শাখার কর্মকর্তাদের মধ্যে এই পার্থক্য প্রকট। ১৪-১৫ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন কর্মকর্তা এবং একজন নবাগত কর্মকর্তার পদবি এক হলেও তাদের বেতন গ্রেডে ইনসাফ বা সামঞ্জস্য থাকছে না।
-
প্রতিষ্ঠানিক কাঠামো: গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর বা জজ কোর্টের মতো জায়গাগুলোতে পদবি ও গ্রেড নির্ধারণের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের পুরনো বিধিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে, যা বর্তমান সময়ের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়।
ভিন্ন ভিন্ন খাতের চিত্র
বিভাগীয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সমস্যাটি কোনো একটি নির্দিষ্ট দপ্তরে সীমাবদ্ধ নয়:
| দপ্তর/বিভাগ | সমস্যার ধরন |
| স্বাস্থ্য ক্যাডার | টেকনিক্যাল ও জেনারেল কর্মকর্তাদের পদবি এক হলেও কাজের পরিধি ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গ্রেডে বড় পার্থক্য। |
| বিচার বিভাগ | জজ কোর্টগুলোতে একই প্রশাসনিক পদে থাকা ব্যক্তিদের বেতন গ্রেড ও সুযোগ-সুবিধার মাঝে অসঙ্গতি। |
| গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর | পদোন্নতি ও নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে গ্রেড নির্ধারণের জটিলতা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে। |
অসন্তোষ ও দীর্ঘদিনের আন্দোলন
এই গ্রেড বৈষম্য নিরসনের দাবিতে সরকারি কর্মচারীরা দীর্ঘ দিন ধরেই আন্দোলন ও সংগ্রাম করে আসছেন। ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের দাবি, “একই পদে কাজ করে ভিন্ন ভিন্ন গ্রেড পাওয়া শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং এটি পেশাদারিত্বের অবমাননা।” বিশেষ করে যারা ১০ থেকে ১৫ বছর আগে চাকরিতে যোগদান করেছেন, তাদের এবং নতুনদের গ্রেড যখন কাছাকাছি চলে আসে বা বৈষম্যমূলক হয়, তখন কর্মস্পৃহা নষ্ট হওয়া স্বাভাবিক।
সমাধানের অপেক্ষায় “যুগান্তকারী পদক্ষেপ”
সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন সময় এই জটিলতা নিরসনের আশ্বাস দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সরকারই স্থায়ী বা যুগান্তকারী সমাধান দিতে পারেনি। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সংকট নিরসনে নিচের পদক্ষেপগুলো জরুরি:
-
অভিন্ন গ্রেড কাঠামো: একই পদের জন্য একটি নির্দিষ্ট গ্রেড সীমা নির্ধারণ করা।
-
বিধিমালা সংশোধন: যুগোপযোগী নিয়োগ ও পদোন্নতি বিধিমালা প্রণয়ন।
-
সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টি: জ্যেষ্ঠতা অনুযায়ী গ্রেড উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
“পদের নাম এক হলে বেতন ও মর্যাদার ভিত্তিও এক হওয়া উচিত। অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন গ্রেডের মাধ্যমে হওয়া যেমন জরুরি, তেমনি একই পদে থেকেও বিশাল বৈষম্য থাকাটা প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের বহিঃপ্রকাশ।”
যতক্ষণ না পর্যন্ত সরকার এই পদবি ও গ্রেড জটিলতা নিরসনে শক্ত পদক্ষেপ নিচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে এই অসন্তোষ ও কাজের স্থবিরতা কাটানো সম্ভব হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।

