গাবতলী থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় বাসের নতুন ভাড়া, ৫১ ও ৪০ আসনের আলাদা তালিকা প্রকাশ
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর রাজধানীর গাবতলী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থেকে দেশের বিভিন্ন জেলার রুটে চলাচলকারী ৫১ ও ৪০ আসনের বাসের নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পুনর্নির্ধারিত তালিকায় রুটভেদে দূরত্ব, প্রতি কিলোমিটার ভাড়া, টোল এবং টোলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছাড় হিসাব করে চূড়ান্ত আদায়যোগ্য ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
আপনার দেওয়া নথিতে তালিকাটির হালনাগাদের তারিখ ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ উল্লেখ রয়েছে এবং এতে গাবতলী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থেকে বিভিন্ন জেলার রুটের বিস্তারিত হিসাব দেওয়া হয়েছে।
সরকার ২২ সেপ্টেম্বর জারি করা প্রজ্ঞাপনে আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার ডিজেলচালিত বাস-মিনিবাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা করেছে। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া বেড়েছে ১৭ পয়সা। নতুন হার ২২ সেপ্টেম্বর থেকেই কার্যকর হয়েছে।
গাবতলী টার্মিনালের নতুন ভাড়া কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে
বিআরটিএর প্রকাশিত তালিকায় শুধু দূরত্বের সঙ্গে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া গুণ করেই চূড়ান্ত ভাড়া নির্ধারণ করা হয়নি। রুটের দূরত্বের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সেতু, টোল ও ফেরির ভাড়া হিসাবের মধ্যে নেওয়া হয়েছে।
তালিকায় প্রথমে রুটের মোট দূরত্ব দেওয়া হয়েছে। এরপর প্রতি কিলোমিটার নির্ধারিত ভাড়ার ভিত্তিতে ৫১ আসনের বাসের ভাড়া এবং ৪০ আসনের বাসের ভাড়া হিসাব করা হয়েছে। পরে সংশ্লিষ্ট রুটের টোল যোগ করে টোলের ওপর নির্ধারিত হারে ছাড় সমন্বয় করে সর্বশেষ ‘টোলসহ আদায়যোগ্য ভাড়া’ নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিআরটিএর নির্দেশনায় বলা হয়েছে, দূরত্ব বা ভাড়ার পরিমাণে বাস্তব কোনো পার্থক্য থাকলে যথাযথ প্রমাণের ভিত্তিতে আনুপাতিকভাবে ভাড়া পুনর্নির্ধারণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
৫১ ও ৪০ আসনের বাসে ভাড়া আলাদা কেন?
নতুন তালিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—একই রুটে ৫১ আসনের বাস এবং ৪০ আসনের বাসের ভাড়া এক নয়।
৫১ আসনের বাসে যাত্রীসংখ্যা বেশি হওয়ায় মাথাপিছু ভাড়া তুলনামূলক কম, অন্যদিকে ৪০ আসনের বাসে আসন কম থাকায় একই পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক কমসংখ্যক যাত্রীর মধ্যে বণ্টিত হয়। ফলে ৪০ আসনের বাসের অনুমোদিত ভাড়া বেশি রাখা হয়েছে।
এ কারণে যাত্রীরা টিকিট কাটার সময় বাসটি ৫১ আসনের নাকি ৪০ আসনের—এ বিষয়টি খেয়াল করলে নির্ধারিত ভাড়ার সঙ্গে টিকিটের মিল যাচাই করতে পারবেন।
গাবতলী থেকে উত্তরবঙ্গের রুটগুলোতে ভাড়ার প্রভাব
গাবতলী টার্মিনাল মূলত উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘপথের যাত্রীদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ফলে নতুন কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া বৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে দীর্ঘ দূরত্বের এসব রুটে।
এর আগে এপ্রিল ২০২৬-এর বিআরটিএ তালিকায় গাবতলী-পঞ্চগড় রুটে ৫১ আসনের বাসের ভাড়া ছিল ১,০০৫ টাকা এবং ৪০ আসনের বাসে ১,২৮১ টাকা। গাবতলী-রংপুর রুটে ছিল যথাক্রমে ৭৫১ ও ৯১১ টাকা এবং গাবতলী-দিনাজপুর রুটে ৯৭৪ ও ১,২৪১ টাকা।
সেপ্টেম্বরের নতুন সমন্বয়ের ফলে এসব পুরোনো হার আর প্রযোজ্য নয়; ২২ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন বিআরটিএ তালিকা অনুযায়ী ভাড়া আদায় করার কথা।
রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহসহ পশ্চিমাঞ্চলেও নতুন হিসাব
গাবতলী থেকে রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ, যশোর, নড়াইল, মাগুরা ও খুলনাসহ বিভিন্ন রুটের ভাড়াও নতুন করে হিসাব করা হয়েছে।
এক্ষেত্রে শুধু জেলা সদর পর্যন্ত সরাসরি দূরত্ব নয়, রুটে ব্যবহৃত সড়ক, সেতু, টোল ও ফেরি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। ফলে কাছাকাছি দূরত্বের দুটি রুটেও টোলের পার্থক্যের কারণে চূড়ান্ত ভাড়ায় পার্থক্য দেখা যেতে পারে।
এপ্রিলের পূর্ববর্তী তালিকায় গাবতলী-ঝিনাইদহ রুটে ৫১ আসনের বাসের ভাড়া ছিল ৫০১ টাকা এবং ৪০ আসনের বাসে ৬৩৯ টাকা; গাবতলী-রাজশাহী রুটে ছিল ৭৭৭ ও ৯৯১ টাকা এবং গাবতলী-মেহেরপুর রুটে ৭৭৬ ও ৯৮১ টাকা।
উত্তরবঙ্গের দীর্ঘ রুটে যাত্রী ব্যয় আরও বাড়বে
গাবতলী থেকে রংপুর বিভাগের বিভিন্ন রুটের মধ্যে রংপুর, লালমনিরহাট, পাটগ্রাম, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, সৈয়দপুরসহ দীর্ঘ দূরত্বের একাধিক গন্তব্য তালিকায় রয়েছে।
দেওয়া নথির শেষ দিকের একটি রুটে ঢাকা (গাবতলী)-সৈয়দপুর রুটের দূরত্ব ৩৩৮ কিলোমিটার দেখানো হয়েছে। ওই রুটে প্রতি কিলোমিটার ভাড়া, টোল এবং টোলের ছাড় সমন্বয়ের পর ৫১ ও ৪০ আসনের বাসের জন্য আলাদা আদায়যোগ্য ভাড়া দেখানো হয়েছে।
অর্থাৎ নতুন ব্যবস্থায় শুধু ‘কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা বেড়েছে’—এভাবে সব রুটের মোট ভাড়া হিসাব করা যাবে না। কারণ প্রতিটি রুটের মোট দূরত্ব ও টোল কাঠামো আলাদা।
টোলের হিসাবও থাকছে ভাড়ার তালিকায়
নতুন চার্টের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, প্রতিটি প্রযোজ্য রুটে টোলের আলাদা কলাম রাখা হয়েছে। সেখানে ৫১ আসনের বাস ও ৪০ আসনের বাসের জন্য টোলের হিসাব এবং টোলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ১০ শতাংশ বোঝাই/রেয়াত হার দেখানো হয়েছে।
এরপর সবকিছু সমন্বয় করে শেষ দুটি কলামে দেওয়া হয়েছে ‘টোলসহ জনসাধারণের আদায়যোগ্য ভাড়া’।
এতে যাত্রীদের জন্য একটি বিষয় পরিষ্কার—কোনো রুটের ভাড়া শুধু দূরত্ব × কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া নয়; সেতু, টোল ও ফেরির ব্যয়ের কারণে চূড়ান্ত ভাড়া কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
নতুন ভাড়া শুধু ডিজেলচালিত বাসের ক্ষেত্রে
২২ সেপ্টেম্বরের সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নতুন ভাড়ার হার ডিজেলচালিত বাস ও মিনিবাসের জন্য প্রযোজ্য। গ্যাসচালিত বাস ও মিনিবাসের ক্ষেত্রে এই বর্ধিত ভাড়া প্রযোজ্য হবে না।
এ ছাড়া প্রতিটি বাস ও মিনিবাসের দৃশ্যমান স্থানে নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা প্রদর্শন করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফলে যাত্রীরা বাসে ওঠার পর অনুমোদিত ভাড়ার চার্ট দেখে ভাড়া যাচাই করতে পারবেন।
নির্ধারিত ভাড়ার বেশি নেওয়া যাবে না
নতুন ভাড়া কার্যকরের আগে গাবতলীসহ কয়েকটি টার্মিনালে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগও ওঠে। ২২ সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে গাবতলী টার্মিনালে গন্তব্যভেদে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়ার অভিযোগের কথা প্রকাশিত হয়েছিল।
তবে এখন যেহেতু সরকার নতুন ভাড়া কার্যকর করেছে এবং বিআরটিএ রুটভিত্তিক চার্ট প্রকাশ করেছে, চার্টে উল্লেখিত ভাড়ার বেশি আদায় করার সুযোগ নেই। সরকারি প্রজ্ঞাপনেও অনুমোদিত ভাড়ার অতিরিক্ত আদায়ের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে।
যাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
গাবতলী থেকে দূরপাল্লার বাসে যাত্রার সময় যাত্রীদের কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি—
- বাসটি ডিজেলচালিত কি না যাচাই করা।
- বাসটি ৫১ আসনের নাকি ৪০ আসনের তা দেখা।
- বাসের ভেতরে প্রদর্শিত বিআরটিএর অনুমোদিত ভাড়া চার্ট মিলিয়ে দেখা।
- টিকিটে উল্লেখিত ভাড়া এবং চার্টের ভাড়া একই কি না যাচাই করা।
- একই রুটে অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করা।
- এসি বাসের বাণিজ্যিক ভাড়া এবং বিআরটিএর নির্ধারিত সাধারণ আন্তঃজেলা ভাড়াকে এক করে না দেখা।
কেন এই নতুন তালিকা গুরুত্বপূর্ণ
এবারের তালিকার গুরুত্ব শুধু ভাড়া বাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে গাবতলী থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলাচলকারী রুটগুলোতে দূরত্ব, আসনসংখ্যা, টোল ও রুটভিত্তিক হিসাবকে একসঙ্গে এনে একটি নির্দিষ্ট আদায়যোগ্য ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারি হিসাবে আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বৃদ্ধি পেয়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা হয়েছে। ২২ সেপ্টেম্বর থেকেই এটি কার্যকর।
ফলে এখন গাবতলী থেকে পঞ্চগড়, রংপুর, দিনাজপুর, সৈয়দপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, পাবনা, রাজশাহী, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ, যশোর, খুলনা, বরিশালসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রার ক্ষেত্রে আগের ভাড়ার পরিবর্তে ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে হালনাগাদ বিআরটিএ রুটভিত্তিক চার্টই অনুসরণ করতে হবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: ৫১ ও ৪০ আসনের বাসের ভাড়া আলাদা হওয়ায় শুধু গন্তব্যের নাম দেখে ভাড়া নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। সংশ্লিষ্ট রুট নম্বর, আসনসংখ্যা এবং টোলসহ চূড়ান্ত ‘আদায়যোগ্য ভাড়া’ কলামটি মিলিয়ে টিকিটের মূল্য যাচাই করাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।

