সবার জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ ২০২৬ । স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর?
দেশের প্রতিটি নাগরিকের মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড করার লক্ষ্যে অবিলম্বের ‘ই-হেলথ কার্ড’ (e-Health Card) চালুর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (৪ মার্চ) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় তিনি এই নির্দেশনা প্রদান করেন।
ই-হেলথ কার্ডের সুবিধা ও বৈশিষ্ট্য
সভায় জানানো হয়, এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিকের একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্রোফাইল তৈরি করা হবে। এর প্রধান সুবিধাগুলো হলো:
-
কেন্দ্রীভূত চিকিৎসা রেকর্ড: কার্ডে রোগীর নাম, বয়স, রক্তের গ্রুপসহ সম্পূর্ণ পূর্ববর্তী চিকিৎসার ইতিহাস সংরক্ষিত থাকবে। ফলে দেশের যেকোনো প্রান্তের হাসপাতাল বা ডাক্তার দ্রুত রোগীর শারীরিক অবস্থা বুঝতে পারবেন।
-
জরুরি চিকিৎসায় গতি: কার্ডের মাধ্যমে রোগীর পূর্বের অপারেশন, অ্যালার্জি বা নিয়মিত ঔষধের তথ্য তাৎক্ষণিক পাওয়ায় জরুরি মুহূর্তে ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি কমবে।
-
রেফারেল নেটওয়ার্ক: জেলা পর্যায়ের জেনারেল হাসপাতাল থেকে শুরু করে মেডিকেল কলেজ পর্যন্ত একটি সমন্বিত ডিজিটাল রেফারেল সিস্টেম গড়ে তোলা হবে।
পরিত্যক্ত ভবন হবে স্বাস্থ্যকেন্দ্র
প্রধানমন্ত্রী দেশের পরিত্যক্ত সরকারি ভবনগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোকে সংস্কারের মাধ্যমে ক্লিনিক বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রূপান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন। জানানো হয়েছে, শুধুমাত্র এলজিইডি-র অধীনেই প্রায় ১৭০টি এমন অব্যবহৃত ভবন রয়েছে। এসব ভবনকে দ্রুত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে এনে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসায় ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
১ লক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ ও শূন্যপদ পূরণ
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশের স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরণের জনবল নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সভায় আলোচনার ভিত্তিতে জানা যায়:
-
নতুন নিয়োগ: শীঘ্রই ১ লক্ষ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে, যার মধ্যে ৮০ শতাংশ নারী এবং ২০ শতাংশ পুরুষ থাকবেন।
-
চিকিৎসক নিয়োগ: স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা চিকিৎসকদের প্রায় ৭৪ হাজার শূন্যপদ দ্রুত পূরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
-
প্রান্তিক সেবা: দুর্গম ও গ্রামীণ অঞ্চলের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন।
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও অর্থায়ন
দেশের বর্তমান জন্মহার (বছরে প্রায় ৩৪ লক্ষ শিশু) নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আরও সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দেন। এই ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্রকল্প বাস্তবায়নে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করবে বলে সভায় জানানো হয়।
সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ই-হেলথ কার্ড কি সবার জন্যই প্রযোজ হবে?
হ্যাঁ, সরকারি নির্দেশনা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী ‘ই-হেলথ কার্ড’ (e-Health Card) দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্যই প্রযোজ্য হবে। এটি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা শ্রেণির জন্য নয়, বরং ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার ডিজিটাল স্বাস্থ্য রেকর্ড সংরক্ষণের একটি মাধ্যম।
আপনার বোঝার সুবিধার্থে এর কার্যকারিতা ও ব্যাপ্তি নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা: সরকারের লক্ষ্য হলো দেশের প্রতিটি মানুষের একটি নিজস্ব ‘ডিজিটাল হেলথ প্রোফাইল’ তৈরি করা। ফলে একজন সাধারণ নাগরিক গ্রাম থেকে ঢাকা বা অন্য কোনো বড় শহরে চিকিৎসা নিতে গেলেও তার আগের সব পরীক্ষার রিপোর্ট বা প্রেসক্রিপশন এই কার্ডের মাধ্যমে ডাক্তার দেখতে পাবেন।
২. জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত রেকর্ড: নবজাতক শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ—সবার জন্যই এই কার্ড করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে টিকা দেওয়ার ইতিহাস থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদী রোগের তথ্যও সংরক্ষিত থাকবে।
৩. সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল: প্রাথমিকভাবে এটি সরকারি হাসপাতালগুলোতে বাধ্যতামূলক করার কথা থাকলেও, ধীরে ধীরে দেশের সকল বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিককেও এই সিস্টেমের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
৪. NID বা জন্ম নিবন্ধনের সাথে সংযোগ: সাধারণত এটি জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা জন্ম নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে ইস্যু করা হবে, যাতে প্রতিটি ব্যক্তির তথ্য অনন্য (Unique) থাকে।
সহজ কথায়, এটি আপনার ভোটার আইডি কার্ডের মতোই একটি পরিচয়পত্র, যা শুধুমাত্র আপনার স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্যের জন্য ব্যবহৃত হবে এবং দেশের যেকোনো প্রান্তে উন্নত ও দ্রুত চিকিৎসা পেতে সহায়তা করবে।

