৭টি জটিল রোগের চিকিৎসায় ১ লাখ টাকা অনুদান—অনলাইন আবেদনের নিয়ম জানুন
ক্যান্সার, কিডনি রোগসহ জটিল ও ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসায় অসচ্ছল রোগীদের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি রয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় পরিচালিত এই কর্মসূচিতে যোগ্য রোগীদের চিকিৎসা ব্যয়ে সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে—প্রচারিত ছবিতে ৭টি রোগে ১ লাখ টাকা বলা হলেও সমাজসেবা অধিদপ্তরের ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ হালনাগাদ সরকারি তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে তালিকাভুক্ত রোগ ৬টি এবং নির্বাচিত রোগীর জন্য এককালীন সহায়তার পরিমাণ ৫০ হাজার টাকা।
কোন কোন রোগে সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়?
সমাজসেবা অধিদপ্তরের সরকারি তথ্য অনুযায়ী কর্মসূচির আওতায় রয়েছে—
- ক্যান্সার
- কিডনি রোগ
- লিভার সিরোসিস
- স্ট্রোকে প্যারালাইজড
- জন্মগত হৃদরোগ
- থ্যালাসেমিয়া
অর্থাৎ, বর্তমানে সরকারি ওয়েবসাইটে লিউকেমিয়াকে আলাদা সপ্তম রোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। সরকারি কর্মসূচিতে উল্লিখিত ছয় ধরনের রোগে আক্রান্ত অসচ্ছল রোগীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
কত টাকা অনুদান পাওয়া যায়?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি রয়েছে। প্রচারিত পোস্ট বা ছবিতে ১ লাখ টাকা সহায়তার কথা বলা হলেও সমাজসেবা অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রকাশিত কর্মসূচির তথ্যে নির্বাচিত প্রত্যেক যোগ্য রোগীর জন্য এককালীন ৫০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তার কথা উল্লেখ আছে। একই সরকারি তথ্য অনুযায়ী সরকার প্রয়োজনে অনুদানের পরিমাণ বৃদ্ধি বা হ্রাস করতে পারে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরেও এই কর্মসূচিতে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে ৪৯ কোটি ৪৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দের তথ্য প্রকাশিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে আরও ২০ কোটি ৫৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দের খবরও সরকারি সূত্রভিত্তিক সংবাদে এসেছে।
অনলাইনে আবেদন করবেন যেভাবে
সমাজসেবা অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকে এই কর্মসূচির আবেদন শতভাগ অনলাইনে করার নির্দেশনা রয়েছে। তাই আবেদনকারীকে সংশ্লিষ্ট অনলাইন সেবায় গিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র দিয়ে আবেদন করতে হবে।
ধাপ ১: অনলাইন আবেদন পোর্টালে প্রবেশ
প্রথমে সমাজসেবা অধিদপ্তরের নির্ধারিত Integrated Digital Service Delivery Platform-এর সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা সহায়তা সেবায় প্রবেশ করতে হবে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও এই ডিজিটাল সেবাটিকে ক্যান্সার, কিডনি ও বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা সহায়তা আবেদনের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ধাপ ২: ব্যক্তিগত তথ্য দিতে হবে
আবেদনের সময় সাধারণত রোগীর পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য প্রস্তুত রাখতে হবে। যেমন—
- রোগীর নাম
- জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর
- জন্মতারিখ
- জন্মনিবন্ধন নম্বর—প্রযোজ্য ক্ষেত্রে
- মোবাইল নম্বর
- বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা
- রোগীর ছবি
- অভিভাবকের তথ্য—প্রযোজ্য ক্ষেত্রে
নাবালক রোগীর ক্ষেত্রে অভিভাবকের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যও প্রয়োজন হতে পারে।
ধাপ ৩: ব্যাংক হিসাবের তথ্য
আবেদনের ক্ষেত্রে রোগী অথবা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অভিভাবকের সচল ব্যাংক হিসাবের তথ্য প্রস্তুত রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরকারি কর্মসূচির বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকে চিকিৎসা সহায়তা EFT-এর মাধ্যমে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
যেসব কাগজপত্র আগে থেকেই প্রস্তুত রাখবেন
অনলাইনে আবেদন করার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে রাখলে আবেদন প্রক্রিয়া সহজ হবে।
১. জাতীয় পরিচয়পত্র/জন্মনিবন্ধন
রোগীর NID-এর কপি প্রয়োজন হবে। রোগী ১৮ বছরের কম হলে জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করা যেতে পারে। সরকারি নীতিমালায় NID/জন্মসনদের সত্যায়িত কপির কথা উল্লেখ রয়েছে।
২. রোগীর ছবি
সাম্প্রতিক পাসপোর্ট সাইজের ছবি প্রস্তুত রাখতে হবে।
৩. অভিভাবকের NID
রোগী নাবালক হলে অথবা গুরুতর অসুস্থতার কারণে অভিভাবকের মাধ্যমে আবেদন করতে হলে অভিভাবকের NID প্রয়োজন হতে পারে।
৪. বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রত্যয়ন
রোগটি যে সত্যিই সংশ্লিষ্ট জটিল রোগ—এ বিষয়ে নিবন্ধিত চিকিৎসক/বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রত্যয়ন থাকতে হবে।
৫. রোগ নির্ণয়ের টেস্ট রিপোর্ট
রোগের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় মেডিকেল রিপোর্ট সংযুক্ত করতে হবে। সরকারি নীতিমালায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ও সংশ্লিষ্ট রোগের টেস্ট রিপোর্টের কথা বলা হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে—
- ক্যান্সার: Biopsy বা সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার রিপোর্ট
- কিডনি রোগ: Acute Renal Failure/Chronic Renal Failure-এর প্রমাণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ডায়ালাইসিসের তথ্য
- অন্যান্য রোগ: সংশ্লিষ্ট রোগের নির্ণায়ক পরীক্ষা ও চিকিৎসকের প্রত্যয়ন
কারা অগ্রাধিকার পাবেন?
শুধু রোগ থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুদান পাওয়া যাবে না। আবেদন যাচাই-বাছাই করে যোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচন করা হয়।
সরকারি নীতিমালায় অসচ্ছল ও দরিদ্র রোগীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আর্থিক ও সামাজিক অবস্থাও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
বিশেষ করে—
- শিশু
- নিঃস্ব ব্যক্তি
- ভূমিহীন ব্যক্তি
- বয়োজ্যেষ্ঠ
- বিধবা
- তালাকপ্রাপ্তা
- বিপত্নীক
- নিঃসন্তান
- পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি
ইত্যাদি সামাজিক ও আর্থিক অবস্থাকে অগ্রাধিকার নির্ধারণে বিবেচনা করা হতে পারে।
আবেদন করলেই কি টাকা পাওয়া যাবে?
না।
অনলাইনে আবেদন করার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আবেদন যাচাই-বাছাই করবে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে আবেদন যাচাই করে যোগ্য ও অযোগ্য আবেদনকারীদের তালিকা তৈরি করা হয়। এরপর জেলা পর্যায়ের কমিটি আবেদন ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাই করে যোগ্য ব্যক্তিদের তালিকা অনুমোদন করে।
অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়াটি মোটামুটি—
অনলাইনে আবেদন → কাগজপত্র যাচাই → প্রাথমিক তালিকা → জেলা কমিটির যাচাই-বাছাই → অনুমোদন → EFT-এর মাধ্যমে সহায়তা।
সারা বছর আবেদন করা যায়?
সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, বছরের যেকোনো সময়ে উপজেলা/শহর সমাজসেবা কার্যালয়ে আবেদন জমা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে শতভাগ অনলাইন আবেদনের নির্দেশনা থাকায় নির্ধারিত অনলাইন পদ্ধতিতে আবেদন করা উচিত।
তবে অনলাইনে আবেদন করার পর সংশ্লিষ্ট উপজেলা/শহর সমাজসেবা কার্যালয়ের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যাচাই বা পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পর্কে যোগাযোগ করা নিরাপদ।
১ লাখ টাকার তথ্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিটিতে বলা হয়েছে, ৭টি জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের এককালীন ১ লাখ টাকা দেওয়া হচ্ছে এবং লিউকেমিয়াকেও তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে।
কিন্তু সমাজসেবা অধিদপ্তরের ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ হালনাগাদ সরকারি পেজে ছয়টি রোগের নাম এবং ৫০ হাজার টাকা এককালীন সহায়তার তথ্যই রয়েছে। ২০২৬ সালের জুনেও সরকারি বরাদ্দসংক্রান্ত প্রতিবেদনে একই ছয় রোগের কর্মসূচির কথা বলা হয়েছে।
তাই ১ লাখ টাকা এবং সপ্তম রোগ হিসেবে লিউকেমিয়া অন্তর্ভুক্তির দাবি নতুন কোনো সরকারি প্রজ্ঞাপন/পরিপত্র ছাড়া নিশ্চিত তথ্য হিসেবে প্রচার না করাই ভালো।
এক নজরে
| বিষয় | সরকারি তথ্য |
|---|---|
| কর্মসূচি | জটিল রোগে আক্রান্ত অসচ্ছল রোগীদের আর্থিক সহায়তা |
| রোগের সংখ্যা | ৬টি |
| ক্যান্সার | আছে |
| কিডনি রোগ | আছে |
| লিভার সিরোসিস | আছে |
| স্ট্রোকে প্যারালাইজড | আছে |
| জন্মগত হৃদরোগ | আছে |
| থ্যালাসেমিয়া | আছে |
| লিউকেমিয়া | বর্তমান সরকারি তালিকায় আলাদা করে নেই |
| সহায়তার পরিমাণ | এককালীন ৫০,০০০ টাকা |
| আবেদন | অনলাইনে |
| আবেদন সময় | সরকারি তথ্য অনুযায়ী বছরের যেকোনো সময়ে |
| অর্থ প্রদানের পদ্ধতি | EFT |
| নির্বাচন | যাচাই-বাছাই ও জেলা কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে |
শেষ কথা
জটিল রোগের চিকিৎসার ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য বড় আর্থিক চাপ তৈরি করে। এ কারণে সরকারি চিকিৎসা সহায়তা কর্মসূচির আওতায় যোগ্য রোগীরা আর্থিক সহায়তার জন্য আবেদন করতে পারেন। তবে অনুদানের পরিমাণ, রোগের তালিকা ও যোগ্যতার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের ওপর নির্ভর না করে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সর্বশেষ সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।
বিশেষভাবে মনে রাখুন: বর্তমানে পাওয়া সরকারি তথ্য অনুযায়ী সহায়তার পরিমাণ ৫০ হাজার টাকা—১ লাখ টাকা নয়।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের সরকারি তথ্য ও অনলাইন আবেদন সংক্রান্ত পেজ

