অনলাইনে পণ্য বিক্রিতে নতুন ভ্যাট নির্দেশনা জারি, কমিশনের ওপর ১৫% ভ্যাট পরিশোধের বিধান
দেশে দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়া অনলাইন বাণিজ্য খাতের ভ্যাট ব্যবস্থাপনা আরও স্পষ্ট ও সুশৃঙ্খল করতে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বৃহস্পতিবার জারি করা এক সাধারণ আদেশে অনলাইন পণ্য বিক্রয় সেবার ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজন কর (মূসক/ভ্যাট) আদায় ও পরিশোধ সংক্রান্ত বিস্তারিত দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
এনবিআরের ভ্যাট বিভাগের জারি করা এ আদেশে অনলাইন খুচরা বিক্রেতা এবং মার্কেটপ্লেস—এই দুই ধরনের ব্যবসায়িক মডেলের ভ্যাট দায়বদ্ধতা পৃথকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এর ফলে ই-কমার্স খাতে দীর্ঘদিনের কিছু অস্পষ্টতা দূর হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনলাইন খুচরা বিক্রয় বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ইলেকট্রনিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে এমন সব পণ্য বা সেবার ক্রয়-বিক্রয়কে “অনলাইন খুচরা বিক্রয়” হিসেবে গণ্য করা হবে, যা পূর্বেই উৎপাদক, সরবরাহকারী বা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে করযোগ্যভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং পরে অনলাইনের মাধ্যমে ভোক্তার কাছে সরবরাহ করা হয়।
এ ক্ষেত্রে অনলাইন বিক্রেতার নিজস্ব কোনো বিক্রয়কেন্দ্র নাও থাকতে পারে। তবে তাকে পণ্য ক্রয় ও সরবরাহের যথাযথ কর নথিপত্র সংরক্ষণ করতে হবে।
অনলাইন খুচরা বিক্রেতাদের জন্য কী নির্দেশনা?
এনবিআরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অনলাইন খুচরা বিক্রেতারা মূলত একটি বিক্রয় চ্যানেল (Sales Channel) হিসেবে কাজ করে। তারা উৎপাদক বা সরবরাহকারীর কাছ থেকে ভ্যাট ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সম্পূরক শুল্ক পরিশোধপূর্বক পণ্য সংগ্রহ করে ভোক্তার কাছে বিক্রি করে।
এ কারণে একই পণ্যের ওপর পুনরায় সম্পূর্ণ মূল্যের ভিত্তিতে ভ্যাট আরোপ করা হলে দ্বৈত করের (Double Taxation) ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এজন্য অনলাইন খুচরা বিক্রেতাদের ক্ষেত্রে আইনের তৃতীয় তফসিল অনুযায়ী মূল্য সংযোজনের ওপর ৭.৫ শতাংশ হারে ভ্যাট পরিশোধের বিধান প্রযোজ্য হবে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, অনলাইন বিক্রেতাদের পণ্যের সংখ্যা অত্যধিক হওয়ায় তাদের জন্য উপকরণ-উৎপাদ সহগ (মূসক-৪.৩) দাখিল বাধ্যতামূলক নয়।
তবে ক্রয় ও সরবরাহ সংক্রান্ত মূসক চালানপত্র বা ট্রেজারি চালানের কপি অনলাইনে সংরক্ষণ করতে হবে এবং প্রয়োজনে তা প্রদর্শন করতে হবে।
মার্কেটপ্লেসের ক্ষেত্রে ভ্যাট কীভাবে নির্ধারিত হবে?
নির্দেশনায় মার্কেটপ্লেসকে এমন একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যেখানে এক বা একাধিক বিক্রেতা তাদের পণ্য বা সেবা প্রদর্শন করেন এবং ক্রেতারা সেই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে লেনদেন সম্পন্ন করেন।
এক্ষেত্রে মার্কেটপ্লেস নিজে পণ্যের মালিক নয় এবং সরাসরি পণ্য ক্রয় বা বিক্রয় করে না। তারা মূলত বিক্রেতা ও ক্রেতার মধ্যে সংযোগকারী বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে।
এনবিআর বলেছে, মার্কেটপ্লেস পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে তাদের কমিশন বা সেবামূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ ভ্যাট নির্ধারণের ভিত্তি হবে কমিশন আয়, পণ্যের মোট বিক্রয়মূল্য নয়।
কৃষিপণ্য ও নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে কি?
আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রথম তফসিলভুক্ত ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্য—যেমন শাকসবজি, মাছ, চাল, ডাল, মাংস ইত্যাদি—গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে যদি কোনো সেবামূল্য বা কমিশন গ্রহণ করা হয়, তাহলে সেই সেবামূল্য বা কমিশনের ওপরও ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রযোজ্য হবে।
অর্থাৎ পণ্যটি ভ্যাটমুক্ত হলেও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সেবার বিপরীতে প্রাপ্ত কমিশন ভ্যাটের আওতায় থাকবে।
ভ্যাট ফাঁকি রোধে তথ্য সরবরাহ বাধ্যতামূলক
এনবিআর আরও জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট মূসক কর্মকর্তার চাহিদা অনুযায়ী মার্কেটপ্লেস পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারী ক্রেতা ও বিক্রেতাদের লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করতে হবে।
এ পদক্ষেপের মাধ্যমে অনলাইন বাণিজ্যে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, রাজস্ব আহরণ নিশ্চিতকরণ এবং কর ফাঁকি রোধ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
পূর্বের ব্যাখ্যা বাতিল
নতুন আদেশ জারির মাধ্যমে ২০১৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জারি করা অনলাইন পণ্য বিক্রয় সংক্রান্ত পূর্ববর্তী ব্যাখ্যাপত্র বাতিল করা হয়েছে। ফলে এখন থেকে অনলাইন খুচরা বিক্রেতা ও মার্কেটপ্লেস পরিচালনাকারীদের নতুন নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
ই-কমার্স খাতের জন্য গুরুত্ব
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের ই-কমার্স খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও ভ্যাট ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে কিছু অস্পষ্টতা ছিল। নতুন এই নির্দেশনা অনলাইন বিক্রেতা, মার্কেটপ্লেস এবং কর প্রশাসনের মধ্যে দায়বদ্ধতার সীমারেখা পরিষ্কার করবে। একই সঙ্গে কমিশনভিত্তিক আয়ের ওপর ভ্যাট আরোপের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণও আরও কার্যকর হবে।
নতুন নির্দেশনার ফলে অনলাইন ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসায়িক মডেল অনুযায়ী ভ্যাট হিসাব করতে পারবেন এবং কর পরিপালনে অনিশ্চয়তা অনেকাংশে কমবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।

