Latest News

ই-টিন করেও রিটার্ন জমা দেননি? জরিমানা এড়াতে করদাতাদের যেসব বিষয় জানা জরুরি

বাংলাদেশে ই-টিন (e-TIN) নিবন্ধন করেও আয়কর রিটার্ন দাখিল না করার বিষয়টি নিয়ে করদাতাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে, নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা না দিলে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে—এমন তথ্য ছড়িয়ে পড়ায় অনেকেই নিজেদের কর-সংক্রান্ত অবস্থান যাচাই করতে আগ্রহী হচ্ছেন। তবে ই-টিন থাকলেই প্রত্যেক ব্যক্তিকে একই পরিমাণ জরিমানা দিতে হবে, বিষয়টি এমন নয়। আয়কর আইন, ২০২৩ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্দেশনা অনুযায়ী, রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা ও জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা হয়।

করদাতাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ই-টিন সনদ থাকা এবং আয়কর রিটার্ন দাখিল করা দুটি আলাদা বিষয়। কেউ ই-টিন নিবন্ধন করলেই তাঁর রিটার্ন জমা হয়ে যায় না। আবার আয় করযোগ্য সীমার নিচে থাকলেও নির্দিষ্ট আইনি শর্তের কারণে কোনো কোনো ব্যক্তির রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক হতে পারে। ফলে জরিমানা বা আইনি জটিলতা এড়াতে নিজের কর-সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।

ই-টিন থাকলে কেন রিটার্ন জমা দিতে হয়?

ই-টিন হলো করদাতার শনাক্তকরণ নম্বর। অন্যদিকে, আয়কর রিটার্নের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি নির্দিষ্ট করবর্ষে তাঁর আয়, বিনিয়োগ, সম্পদ, দায় এবং প্রযোজ্য করের তথ্য কর কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করেন।

আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৬ এবং সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যক্তির জন্য আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক। তাই কারও আয় করযোগ্য সীমার নিচে থাকলেই তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত হয়ে যাবেন—এমন ধারণা সঠিক নয়।

সাধারণত যেসব ব্যক্তির রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন:

  • যাঁদের বার্ষিক আয় প্রযোজ্য করমুক্ত সীমা অতিক্রম করে।
  • যাঁদের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী কর নির্ধারণ বা আইনের অন্যান্য নির্ধারিত শর্ত প্রযোজ্য।
  • সরকারি কর্মচারীসহ আইন দ্বারা নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যক্তি।
  • কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার কর্মচারী এবং ফার্মের অংশীদার।
  • যাঁদের নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণ বা আইনগত প্রয়োজনে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ উপস্থাপন করতে হয়।

তবে প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে একই শর্ত প্রযোজ্য নয়। নিজের পেশা, আয়ের ধরন, ই-টিন নিবন্ধনের অবস্থা এবং প্রযোজ্য আইনি বিধান অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা যাচাই করতে হবে।

রিটার্ন জমা না দিলে কি ৫ হাজার টাকা জরিমানা হবে?

ই-টিনধারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্ন হলো, নির্ধারিত সময়ে আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে সবার কি ৫ হাজার টাকা জরিমানা হবে?

আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬৬-এ নির্ধারিত পরিস্থিতিতে রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতার জন্য জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে ৫ হাজার টাকা সবার জন্য নির্দিষ্ট বা স্বয়ংক্রিয় জরিমানা নয়।

আইনের সাধারণ বিধান অনুযায়ী, নির্ধারিত শর্তে রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থ হলে সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর ধার্য করের ১০ শতাংশ হারে জরিমানা আরোপের বিধান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ন্যূনতম জরিমানা ১ হাজার টাকা। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন ৫০ টাকা অতিরিক্ত জরিমানার বিধানও রয়েছে।

অন্যদিকে, আগে আয় নিরূপণ করা হয়নি—এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে জরিমানার সর্বোচ্চ সীমা ৫ হাজার টাকা। আগে আয় নিরূপণ হয়ে থাকলে সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর প্রদেয় করের ৫০ শতাংশ অথবা ১ হাজার টাকা—যেটি বেশি, সেই সীমা প্রযোজ্য হতে পারে।

অর্থাৎ, জরিমানার অঙ্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে করদাতার পূর্ববর্তী আয় নিরূপণ, রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতার পরিস্থিতি এবং আইনের প্রযোজ্য শর্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু ই-টিন থাকার কারণে প্রত্যেক ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৫ হাজার টাকা জরিমানা হয়েছে—এমন দাবি যাচাই ছাড়া বিশ্বাস করা উচিত নয়।

কীভাবে বুঝবেন আপনার রিটার্ন জমা হয়েছে কি না?

অনেকেই একাধিক বছর আগে ই-টিন নিবন্ধন করেছেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রিটার্ন জমা দিয়েছেন কি না, কোন করবর্ষের রিটার্ন বাকি রয়েছে, কিংবা রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ কোথায় পাওয়া যাবে—এসব বিষয়ে নিশ্চিত নন।

এ অবস্থায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ই-রিটার্ন পোর্টালে প্রবেশ করে নিজের অ্যাকাউন্টের তথ্য যাচাই করা যেতে পারে।

যাচাইয়ের পদ্ধতি:

১. প্রথমে এনবিআরের অফিসিয়াল ই-রিটার্ন পোর্টাল https://etaxnbr.gov.bd/ ঠিকানায় প্রবেশ করুন।

২. নিজের নিবন্ধিত অ্যাকাউন্টে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে লগইন করুন।

৩. সংশ্লিষ্ট করবর্ষের রিটার্ন দাখিলের অবস্থা যাচাই করুন।

৪. রিটার্ন জমা দিয়ে থাকলে প্রাপ্তিস্বীকার বা সংশ্লিষ্ট দাখিলের রেকর্ড সংরক্ষণ করুন।

৫. কোনো করবর্ষের রিটার্ন বাকি থাকলে প্রযোজ্য নিয়মে তা দাখিলের ব্যবস্থা নিন।

অ্যাকাউন্টে জরিমানা বা নোটিশের তথ্য পাওয়া গেলে সেটির কারণ, সংশ্লিষ্ট করবর্ষ এবং পরবর্তী করণীয় নিশ্চিত করা উচিত। অনলাইন পোর্টালে কোনো তথ্য বুঝতে অসুবিধা হলে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেলের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে।

রিটার্ন দাখিলের শেষ সময় কখন?

স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতাদের জন্য সাধারণভাবে ৩০ নভেম্বর করদিবস হিসেবে নির্ধারিত হয়ে থাকে। তবে নির্দিষ্ট করবর্ষে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সময়সীমা বাড়ালে বর্ধিত সময়সীমা প্রযোজ্য হতে পারে। তাই শুধু আগের বছরের তারিখের ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট করবর্ষের সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করা জরুরি।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিতে না পারলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। দেরিতে রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান, কর পরিশোধের অবস্থা এবং জরিমানার সম্ভাবনা বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিশেষ করে, করদাতার কোনো নোটিশ থাকলে সেটিতে উল্লেখ করা সময়সীমা ও নির্দেশনা গুরুত্বের সঙ্গে অনুসরণ করা উচিত।

আয় করযোগ্য নয়, তবু ই-টিন রয়েছে—করণীয় কী?

অনেক ব্যক্তি ব্যাংকিং কার্যক্রম, সম্পত্তি নিবন্ধন, ঋণ গ্রহণ কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজনে ই-টিন নিবন্ধন করেছেন। পরবর্তী সময়ে তাঁদের আয় কমে যেতে পারে অথবা সংশ্লিষ্ট সেবা গ্রহণের প্রয়োজন শেষ হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে প্রথমেই দেখতে হবে, আইন অনুযায়ী তাঁর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা এখনো রয়েছে কি না। আয় করযোগ্য সীমার নিচে থাকা এবং রিটার্ন দাখিল থেকে আইনগতভাবে অব্যাহতি পাওয়া এক বিষয় নয়।

যাঁদের ক্ষেত্রে ই-টিন আর প্রয়োজন নেই, তাঁরা প্রযোজ্য আইন ও নির্দেশনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর সার্কেলের উপকর কমিশনারের কাছে টিআইএন বাতিলের আবেদন করার সুযোগ সম্পর্কে জানতে পারেন। কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া নিজে থেকে টিআইএন বাতিল হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন

আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় ভুল তথ্য দেওয়া, ভুল করবর্ষ নির্বাচন করা কিংবা প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র সংরক্ষণ না করার কারণে পরবর্তী সময়ে জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই রিটার্ন দাখিলের আগে কয়েকটি বিষয় যাচাই করা জরুরি।

  • আয়, বিনিয়োগ, সম্পদ ও দায়ের তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করুন।
  • উৎসে কর্তিত কর, অগ্রিম কর এবং প্রযোজ্য করের তথ্য যাচাই করুন।
  • সঠিক করবর্ষ নির্বাচন করুন।
  • রিটার্ন জমা দেওয়ার পর প্রাপ্তিস্বীকার ও সংশ্লিষ্ট নথি সংরক্ষণ করুন।
  • অপরিচিত ব্যক্তি বা অননুমোদিত ওয়েবসাইটে এনআইডি, টিআইএন, পাসওয়ার্ড কিংবা আর্থিক তথ্য দেবেন না।
  • জরিমানার নোটিশ পেলে তার সত্যতা ও আইনি ভিত্তি সংশ্লিষ্ট কর অফিসের মাধ্যমে নিশ্চিত করুন।

করদাতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

ই-টিন থাকার পরও রিটার্ন জমা না দিয়ে থাকলে প্রথমেই আতঙ্কিত না হয়ে নিজের কর-সংক্রান্ত অবস্থা যাচাই করা উচিত। কোন করবর্ষের রিটার্ন বাকি রয়েছে, রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক কি না এবং কোনো জরিমানা প্রযোজ্য হতে পারে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হবে।

বিশেষ করে, ৫ হাজার টাকা জরিমানার তথ্যকে সবার জন্য একই নিয়ম হিসেবে বিবেচনা না করে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬৬ এবং এনবিআরের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রয়োজন।

সারকথা: ই-টিন থাকা মানেই রিটার্ন জমা দেওয়া হয়েছে, এমন নয়। আবার রিটার্ন জমা না দিলেই সবার জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৫ হাজার টাকা জরিমানা হবে, এমন দাবিও সঠিক নয়। নিজের রিটার্নের অবস্থা যাচাই করুন, বকেয়া থাকলে প্রযোজ্য নিয়মে দাখিল করুন এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর অফিসের পরামর্শ নিন।

অফিসিয়াল পোর্টাল: https://etaxnbr.gov.bd/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *