পল্লী বিদ্যুতের মিটার স্থানান্তরের নিয়ম: আবেদন থেকে মিটার সরানো পর্যন্ত যা যা করতে হবে
এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পল্লী বিদ্যুতের মিটার স্থানান্তর করতে চাইলে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে আবেদন করতে হয়। শুধু মিটার খুলে নতুন জায়গায় বসিয়ে নেওয়া যায় না; নতুন স্থানের বৈদ্যুতিক ওয়্যারিং, তদন্ত, অনুমোদন এবং অফিসিয়াল মিটার অর্ডারের পরই স্থানান্তরের কাজ সম্পন্ন করা হয়।
গ্রাহকদের সুবিধার জন্য মিটার স্থানান্তরের পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে তুলে ধরা হলো।
প্রথমে নতুন স্থানে ওয়্যারিং সম্পন্ন করতে হবে
মিটার যে স্থানে স্থানান্তর করতে চান, সেখানে আগে বৈদ্যুতিক ওয়্যারিং সম্পন্ন করতে হবে। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, নতুন স্থানের ওয়্যারিং নিকটস্থ বিদ্যুৎ পোল থেকে সর্বোচ্চ ১৩০ ফুটের মধ্যে থাকা প্রয়োজন।
ওয়্যারিং করার সময় অবশ্যই নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। অনুমোদিত ইলেকট্রিশিয়ানের মাধ্যমে কাজ করানো হলে পরবর্তী তদন্ত ও অনুমোদনের ক্ষেত্রেও সুবিধা হয়।
অনুমোদিত ইলেকট্রিশিয়ানের ওয়্যারিং রিপোর্ট
ওয়্যারিং সম্পন্ন হওয়ার পর পল্লী বিদ্যুতের অনুমোদিত ইলেকট্রিশিয়ানের কাছ থেকে ওয়্যারিং রিপোর্ট সংগ্রহ করতে হবে। মিটার স্থানান্তরের কারণে সার্ভিস ড্রপ তারের দৈর্ঘ্য কমবে বা বাড়বে কি না, সেটিও রিপোর্টে উল্লেখ থাকতে পারে।
সার্ভিস ড্রপ তারের বিষয়ে গ্রাহকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অফিসে পর্যাপ্ত মজুত থাকলে সাধারণত প্রয়োজনীয় তার পল্লী বিদ্যুৎ অফিস থেকে সরবরাহ করা হয়। তবে কোনো কারণে অফিসে তার না থাকলে গ্রাহককে বাজার থেকে তার কিনতে হতে পারে। এমন ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী তারের মূল্য পরবর্তী বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে সমন্বয় করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারী বা অন্য কাউকে রশিদ ছাড়া টাকা দেওয়া উচিত নয়। সরকারি বা অফিসিয়াল কোনো ফি হলে অবশ্যই বৈধ রশিদ নিতে হবে।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করুন
মিটার স্থানান্তরের আবেদন করার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা ভালো। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী সাধারণত প্রয়োজন হবে—
- মিটারের সর্বশেষ পরিশোধিত বিদ্যুৎ বিলের কপি
- এক কপি রঙিন ছবি
- ভোটার আইডি কার্ডের ফটোকপি
- অনুমোদিত ইলেকট্রিশিয়ানের ওয়্যারিং রিপোর্ট
তবে গ্রাহকের সংযোগের ধরন বা সংশ্লিষ্ট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির স্থানীয় প্রক্রিয়া অনুযায়ী অতিরিক্ত কাগজপত্র প্রয়োজন হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট অফিসে প্রয়োজনীয় নথির সর্বশেষ তালিকা জেনে নেওয়া নিরাপদ।
পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে আবেদন
কাগজপত্র প্রস্তুত হলে সংশ্লিষ্ট পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে যেতে হবে। সেখানে ‘এক অবস্থানে সেবা’ ডেস্কে যোগাযোগ করে মিটার স্থানান্তরের আবেদন করতে হবে।
আবেদন করার পর অফিস থেকে একটি ইস্টিমেট বা প্রাক্কলন দেওয়া হতে পারে। এই ইস্টিমেট অনুযায়ী পরবর্তী ফি ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
সমীক্ষা ফি জমা
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী মিটার স্থানান্তরের ক্ষেত্রে ৪১৪ টাকা সমীক্ষা ফি জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ইস্টিমেট অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ক্যাশ শাখায় ফি জমা দিতে হবে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ফি জমা দেওয়ার পর অবশ্যই রশিদ সংগ্রহ করতে হবে এবং সেটি সংরক্ষণ করতে হবে। ভবিষ্যতে কোনো ধরনের অভিযোগ, যাচাই বা অর্থ প্রদানের প্রমাণের প্রয়োজন হলে এই রশিদ গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে কাজ করবে।
ওয়্যারিং তদন্ত ও অনুমোদন
আবেদন ও ফি জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নতুন স্থানের ওয়্যারিং পরীক্ষা বা তদন্ত করতে পারে। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে ওয়্যারিং তদন্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে বাস্তবে সময় অফিসের কাজের চাপ, সংযোগের ধরন, এলাকার পরিস্থিতি এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কারণে কম-বেশি হতে পারে।
তদন্তে ওয়্যারিং নিরাপদ ও নিয়মসম্মত পাওয়া গেলে আবেদন অনুমোদনের দিকে এগিয়ে যাবে। কোনো ত্রুটি থাকলে সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে।
CMO ইস্যু
আবেদন অনুমোদিত হওয়ার পর অফিস থেকে CMO বা Customer Meter Order ইস্যু করা হবে। এটি মিটার স্থানান্তরের পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অফিসিয়াল ধাপ।
অর্থাৎ, আবেদন করলেই সঙ্গে সঙ্গে মিটার সরানো হয় না। আবেদন যাচাই, ওয়্যারিং অনুমোদন এবং CMO ইস্যুর মতো ধাপ সম্পন্ন হওয়ার পর মাঠপর্যায়ে মিটার স্থানান্তরের কাজ হয়।
শেষ ধাপে মিটার স্থানান্তর
CMO ইস্যুর পর সংশ্লিষ্ট কর্মীরা নির্ধারিত স্থানে গিয়ে মিটার স্থানান্তরের কাজ সম্পন্ন করবেন। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদনের পর সাধারণত ৩ থেকে ৫ দিনের মধ্যে লাইনম্যান পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।
লাইনম্যান নির্ধারিত নতুন স্থানে গিয়ে নিরাপদভাবে মিটার স্থাপন করবেন এবং প্রয়োজনীয় সংযোগ সম্পন্ন করবেন।
তবে উল্লেখিত সময়সীমাগুলোকে সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত সময় হিসেবে না দেখে সম্ভাব্য সময় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। সংশ্লিষ্ট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যক্রম, জনবল, কাজের চাপ ও মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতির কারণে সময় পরিবর্তিত হতে পারে।
মিটার স্থানান্তরে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন
মিটার স্থানান্তরের সময় গ্রাহকের কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
প্রথমত, অনুমোদন ছাড়া নিজে মিটার খুলে অন্য স্থানে বসানো উচিত নয়। এতে বিদ্যুৎ সংযোগের নিরাপত্তা ও নিয়মভঙ্গের প্রশ্ন উঠতে পারে।
দ্বিতীয়ত, অনুমোদিত ইলেকট্রিশিয়ান দিয়ে ওয়্যারিং করানো এবং প্রয়োজনীয় রিপোর্ট সংগ্রহ করা গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, যেকোনো সরকারি বা অফিসিয়াল ফি জমা দেওয়ার সময় রশিদ নিতে হবে। রশিদ ছাড়া কাউকে টাকা দেওয়া উচিত নয়।
চতুর্থত, দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে কাজ করানোর পরিবর্তে সরাসরি সংশ্লিষ্ট পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের নির্ধারিত সেবা ডেস্কে যোগাযোগ করা উচিত।
পঞ্চমত, মিটার স্থানান্তরের আগে নতুন স্থানের ওয়্যারিং ও মিটার বসানোর উপযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি। এতে পরবর্তীতে তদন্তে সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা কমে।
এক নজরে পুরো প্রক্রিয়া
মিটার স্থানান্তরের প্রক্রিয়াটি সহজভাবে সাজালে দাঁড়ায়—
নতুন স্থানে ওয়্যারিং → অনুমোদিত ইলেকট্রিশিয়ানের রিপোর্ট → প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত → পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে আবেদন → ইস্টিমেট সংগ্রহ → সমীক্ষা ফি জমা → ওয়্যারিং তদন্ত → আবেদন অনুমোদন → CMO ইস্যু → লাইনম্যানের মাধ্যমে মিটার স্থানান্তর।
গ্রাহকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা
মিটার স্থানান্তর একটি অফিসিয়াল প্রক্রিয়া। তাই দ্রুত কাজ করানোর জন্য অননুমোদিত ব্যক্তি বা দালালের ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করাই নিরাপদ।
একই সঙ্গে ৪১৪ টাকা সমীক্ষা ফি, ১৩০ ফুটের মধ্যে নতুন ওয়্যারিং এবং ২–৩ দিনের তদন্ত বা ৩–৫ দিনের মধ্যে মিটার স্থানান্তরের মতো তথ্যগুলো সংশ্লিষ্ট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বর্তমান নিয়ম ও প্রযোজ্য ফি অনুযায়ী যাচাই করে নেওয়া উচিত, কারণ ফি, দূরত্বের শর্ত ও সেবার সময়সীমা সমিতিভেদে বা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে।
সবশেষে, গ্রাহকের হাতে আবেদন ও অর্থ প্রদানের রশিদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কপি রাখা উচিত। এতে মিটার স্থানান্তর সংক্রান্ত যেকোনো পরবর্তী জটিলতা মোকাবিলা করা সহজ হবে।

