টিন আছে, রিটার্ন নেই: ই-রিটার্নে জরিমানার অঙ্ক দেখে ঘাবড়াবেন না, আইনে আছে মওকুফের পথ
চলতি ২০২৬-২৭ কর বছরে অনলাইনে রিটার্ন জমা দিতে গিয়ে অনেক টিনধারী এক অপ্রত্যাশিত সমস্যায় পড়ছেন। আগের যেসব বছরের রিটার্ন জমা পড়েনি, সিস্টেম সেই প্রতিটি বছরের জন্য ৫,০০০ টাকা করে জরিমানা দেখাচ্ছে। যাঁদের আয় করমুক্ত সীমার নিচে, তাঁরাও এই অঙ্ক দেখে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
তবে আয়কর আইন, ২০২৩ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই জরিমানা কোনো স্বয়ংক্রিয় শাস্তি নয়। আইনে এটি কর কর্মকর্তার বিবেচনামূলক ক্ষমতা হিসেবে রাখা হয়েছে, এবং যৌক্তিক কারণ দেখাতে পারলে জরিমানা মওকুফের সুযোগ আছে।
দুই বছরের বকেয়ায় ১০ হাজার টাকা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক করদাতা নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। তিনি ২০২৪ সালে টিন সার্টিফিকেট নেন, কিন্তু ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ কর বছরের রিটার্ন জমা দেননি। এ বছর রিটার্ন দাখিলের সময় দুই বছরের জন্য মোট ১০,০০০ টাকা জরিমানা দেখায়।
তাঁর অভিজ্ঞতা অনুযায়ী সমাধানের পথ হলো:
- টিন সার্টিফিকেটে উল্লিখিত কর অফিসে যাওয়া।
- নির্ধারিত ফরম পূরণ করা।
- রিটার্ন না দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে জরিমানা মওকুফের আবেদন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া।
তাঁর পরামর্শ, করযোগ্য আয় না থাকলে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কারণ নেই।
“পারিবেন” শব্দেই মূল সুযোগ
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৬৬ ধারা রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতার জরিমানা নিয়ে। এই ধারা অনুযায়ী, কেউ যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থ হলে উপকর কমিশনার জরিমানা আরোপ করতে পারেন। আইনের ভাষা “আরোপ করিতে পারিবেন”, অর্থাৎ জরিমানা আরোপ করা বাধ্যতামূলক নয়। এখানে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:
- যুক্তিসঙ্গত কারণ: কারণ থাকলে জরিমানা আরোপের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে যায়।
- কর্মকর্তার বিবেচনা: জরিমানা হবে কি না এবং কত হবে, তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ঠিক করেন।
ই-রিটার্নে যে অঙ্ক দেখাচ্ছে, তা আইনে নির্ধারিত সর্বোচ্চ সম্ভাব্য সীমার হিসাব হতে পারে। এটিকে চূড়ান্ত আদেশ ধরে নেওয়ার কারণ নেই।
জরিমানার তিন স্তর
| পরিস্থিতি | সম্ভাব্য জরিমানা |
|---|---|
| আগে কখনো আয় নিরূপণ হয়নি | সর্বোচ্চ ৫,০০০ টাকা |
| আগে আয় নিরূপণ হয়েছে | সর্বশেষ নিরূপিত করের ৫০% অথবা ১,০০০ টাকা, যেটি বেশি |
| ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে | প্রতিদিন অতিরিক্ত ৫০ টাকা পর্যন্ত |
নতুন করদাতাদের ক্ষেত্রে ৫,০০০ টাকা হলো জরিমানার সর্বোচ্চ সীমা, সবার জন্য নির্ধারিত অঙ্ক নয়।
অতীতেও নমনীয় ছিল এনবিআর
রিটার্ন জমা বাড়াতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আগেও ছাড় দিয়েছে। দেরিতে রিটার্ন দাখিলের জরিমানা প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান একবার বলেছিলেন, যৌক্তিক কারণ দেখাতে পারলে জরিমানা মওকুফ হবে। ২০২২ সালের বাজেটেও বকেয়া রিটার্নধারীদের জন্য জরিমানা ছাড়া রিটার্ন জমার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
সমস্যা এক-দুজনের নয়, লাখো মানুষের
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ কর বছরে ১ কোটি ৩১ লাখ টিনধারীর বিপরীতে রিটার্ন জমা পড়েছে মাত্র ৪৯ লাখ, যা প্রায় ৩৮ শতাংশ। ব্যাংক হিসাব, সঞ্চয়পত্র, ঋণ বা লাইসেন্সের মতো সেবা পেতে অনেকে টিন নিয়েছেন, কিন্তু প্রতি বছর রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে জানতেন না। ফলে বকেয়া জরিমানার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা বিপুল।
মওকুফ চাইবেন যেভাবে
১. কর সার্কেল খুঁজে নিন। টিন সার্টিফিকেটের নিচে ডান পাশে আপনার কর সার্কেল ও কর অঞ্চলের ঠিকানা লেখা থাকে।
২. আবেদনপত্র লিখুন। উপকর কমিশনার বরাবর আবেদনে যা রাখবেন:
- নাম, টিন নম্বর ও ঠিকানা
- কোন কোন কর বছরের রিটার্ন দাখিল হয়নি
- দাখিল না করার কারণ (যেমন: করযোগ্য আয় ছিল না, বাধ্যবাধকতা জানা ছিল না)
- ওই বছরগুলোর আয়ের উৎস ও আনুমানিক পরিমাণ
- জরিমানা মওকুফের সুস্পষ্ট অনুরোধ
৩. কাগজপত্র সংযুক্ত করুন। টিন সার্টিফিকেট, জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, আয়ের প্রমাণ (থাকলে) এবং চলতি বছরের রিটার্ন জমার স্বীকৃতিপত্র।
৪. অফিসে জমা দিয়ে রিসিভ কপি নিন। এই কপি পরবর্তী যোগাযোগে কাজে লাগবে।
৫. অফিসের নির্দেশনা মেনে চলুন। বকেয়া বছরের রিটার্ন কীভাবে দাখিল করবেন এবং পরের ধাপ কী, তা কর অফিস জানাবে।
যা মনে রাখা জরুরি
- “জিরো রিটার্ন” আইনি শব্দ নয়। করযোগ্য আয় না থাকলে সাধারণ রিটার্নেই প্রদেয় কর শূন্য দেখানো হয়।
- মওকুফ নিশ্চিত নয়। সিদ্ধান্ত কর্মকর্তার বিবেচনার ওপর নির্ভর করে। তবে করযোগ্য আয় না থাকা মওকুফের পক্ষে শক্ত যুক্তি।
- দালাল এড়িয়ে চলুন। “নিশ্চিত মওকুফ” করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবে সাড়া দেবেন না।
- নিয়মিত রিটার্ন দিন। আয় না থাকলেও প্রতি বছর সময়মতো রিটার্ন দিলে এ জটিলতা আর তৈরি হবে না।
প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন: সিস্টেমে জরিমানা দেখালে কি তা পরিশোধ করতেই হবে?
উত্তর: স্বয়ংক্রিয়ভাবে নয়। ধারা ২৬৬ অনুযায়ী জরিমানা আরোপ উপকর কমিশনারের বিবেচনার বিষয়, তাই আগে মওকুফের আবেদন করা যায়।
প্রশ্ন: আবেদন কোথায় জমা দেব?
উত্তর: টিন সার্টিফিকেটে উল্লিখিত কর সার্কেলের উপকর কমিশনারের দপ্তরে।
প্রশ্ন: সর্বোচ্চ কত জরিমানা হতে পারে?
উত্তর: নতুন করদাতার ক্ষেত্রে বছরে সর্বোচ্চ ৫,০০০ টাকা। আগে আয় নিরূপিত হয়ে থাকলে শেষ নিরূপিত করের ৫০% বা ১,০০০ টাকা, যেটি বেশি।

