৯ম পে স্কেল নিউজ

নবম পে-স্কেলে বেতন বৈষম্য কমবে নাকি বহাল থাকবে? কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে মূল বেতনের অনুপাত নিয়ে নতুন করে আলোচনা

নবম জাতীয় বেতন স্কেল (নবম পে-স্কেল) বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে মূল বেতনের ব্যবধান বা অনুপাত নিয়ে আবারও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন কাঠামো কতটা ভারসাম্যপূর্ণ হবে, সেটিই এখন আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়।

দীর্ঘদিন ধরেই নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা দাবি করে আসছেন, নতুন পে-স্কেলে শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়, বরং গ্রেডভিত্তিক বৈষম্যও কমাতে হবে। তাদের মতে, কেবল শতকরা হারে বেতন বাড়ালেই প্রকৃত বৈষম্য দূর হবে না; বরং সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতনের অনুপাতও যৌক্তিক পর্যায়ে আনতে হবে।

সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন মূল বেতনের ব্যবধান

প্রস্তাবিত নবম পে-স্কেলে ১ম গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। সে হিসেবে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন মূল বেতনের অনুপাত দাঁড়ায় ১:৮

সরকারি কর্মচারীদের একটি অংশের মতে, এই ব্যবধান এখনও অনেক বেশি। তাদের যুক্তি, সরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে দায়িত্বের পার্থক্য থাকলেও জীবনযাত্রার ব্যয়, বাজারদর এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচের চাপ সবার জন্যই বেড়েছে। তাই নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন তুলনামূলকভাবে আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

৯ম গ্রেড ও ২০তম গ্রেডের অনুপাত নিয়ে দাবি

বেতন বৈষম্য নিয়ে আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ৯ম গ্রেড, যা সাধারণত কর্মকর্তাদের প্রবেশ (Entry) পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।

কর্মচারী সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, ২০তম গ্রেডের সঙ্গে ৯ম গ্রেডের মূল বেতনের অনুপাত ১:৪-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। তাদের মতে, এতে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে বিদ্যমান আর্থিক বৈষম্য অনেকটাই কমে আসবে।

তবে বর্তমান প্রস্তাবে গ্রেডভিত্তিক শতাংশের হারে বেতন বৃদ্ধি করা হলেও বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে মূল বেতনের ব্যবধান পুরোপুরি কমেনি বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।

শুধু মূল বেতন নয়, ভাতাতেও রয়েছে বৈষম্যের অভিযোগ

মূল বেতনের পাশাপাশি বিভিন্ন ভাতা নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের মধ্যে।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি চাকরিতে বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, মহার্ঘ ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা অনেক ক্ষেত্রেই মূল বেতনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ফলে উচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তারা তুলনামূলকভাবে বেশি আর্থিক সুবিধা পেলেও মাঠপর্যায়ে কর্মরত নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় কম সুবিধা পান বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ কারণে শুধু মূল বেতন নয়, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধার ক্ষেত্রেও বৈষম্য কমানোর দাবি জানিয়ে আসছে বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠন।

নিম্ন গ্রেডে বেশি হারে বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ

নবম পে-স্কেলের খসড়া সুপারিশে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি হারে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কিছু নিম্ন গ্রেডে বর্তমান মূল বেতনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বা সর্বোচ্চ ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ মোকাবিলায় নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

অন্যদিকে উচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম শতাংশ হারে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে সামগ্রিক বেতন কাঠামোর বৈষম্য কিছুটা হলেও কমে আসে।

সচিব কমিটির পর্যালোচনায় অনুপাতের বিষয়

নবম পে-স্কেল চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব কমিটি বর্তমানে বিভিন্ন প্রস্তাব ও সুপারিশ পর্যালোচনা করছে। সংশ্লিষ্ট মহলের তথ্য অনুযায়ী, বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিদ্যমান বেতন ব্যবধান বা অনুপাত আরও যৌক্তিক করার বিষয়েও আলোচনা চলছে।

তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ফলে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন গ্রেডের অনুপাত, এন্ট্রি গ্রেডের বেতন এবং বিভিন্ন ভাতার কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, তা নির্ভর করবে সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদনের ওপর।

বিশ্লেষকদের মতামত

জনপ্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, একটি কার্যকর ও টেকসই বেতন কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়, বরং বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে যুক্তিসংগত ভারসাম্য নিশ্চিত করাও জরুরি।

তাদের মতে, নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষতা, দায়িত্ব ও প্রশাসনিক কাঠামোর ভারসাম্য বজায় রেখে বেতন নির্ধারণ করা হলে সরকারি চাকরিতে দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সারসংক্ষেপ

নবম পে-স্কেলকে ঘিরে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে মূল বেতনের অনুপাত, সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের ব্যবধান এবং ভাতা কাঠামো নিয়ে আলোচনা এখনো অব্যাহত রয়েছে। নিম্ন গ্রেডে তুলনামূলক বেশি হারে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব বৈষম্য কিছুটা কমানোর ইঙ্গিত দিলেও, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে বেতনের অনুপাত কতটা পরিবর্তিত হবে, তা নির্ভর করছে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও গেজেট প্রকাশের ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *