১ জুলাই থেকে শুরু হচ্ছে ৯ম জাতীয় পে স্কেল, তিন ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে আলোর মুখ দেখছে নবম জাতীয় বেতন কাঠামো (পে স্কেল)। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন অর্থাৎ ১ জুলাই থেকেই এই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার নীতিগত সিদ্ধান্ত দিয়েছে সরকার। তবে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনা করে এটি একযোগে নয়, বরং তিনটি ভিন্ন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এই সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানান, ১ জুলাই থেকে নতুন পে স্কেল চালুর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নীতিগত অনুমোদন দিয়েছেন এবং আসন্ন বাজেটে এর জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।
তিন ধাপে বাস্তবায়নের কর্মপরিকল্পনা
অর্থ মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নবম জাতীয় পে স্কেল পুরোপুরি কার্যকর করতে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এছাড়া পেনশনভোগীদের পেছনে বাড়তি ব্যয় হবে আরও ২৫Offset হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল আর্থিক চাপ সামাল দিতে সরকার কৌশলগতভাবে তিন বছরের একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে:
-
প্রথম ধাপ (২০২৬-২৭ অর্থবছর): নতুন বেতন কাঠামোর অধীন বর্ধিত মূল বেতনের (Basic Salary) ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হবে। এজন্য আসন্ন বাজেটে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তুতি চলছে।
-
দ্বিতীয় ধাপ (২০২৭-২৮ অর্থবছর): মূল বেতনের বাকি ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হবে।
-
তৃতীয় ধাপ (২০২৮-২৯ অর্থবছর): মূল বেতনের সাথে বিভিন্ন আনুষঙ্গিক ভাতা (বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ইত্যাদি) এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধাগুলো পুরোপুরি সমন্বয় বা যুক্ত করা হবে।
প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো ও গ্রেডবিন্যাস
নতুন প্রস্তাবিত কাঠামোতে বর্তমানে প্রচলিত ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হচ্ছে। তবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সাথে সংগতি রেখে প্রতিটি গ্রেডে বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, নতুন স্কেলে সার্বিকভাবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে।
| বিবরণ | বর্তমান কাঠামো (৮ম পে স্কেল) | প্রস্তাবিত নতুন কাঠামো (৯ম পে স্কেল) |
| সর্বনিম্ন মূল বেতন (২০তম গ্রেড) | ৮,২৫০ টাকা | ২০,০০০ টাকা |
| সর্বোচ্চ মূল বেতন (১ম গ্রেড) | ৭৮,০০০ টাকা | ১,৬০,০০০ টাকা |
কারা সুবিধা পাবেন?
প্রায় ১১ বছর পর কার্যকর হতে যাওয়া এই নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় দেশের প্রায় ১৪ লাখ কর্মরত সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগ ও বিভিন্ন বাহিনীর চাকরিজীবীরা সরাসরি উপকৃত হবেন। এছাড়া প্রায় ৯ লাখ অবসরভোগী বা পেনশনারও এর আর্থিক সুফল পাবেন।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর বক্তব্য: > “আমাদের বাজেটের সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বেশ কঠিন। জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আহরণের অবস্থাও পুরোপুরি সন্তোষজনক নয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে কাটছাঁট করতে হচ্ছে। তারপরও সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান ও আর্থিক সুরক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে এই পে স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও পরবর্তী পদক্ষেপ
দীর্ঘদিন পর পে স্কেল ঘোষণার সিদ্ধান্তে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আনন্দের হাওয়া বইলেও তিন ধাপে বাস্তবায়নের কৌশল নিয়ে কিছু মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কর্মচারীদের একটি পক্ষ দাবি তুলছেন, ধাপে ধাপে না করে এক ধাপেই যেন পূর্ণাঙ্গ গেজেট প্রকাশ করা হয়, যাতে বাজারে দ্রব্যমূল্যের বাড়তি প্রভাব তৈরি না হতে পারে।
তবে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্রগুলো বলছে, আগামী ২১ মে এই বাস্তবায়ন কমিটির একটি চূড়ান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে কাঠামোটি আরও পর্যালোচনা করা হবে এবং আগামী ৭ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট পেশকালে অর্থমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে এর বিস্তারিত রূপরেখা ঘোষণা করবেন।

