অফিসে সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত হলে কী করবেন? সৎ কর্মচারীদের জন্য করণীয় জানালেন বিশেষজ্ঞরা
একটি প্রতিষ্ঠানে যদি অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকেন, তাহলে একজন সৎ কর্মচারীর জন্য দায়িত্ব পালন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিবেশে নৈতিকতা বজায় রাখা, নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনি ঝুঁকি এড়িয়ে চলা—সবকিছুই হয়ে ওঠে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্নীতিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করলেও একজন সৎ কর্মচারীর উচিত আইন, বিধি-বিধান ও নৈতিকতার সীমার মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করা। অন্যদের অনিয়মে অংশ না নেওয়া এবং নিজের অবস্থান স্পষ্ট রাখা দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে।
সততা বজায় রাখাই প্রথম দায়িত্ব
বিশেষজ্ঞদের মতে, অফিসে অন্যরা দুর্নীতি করলেও একজন কর্মচারীর নিজের সততা থেকে বিচ্যুত হওয়া উচিত নয়। কারণ অন্যের অপরাধ কখনোই নিজের অপরাধকে বৈধতা দেয় না। সরকারি কিংবা বেসরকারি—যে কোনো প্রতিষ্ঠানে একজন কর্মচারী ব্যক্তিগতভাবে তার নিজের কাজের জন্য দায়বদ্ধ।
নৈতিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি সব ধরনের প্রশাসনিক ও আর্থিক কাজ নিয়ম অনুযায়ী সম্পন্ন করাই একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার অন্যতম কর্তব্য।
সব কাজের লিখিত রেকর্ড সংরক্ষণ জরুরি
দুর্নীতিগ্রস্ত পরিবেশে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো নির্দোষ ব্যক্তিকে দায়ী করার চেষ্টা। এজন্য প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা, নোটশিট, ই-মেইল, অফিস আদেশ বা ফাইলের কপি সংরক্ষণ করার পরামর্শ দিয়েছেন প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞরা।
কোনো ফাইলে স্বাক্ষর করার আগে সেটি ভালোভাবে পড়ে দেখা, প্রয়োজন হলে লিখিত মতামত দেওয়া এবং অস্পষ্ট নির্দেশনা সম্পর্কে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া ভবিষ্যতে আইনি সুরক্ষা দিতে পারে।
সন্দেহজনক নথিতে স্বাক্ষরের আগে সতর্কতা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো আর্থিক অনিয়ম, ভুয়া বিল, জাল কাগজপত্র কিংবা নিয়মবহির্ভূত সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন নথিতে না বুঝে স্বাক্ষর করা উচিত নয়।
প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বিধি, আইন কিংবা দপ্তরের নীতিমালা যাচাই করে মতামত দেওয়া উচিত। এতে পরবর্তীতে জবাবদিহির সময় নিজের অবস্থান স্পষ্ট করা সহজ হয়।
দুর্নীতির তথ্য থাকলে প্রমাণ সংরক্ষণ করুন
যদি কোনো কর্মচারী নিশ্চিতভাবে দুর্নীতির তথ্য জানতে পারেন, তাহলে তা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। তবে প্রমাণ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও অবশ্যই প্রচলিত আইন ও প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনুমান বা গুজবের ভিত্তিতে অভিযোগ না করে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়াই দায়িত্বশীল আচরণ।
প্রথমে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাকে ব্যবহার করুন
যদি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বা নির্ধারিত অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা কার্যকর থাকে, তাহলে গোপনীয়তা বজায় রেখে বিষয়টি তাদের জানানো যেতে পারে।
অনেক সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ গ্রহণের জন্য কমপ্লায়েন্স ইউনিট, অভ্যন্তরীণ অডিট বিভাগ কিংবা হুইসেলব্লোয়ার ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে অভিযোগ করলে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের সুযোগ তৈরি হয়।
প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করুন
যদি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় কোনো প্রতিকার না পাওয়া যায় এবং গুরুতর দুর্নীতির বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য থাকে, তাহলে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা যেতে পারে।
বাংলাদেশে দুর্নীতি সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিভিন্ন মাধ্যমে অভিযোগ গ্রহণ করে। অভিযোগ করার আগে তথ্যের সত্যতা ও আইনগত বিষয়গুলো যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও পেশাগত ভবিষ্যৎ বিবেচনা করুন
দুর্নীতিগ্রস্ত পরিবেশে অনেক সময় সৎ কর্মচারীরা মানসিক চাপ, হয়রানি কিংবা প্রতিহিংসামূলক আচরণের শিকার হতে পারেন। তাই নিজের নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা এবং পেশাগত ভবিষ্যৎকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
যদি দেখা যায় পুরো কর্মপরিবেশই দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মনির্ভর এবং সেখানে সৎভাবে দায়িত্ব পালন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে, তাহলে বিকল্প কর্মসংস্থানের বিষয়টিও বিবেচনা করা বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
প্রশাসন ও সুশাসন বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্নীতিপূর্ণ পরিবেশে একজন সৎ কর্মচারীর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আইনের প্রতি শ্রদ্ধা, লিখিত নথির সুরক্ষা এবং পেশাগত সততা। তাৎক্ষণিকভাবে নানা চাপের মুখে পড়তে হলেও দীর্ঘমেয়াদে সততা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তাদের ভাষ্য, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই শুধু একজন ব্যক্তির দায়িত্ব নয়; বরং কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের মাধ্যমেই একটি প্রতিষ্ঠানে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

