সেপ্টেম্বরের মধ্যে নবম পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারির দাবি, না হলে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি
আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে নবম জাতীয় পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি এবং তা বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে সারাদেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে পরামর্শ করে আইনসম্মত, শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে সংগঠনটি।
রোববার (১২ জুলাই) বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আব্দুল মালেক এবং সদস্য সচিব মো. আশিকুল ইসলামের পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে এ দাবি ও কর্মসূচির কথা জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো ঘোষণার বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন ধরনের আশ্বাস দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় চাকরিজীবীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। নতুন জাতীয় পে-স্কেলের পরিবর্তে অন্য কোনো সাময়িক আর্থিক সুবিধা দিয়ে মূল দাবিকে আড়াল করার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও সংগঠনটি স্পষ্ট করেছে।
‘আর আশ্বাস নয়, দৃশ্যমান সিদ্ধান্ত প্রয়োজন’
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আব্দুল মালেক বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দীর্ঘ ১১ বছর ধরে নতুন জাতীয় বেতন কাঠামোর জন্য ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করছেন। বর্তমান বাস্তবতায় আর আশ্বাস নয়, সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ও কার্যকর সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
তিনি বলেন, কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি বাস্তবায়নে সরকারের সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে বলে তারা বিশ্বাস করেন। আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যেই নবম জাতীয় পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার অবসান ঘটানোর দাবি জানান তিনি।
বর্তমানে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যমান বেতন কাঠামোর আওতায় অনেক সরকারি কর্মচারী, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের চাকরিজীবীরা আর্থিক চাপের মুখে রয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে নতুন ও সময়োপযোগী বেতন কাঠামো ঘোষণার দাবি আরও জোরালো হয়ে উঠছে।
আইএমএফের শর্ত নিয়ে সরকারের স্পষ্ট অবস্থান চায় সংগঠন
আব্দুল মালেক বলেন, সম্প্রতি বিভিন্ন মহলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত কিংবা দেশের অর্থনৈতিক চাপের কারণে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন বিলম্বিত হতে পারে—এমন আলোচনা চলছে।
তবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামো নির্ধারণ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নিজস্ব নীতিগত সিদ্ধান্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে কোনো বিভ্রান্তি থাকলে সরকারের উচিত স্পষ্ট অবস্থান জানানো।
দীর্ঘসূত্রতার কোনো অজুহাত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আর মেনে নিতে প্রস্তুত নন বলেও মন্তব্য করেন সংগঠনটির আহ্বায়ক।
‘রেশন সুবিধা পে-স্কেলের বিকল্প নয়’
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সদস্য সচিব মো. আশিকুল ইসলাম বলেন, সরকারি কর্মচারীদের জন্য রেশন সুবিধা প্রয়োজন হতে পারে এবং এ ধরনের উদ্যোগ চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। তবে কোনো অবস্থাতেই রেশন সুবিধাকে নবম জাতীয় পে-স্কেলের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রধান দাবি হচ্ছে দ্রুত নবম জাতীয় পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি এবং নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করা।
নতুন বেতন কাঠামো কবে থেকে কার্যকর হবে, বেতন নির্ধারণ বা পে-ফিক্সেশন কীভাবে সম্পন্ন হবে, বকেয়া আর্থিক সুবিধা কীভাবে দেওয়া হবে এবং পেনশনভোগীরা কী ধরনের সুবিধা পাবেন—এসব বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রকাশের দাবি দীর্ঘদিন ধরেই জানিয়ে আসছেন সরকারি চাকরিজীবীরা।
সরকারকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দিতে চায় সংগঠন
সংগঠনের সদস্য সচিব বলেন, তারা সরকারকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত সময় দিতে চান। এর মধ্যে নবম জাতীয় পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি না হলে সারাদেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শ করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
তিনি জানান, সম্ভাব্য কর্মসূচি হবে আইনসম্মত, শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক। সংগঠনের লক্ষ্য সরকারের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানো নয়; বরং নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি আদায় করা।
এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের আন্দোলনে নতুন সময়সীমা সামনে এলো। সেপ্টেম্বরের মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান সিদ্ধান্ত না এলে পে-স্কেল ইস্যুতে সারাদেশে নতুন কর্মসূচি শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে নতুন বেতন কাঠামোর দাবি
সংগঠনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বর্তমান জীবনযাত্রার বাস্তবতা বিবেচনায় দ্রুত একটি বৈষম্যহীন ও সময়োপযোগী জাতীয় বেতন কাঠামো ঘোষণা করা প্রয়োজন।
সরকারি চাকরিজীবীদের দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে নতুন পে-স্কেল ঘোষণা না হওয়ায় বিদ্যমান বেতন কাঠামোর প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীরা আর্থিক চাপে পড়েছেন।
এ কারণে নতুন পে-স্কেল নির্ধারণের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের ব্যবধান কমানো, নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন যৌক্তিক হারে বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন কাঠামো নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি উঠছে।
সেপ্টেম্বর ঘিরে বাড়ছে প্রত্যাশা
নবম জাতীয় পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারির দাবিতে বিভিন্ন সরকারি কর্মচারী সংগঠনের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সর্বশেষ বিবৃতির মাধ্যমে এবার সেপ্টেম্বর মাসকে কেন্দ্র করে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা সামনে আনা হয়েছে।
এখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নজর সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। সেপ্টেম্বরের মধ্যে নবম জাতীয় পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি ও বাস্তবায়নের রোডম্যাপ ঘোষণা করা হবে, নাকি দাবির পক্ষে নতুন কর্মসূচিতে নামবেন সরকারি চাকরিজীবীরা—সেটিই এখন সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
তবে সংগঠনটির বক্তব্য স্পষ্ট—রেশন সুবিধা বা অন্য কোনো সাময়িক আর্থিক সুবিধা দিয়ে নতুন জাতীয় বেতন কাঠামোর দাবি প্রতিস্থাপন করা যাবে না। সেপ্টেম্বরের মধ্যে দৃশ্যমান সিদ্ধান্ত না এলে নবম পে-স্কেলের দাবিতে আইনসম্মত ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পথে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হবে।

