উৎসে কর বিধিমালা ২০২৬ : নতুন হার কার্যকর ১ জুলাই থেকে, সেবা, পণ্য ও সম্পত্তি লেনদেনে ব্যাপক পরিবর্তন
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নতুন “উৎসে কর বিধিমালা, ২০২৬” জারি করেছে। ৮ জুন ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত এ প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে বিধিমালাটি কার্যকর হবে। নতুন বিধিমালায় পণ্য সরবরাহ, বিভিন্ন সেবা, অনিবাসীদের আয় এবং সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তন ও সংগ্রহের হার পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
পণ্য সরবরাহে নতুন উৎসে কর হার
বিধিমালায় বিভিন্ন ধরনের পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তনের হার নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে কৃষিপণ্য, খাদ্যপণ্য, বীজ, কাঁচা চামড়া, জৈব সারসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে ০.৫ শতাংশ উৎসে কর নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে সুতা সরবরাহে ১ শতাংশ, সব ধরনের ফল সরবরাহে ২ শতাংশ, সিমেন্ট, লোহা ও লৌহজাত পণ্যে ২ শতাংশ এবং শিল্প উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল ও প্যাকিং ম্যাটেরিয়াল সরবরাহে ৩ শতাংশ উৎসে কর ধার্য করা হয়েছে।
তামাকজাত শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল সরবরাহের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ উৎসে কর নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া তালিকাভুক্ত নয় এমন অন্যান্য পণ্য সরবরাহ ও ধারা ৮৯-এর অন্যান্য ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ হারে কর কর্তনের বিধান রাখা হয়েছে।
সেবা খাতে উৎসে করের নতুন কাঠামো
নতুন বিধিমালায় সেবা খাতে উৎসে করের হারেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। উপদেষ্টা বা পরামর্শক ফি এবং পেশাদার সেবার ক্ষেত্রে ব্যক্তির জন্য ১৫ শতাংশ এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জন্য ৭.৫ শতাংশ কর নির্ধারণ করা হয়েছে। কারিগরি সেবা বা প্রযুক্তিগত সহায়তা ফিতে ব্যক্তির ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ এবং প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ উৎসে কর কর্তনের বিধান রয়েছে।
ক্যাটারিং, জনসংযোগ, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, প্রশিক্ষণ, কুরিয়ার, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এজেন্সি সেবাসহ বিভিন্ন সেবার মোট বিলের ওপর ৪ শতাংশ হারে কর কর্তন করা হবে।
এছাড়া মিটিং ফি, ট্রেনিং ফি বা সম্মানী বিলের ওপর ২০ শতাংশ, মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরের সেবা বিলে ১০ শতাংশ, ইন্টারনেট সেবার বিলে ৫ শতাংশ এবং পরিবহন ও গাড়ি ভাড়া সেবার ক্ষেত্রে ২ শতাংশ উৎসে কর নির্ধারণ করা হয়েছে।
অনিবাসীদের আয়ে কর কর্তনের বিধান
বিধিমালায় অনিবাসী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আয় থেকে উৎসে কর কর্তনের জন্য পৃথক হার নির্ধারণ করা হয়েছে। অনিবাসী পরামর্শক বা পেশাদার সেবার ক্ষেত্রে ব্যক্তির জন্য ২০ শতাংশ এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য ১০ শতাংশ কর কাটা হবে।
রয়্যালটি, লাইসেন্স ফি ও অদৃশ্য সম্পদের ব্যবহারের বিপরীতে প্রদত্ত অর্থের ওপর ২০ শতাংশ, সুদের ওপর ১০ শতাংশ, বিজ্ঞাপন সম্প্রচার বিলে ১৫ শতাংশ, ডিজিটাল মার্কেটিং বিলে ১০ শতাংশ এবং পণ্য সরবরাহ বিলে ৬ শতাংশ হারে কর কর্তনের বিধান রাখা হয়েছে।
লভ্যাংশ গ্রহণের ক্ষেত্রেও পৃথক হার নির্ধারণ করা হয়েছে। কোম্পানি, তহবিল বা ট্রাস্ট কর্তৃক গৃহীত লভ্যাংশে ২০ শতাংশ এবং অন্যান্য ব্যক্তির ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ কর প্রযোজ্য হবে।
সম্পত্তি হস্তান্তরে কর সংগ্রহ
নতুন বিধিমালায় সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কর সংগ্রহের বিস্তারিত কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকার গুলশান, বনানী, মতিঝিল ও তেজগাঁও এলাকার মতো উচ্চমূল্যের অঞ্চলে জমি বিক্রির ক্ষেত্রে দলিলে উল্লিখিত মূল্যের ৫ শতাংশ অথবা নির্ধারিত শতকপ্রতি ন্যূনতম মূল্যের মধ্যে যেটি বেশি, সেই পরিমাণ কর পরিশোধ করতে হবে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় জমির শ্রেণি ও অবস্থানভেদে শতকপ্রতি করের পৃথক হার নির্ধারণ করা হয়েছে, যা সম্পত্তি লেনদেনে কর ব্যবস্থাকে আরও সুসংগঠিত করবে।
ব্যবসা ও কর প্রশাসনে প্রভাব
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন উৎসে কর বিধিমালা কার্যকর হলে কর কর্তনের হার ও পদ্ধতি আরও স্পষ্ট হবে এবং কর সংগ্রহে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সেবা প্রদানকারী ও সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নতুন হার সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে, কারণ ১ জুলাই ২০২৬ থেকে এসব বিধান বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর হবে।
উৎসে কর বিধিমালা ২০২৬-এর মাধ্যমে আয়কর আইন, ২০২৩-এর আওতায় কর প্রশাসনকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

