Latest News

বাজেটে আসছে খুচরা ব্যবসার জন্য টার্নওভার ট্যাক্স, করের আওতায় আসতে পারে ৩ কোটি প্রতিষ্ঠান

দেশের দীর্ঘদিনের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রথমবারের মতো খুচরা ব্যবসার জন্য নামমাত্র টার্নওভার ট্যাক্স চালুর প্রস্তাব রাখা হচ্ছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ৩ কোটি খুচরা দোকান ও ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কর নেটওয়ার্কের আওতায় আসতে পারে বলে আশা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

কী থাকছে নতুন ব্যবস্থায়

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় উৎপাদনকারী ও ডিলার প্রতিষ্ঠানগুলো খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে পণ্য সরবরাহের সময় বিলের ওপর ০.২ শতাংশ হারে কর উৎসে কেটে রাখবে। অর্থাৎ কোনো খুচরা ব্যবসায়ী যদি ১ হাজার টাকার পণ্য ক্রয় করেন, তাহলে ২ টাকা কর হিসেবে কেটে সরকারের কোষাগারে জমা হবে।

এই কর সংগ্রহ প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল করতে মোবাইল অ্যাপভিত্তিক ই-চালান (এ-চালান) ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে। ফলে ব্যবসায়ীদের কর প্রদানের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষিত হবে।

এসএমএসে মিলবে করের তথ্য

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, খুচরা ব্যবসায়ীরা প্রতি তিন মাস অন্তর মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে জানতে পারবেন তাদের নামে কত টাকা কর জমা হয়েছে। এর মাধ্যমে তারা সহজেই বুঝতে পারবেন তাদের আয় করযোগ্য সীমায় পৌঁছেছে কি না।

কর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, এটি একদিকে করদাতাদের জন্য স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে কর প্রশাসনের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলবে।

ভারতের মডেল অনুসরণ

কর কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন এই ব্যবস্থা অনেকটা ভারতের সফল অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছে। ভারতে সরবরাহ শৃঙ্খলের উচ্চ স্তরে কর সংগ্রহের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ও অনানুষ্ঠানিক ব্যবসায়ীকে কর নেটওয়ার্কের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।

বাংলাদেশেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করে করদাতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো এবং রাজস্বভিত্তি সম্প্রসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

করের বাইরে বিশাল অর্থনীতি

ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি খুচরা দোকান ও ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর অধিকাংশই এখন পর্যন্ত আয়কর নেটওয়ার্কের বাইরে রয়েছে।

ফলে অর্থনীতির একটি বড় অংশের লেনদেন সরকারি কর ব্যবস্থায় প্রতিফলিত হয় না। নতুন টার্নওভার ট্যাক্স চালু হলে অন্তত এসব ব্যবসার ক্রয়-বিক্রয় সম্পর্কিত একটি প্রাথমিক তথ্যভাণ্ডার তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে কর প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়ার মতে, উৎস পর্যায়ে কর সংগ্রহের এই পদ্ধতি দেশের কর নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি বলেন, খুচরা ব্যবসায়ীদের ক্রয়ের তথ্য নথিভুক্ত হওয়ার ফলে তাদের প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও সম্ভাব্য আয়ের একটি ধারণা পাওয়া যাবে। এর ফলে বড় করপোরেট সুপারশপ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে কর পরিপালনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্যও কিছুটা কমবে।

তার মতে, এই তথ্যভাণ্ডার ভবিষ্যতে ভ্যাট প্রশাসনের জন্যও সহায়ক হবে। কারণ এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে খুচরা ব্যবসাগুলোকে ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় আনা সহজ হবে এবং সামগ্রিক রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাবে।

ভোক্তা পর্যায়ে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা

তবে অর্থনীতিবিদ ও কর বিশেষজ্ঞরা কিছু ঝুঁকির বিষয়েও সতর্ক করেছেন। তাদের মতে, যদি উৎসে কর কেটে রাখার কারণে অতিরিক্ত প্রশাসনিক বা আর্থিক চাপ উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর পড়ে, তাহলে সেই ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে যোগ হতে পারে।

এতে ভোক্তাদের ওপর মূল্যস্ফীতির অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই নতুন ব্যবস্থা বাস্তবায়নের সময় বাজার পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য প্রভাব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

সরকারের প্রত্যাশা

এনবিআর কর্মকর্তারা মনে করছেন, করের হার অত্যন্ত কম হওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে এ নিয়ে বড় ধরনের আপত্তি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বরং এটি ধাপে ধাপে দেশের বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনার একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনাটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের করদাতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, রাজস্ব আহরণ শক্তিশালী হবে এবং অর্থনীতির বৃহৎ অনানুষ্ঠানিক খাত ধীরে ধীরে একটি নথিভুক্ত ও স্বচ্ছ কাঠামোর মধ্যে চলে আসবে।

সোর্স কালেরকন্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *