Pay Fixation ফিক্সেশন

পে ফিক্সেশনে ৬ দফা সংশোধনের দাবি, ২০ অক্টোবরের সময়সীমা ঘিরে বাড়ছে চাপ—যে সমস্যাগুলোতে আটকে যেতে পারে বেতন নির্ধারণ

নবম জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ বা পে ফিক্সেশন কার্যক্রমে গতি আনার পাশাপাশি বিভিন্ন কারিগরি ও প্রশাসনিক জটিলতা সমাধানের দাবি উঠেছে। iBAS++ ব্যবস্থায় পে ফিক্সেশন করতে গিয়ে সার্ভারে প্রবেশের সমস্যা, পদবি ও দপ্তরের তথ্য খুঁজে না পাওয়া, বদলির তথ্য পূরণ এবং স্ত্রী-সন্তানের তথ্য পুনরায় দেওয়ার মতো বিষয়গুলো নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি। এসব সমস্যা সমাধানে ছয় দফা সংশোধনের আবেদন করা হয়েছে বলে ৯ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়।

অন্যদিকে, প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ৫ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া পে ফিক্সেশন কার্যক্রম ২০ অক্টোবরের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে নতুন কাঠামোয় প্রত্যেক কর্মচারীর মূল বেতন নির্ধারণ এবং প্রাপ্য বকেয়া অর্থের হিসাব। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করার পাশাপাশি তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করাও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পে ফিক্সেশনে কেন তৈরি হচ্ছে জটিলতা?

নতুন বেতন কাঠামোয় পে ফিক্সেশন অনলাইনে সম্পন্ন করার কারণে কর্মচারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের পাশাপাশি চাকরির ইতিহাস, বর্তমান গ্রেড, পূর্ববর্তী মূল বেতন, পদোন্নতি এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড ও উচ্চতর গ্রেডের তথ্য যাচাই করতে হচ্ছে।

কোনো তথ্য অনুপস্থিত থাকলে, আগের রেকর্ডের সঙ্গে নতুন তথ্যের অমিল হলে কিংবা প্রয়োজনীয় অপশন পাওয়া না গেলে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে বাড়তি সময় লাগতে পারে। এ কারণে শুধু অনলাইনে তথ্য পূরণ করাই যথেষ্ট নয়; সংশ্লিষ্ট চাকরির নথি ও অফিস আদেশের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখা জরুরি।

পে ফিক্সেশন সহজ করতে ছয় দফা সংশোধনের দাবি

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের ৯ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি iBAS++ ব্যবস্থায় ছয় দফা সংশোধনের আবেদন জানিয়েছে। প্রস্তাবগুলোর মূল লক্ষ্য হলো অপ্রয়োজনীয় ধাপ কমানো, তথ্য পূরণ সহজ করা এবং কারিগরি সমস্যার সমাধান করা।

১. পদবি ও দপ্তরের নাম লেখার সুযোগ: প্রথম যোগদানের পদবি বা দপ্তরের নাম তালিকায় না পাওয়া গেলে সরাসরি টাইপ করে লেখার সুবিধা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

২. বদলির তথ্যের প্রয়োজনীয়তা পুনর্বিবেচনা: বদলির তারিখ ও দপ্তরের তথ্য পূরণের বাধ্যবাধকতা পে ফিক্সেশন প্রক্রিয়ায় কতটা প্রয়োজনীয়, তা পর্যালোচনার দাবি জানানো হয়েছে।

৩. স্ত্রী-সন্তানের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত করা: আগে থেকে সংরক্ষিত তথ্য এনআইডির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আনার ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে একই তথ্য বারবার পূরণ করতে না হয়।

৪. অপ্রয়োজনীয় তথ্য ও অপশন কমানো: মূল বেতন নির্ধারণে প্রয়োজনীয় তথ্য অক্ষুণ্ন রেখে অতিরিক্ত ধাপ ও অপশন কমানোর দাবি জানানো হয়েছে।

৫. সাবস্ট্যানটিভ গ্রেড ও ভাতা প্রদর্শনের সমস্যা সমাধান: সাবস্ট্যানটিভ গ্রেড এবং বর্তমানে কর্মরত গ্রেডের পার্থক্যের কারণে ভাতা প্রদর্শনে যে জটিলতা দেখা যাচ্ছে, তা সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

৬. পুরো প্রক্রিয়া আরও সহজ ও কার্যকর করা: ব্যবহারকারীদের জন্য পোর্টালকে সহজবোধ্য করা, প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণের সুবিধা বাড়ানো এবং সিস্টেমের ত্রুটি কমানোর দাবি জানানো হয়েছে।

এসব প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট সমিতির আবেদন হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। কর্তৃপক্ষ সবগুলো দাবি অনুমোদন করেছে বা কার্যকর করেছে—এমন নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

২০ অক্টোবরের মধ্যে পে ফিক্সেশন শেষ করতে কী করবেন?

প্রকাশিত নির্দেশনার আলোকে কর্মচারীদের প্রথমেই iBAS++ পোর্টালে প্রবেশ করে নিজের তথ্য যাচাই করতে হবে। এরপর ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মূল বেতন, বর্তমান পদ ও গ্রেড, চাকরিতে যোগদানের তারিখ এবং পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণের তথ্য মিলিয়ে দেখতে হবে।

পদোন্নতি, টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড বা উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা পেয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট আদেশ ও নথিও প্রস্তুত রাখতে হবে। তথ্যের অমিল দেখা দিলে অনুমান করে নতুন তথ্য না দিয়ে নিজ দপ্তরের প্রশাসন শাখা অথবা সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের সহায়তা নেওয়া উচিত।

পোর্টালে কোনো অপশন না পাওয়া গেলে কিংবা অফিসের জন্য মডিউল চালু না থাকলে বারবার ভুল তথ্য জমা না দিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন।

উচ্চতর গ্রেড ও পুরোনো বেতন নির্ধারণে বিশেষ সতর্কতা

পে ফিক্সেশনের ক্ষেত্রে আগের বেতন কাঠামোয় পাওয়া সুবিধাগুলোর হিসাব বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। যুগান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একই পদে আগে একাধিক টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড বা উচ্চতর গ্রেড পাওয়া কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নতুন কাঠামোয় আবার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ নিয়ে বিধানগত জটিলতা রয়েছে।

তাই শুধু বর্তমান গ্রেড দেখে নতুন বেতন নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। কর্মচারী কখন নিয়োগ পেয়েছেন, কখন পদোন্নতি হয়েছে, আগে কোন সুবিধা পেয়েছেন এবং সেই সুবিধার কার্যকর তারিখ কী ছিল—এসব তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

কোনো কর্মচারীর বেতন প্রত্যাশার চেয়ে কম দেখালে সেটি সিস্টেমের ভুল, নাকি আগের বেতন নির্ধারণ ও চাকরির ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত—তা যাচাই না করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে বকেয়া পাওয়ার সম্ভাবনা

যুগান্তরের ৬ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পে ফিক্সেশন সম্পন্ন হওয়ার পর অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গে প্রায় তিন মাসের বকেয়া দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। তবে এটি প্রত্যেক কর্মচারীর জন্য নিশ্চিত বা সমপরিমাণ পাওনার নিশ্চয়তা নয়; চূড়ান্ত অর্থ নির্ভর করবে প্রযোজ্য বিধান, নির্ধারিত মূল বেতন এবং কার্যকর তারিখের ওপর।

নতুন ও পুরোনো মূল বেতনের পার্থক্য, প্রযোজ্য ধাপে বেতন বাস্তবায়নের নিয়ম এবং ব্যক্তিগত চাকরির রেকর্ড যাচাই করে বকেয়া নির্ধারণ করতে হবে। তাই পে ফিক্সেশন সম্পন্ন হওয়ার আগে নির্দিষ্ট অঙ্কের বকেয়া পাওয়ার দাবি নিশ্চিত ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

তথ্যের নিরাপত্তা ও সরকারি পোর্টাল ব্যবহারে সতর্কতা

পে ফিক্সেশন করতে গিয়ে কর্মচারীদের এনআইডি, জন্মতারিখ, নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর এবং বেতনসংক্রান্ত তথ্য দিতে হতে পারে। এ কারণে শুধু সরকারি iBAS++ পোর্টাল ব্যবহার করা এবং কোনো অননুমোদিত ওয়েবসাইটে ব্যক্তিগত তথ্য না দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।

সরকারি পোর্টাল: https://ibas.finance.gov.bd/

সাবমিটের পর প্রাপ্ত নিশ্চিতকরণ বার্তা, যাচাই নম্বর বা প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে। তথ্যগত সমস্যা হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের মাধ্যমে সমাধান নিতে হবে।

শেষ কথা

পে ফিক্সেশন কার্যক্রমের সাফল্য নির্ভর করছে তিনটি বিষয়ের ওপর—iBAS++ ব্যবস্থার কার্যকারিতা, কর্মচারীদের তথ্যের নির্ভুলতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সময়মতো যাচাই। ছয় দফা সংশোধনের আবেদন বাস্তবায়িত হলে তথ্য পূরণ ও সিস্টেম ব্যবহারের কিছু জটিলতা কমতে পারে। তবে আবেদন আর অনুমোদিত সিদ্ধান্ত এক নয়; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত প্রস্তাবগুলোকে দাবি হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নির্ধারিত সময়সীমা অনুসরণ করা, চাকরির নথি ও পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণের তথ্য যাচাই করা এবং কোনো অসংগতি দেখা দিলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের সহায়তা নেওয়া। এতে ভুল বেতন নির্ধারণ ও বকেয়া হিসাবের জটিলতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *