ব্যাংকে টাকা রাখার আগে কী দেখবেন? নিরাপত্তা, আর্থিক শক্তি ও সুশাসনে এগিয়ে কোন ব্যাংকগুলো
ব্যাংকে সঞ্চয় বা আমানত রাখার ক্ষেত্রে অধিকাংশ গ্রাহকের প্রথম ও প্রধান বিবেচনা থাকে নিরাপত্তা। তবে ব্যাংকের নিরাপত্তা বলতে শুধু টাকা জমা রাখা বা উত্তোলনের সুবিধা বোঝায় না। একটি ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি কতটা শক্তিশালী, খেলাপি ঋণের পরিমাণ কত, সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা উন্নত এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা মেনে পরিচালিত হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংক মিলিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে কয়েকটি ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে সেবা প্রদান, বড় গ্রাহকভিত্তি এবং তুলনামূলক স্থিতিশীল কার্যক্রমের কারণে সাধারণ মানুষের কাছে আস্থার জায়গা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি মালিকানাধীন হওয়ায় অনেক গ্রাহক সঞ্চয়ের জন্য সোনালী ব্যাংককে তুলনামূলক নিরাপদ মনে করেন। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির শাখা নেটওয়ার্কও বিস্তৃত। অন্যদিকে, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও বিস্তৃত গ্রাহকসেবার কারণে পুবালী ব্যাংকও অনেক আমানতকারীর কাছে পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য একটি নাম।
প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবার ক্ষেত্রে ব্র্যাক ব্যাংক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। ডিজিটাল ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপভিত্তিক সেবা এবং উদ্ভাবনী আর্থিক পণ্যের কারণে তরুণ গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাংকটির গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে।
একইভাবে, ইস্টার্ন ব্যাংক (ইবিএল) করপোরেট সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং পেশাদার পরিচালন কাঠামোর জন্য ইতিবাচক সুনাম অর্জন করেছে। করপোরেট গ্রাহকদের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ব্যাংকিং সেবাতেও প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখযোগ্য অবস্থান ধরে রেখেছে।
আধুনিক ব্যাংকিং সুবিধা, আন্তর্জাতিক লেনদেন এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দক্ষতার জন্য সিটি ব্যাংকও গ্রাহকদের আস্থাভাজন ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হয়। ব্যাংকটির ডিজিটাল সেবা এবং কার্ডভিত্তিক ব্যাংকিং কার্যক্রমও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, কোনো ব্যাংককেই শতভাগ ঝুঁকিমুক্ত বলা যায় না। একটি ব্যাংকের বর্তমান অবস্থা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই শুধুমাত্র পরিচিত নাম বা জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে ব্যাংক নির্বাচন না করে গ্রাহকদের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূচক যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, মূলধন পর্যাপ্ততা, মুনাফা অর্জনের ধারাবাহিকতা এবং আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষায় সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের হার বেশি হলে তা ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ও নিয়মকানুন মেনে চলার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের অতীত রেকর্ডও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। কারণ নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি ও অনুবর্তিতা একটি ব্যাংকের সুশাসনের মান নির্দেশ করে।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে সাইবার নিরাপত্তাও বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপ ও ইন্টারনেটভিত্তিক লেনদেন বাড়ার ফলে গ্রাহকদের তথ্য ও অর্থ সুরক্ষায় ব্যাংকের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
পাশাপাশি গ্রাহকসেবার মান, অভিযোগ নিষ্পত্তির গতি এবং শাখা ও এটিএম নেটওয়ার্কের কার্যকারিতাও ব্যাংক নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখা উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
সার্বিকভাবে, নিরাপদ ব্যাংক নির্বাচন করতে হলে শুধু প্রতিষ্ঠানের নাম নয়, বরং আর্থিক স্বাস্থ্য, সুশাসন, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা এবং গ্রাহকসেবার সামগ্রিক চিত্র মূল্যায়ন করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এতে আমানতকারীরা নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আরও ভালো ব্যাংকিং সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন।

