সরকারি আপডেট নিউজ

শতভাগ পেনশন সমর্পণ সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্ত: আর্থিক লোকসানের মুখে অবসরপ্রাপ্তরা?

২০১৭ সালে জারিকৃত সরকারের এক প্রজ্ঞাপনের কারণে আজ লাখ লাখ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী তীব্র আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শতভাগ পেনশন সমর্পণের (১০০% কমিউটেশন) ঐতিহাসিক সুবিধা বাতিল করে ৫০% বাধ্যতামূলক সমর্পণ এবং অবশিষ্ট ৫০% মাসিক পেনশন আকারে দেওয়ার নিয়ম চালুর ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, তাদের কষ্টার্জিত জমানো টাকা সরকারের কাছে আটকে থাকায় তারা প্রতি মাসে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

প্রজ্ঞাপনের মূল প্রেক্ষাপট ও আইনি দিক

সংযুক্ত সরকারি নথি থেকে দেখা যায়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ (প্রবিধি অনুবিভাগ, প্রবিধি শাখা-১) কর্তৃক ২০১৭ সালের এক প্রজ্ঞাপনে (নম্বর: ০৭.০০.০০০০.১৭১.১৩.০০৫.১৬-০৬) পেনশন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আনা হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে অতিরিক্ত সচিব মো. মনির উদ্দিন স্বাক্ষরিত এই আদেশে বলা হয়:

  • বাধ্যতামূলক ৫০% সমর্পণ: সরকারি কর্মচারীগণের (বেসামরিক/সামরিক) গ্রস পেনশনের শতকরা ১০০ ভাগ সমর্পণের সুবিধা বাতিল করে শতকরা ৫০ ভাগ বাধ্যতামূলক সমর্পণ এবং অবশিষ্ট শতকরা ৫০ ভাগের জন্য নির্ধারিত হারে মাসিক পেনশন গ্রহণের বিধান প্রবর্তন করা হয়। এই বিধান ১ জুলাই ২০১৭ থেকে কার্যকর করা হয়েছে।

  • বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট: পেনশনার বা পারিবারিক পেনশনারগণ মাসিক পেনশনের ওপর প্রতি বছর ১ জুলাই থেকে ৫% হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পাবেন।

সরকারের পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপকে পেনশনারদের দীর্ঘমেয়াদি ‘আর্থিক ও সামাজিক সুরক্ষা’ নিশ্চিত করার প্রয়াস হিসেবে দাবি করা হলেও, বাস্তবে এটি অনেক অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীর জন্য আর্থিক বৈষম্যের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আর্থিক বিশ্লেষণ: সঞ্চয়পত্র বনাম সরকারি মাসিক পেনশন

একজন ভুক্তভোগী পেনশনারের বাস্তব উদাহরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকারের এই নীতি কীভাবে অবসরকালীন সঞ্চয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ধরা যাক, একজন কর্মচারীর আনুমানিক ৫০ লক্ষ টাকা (অবশিষ্ট ৫০%) সরকারের কাছে বাধ্যতামূলকভাবে জমা রয়েছে, যার বিপরীতে তিনি প্রতি মাসে ২৩,০০০ টাকা মাসিক পেনশন পাচ্ছেন। বর্তমান আর্থিক বাজারের সাথে এর তুলনা করলে চিত্রটি নিম্নরূপ দাঁড়ায়:

বিনিয়োগের খাত মূলধন (টাকা) আনুমানিক মাসিক আয় (টাকা) মেয়াদ শেষে মূলধনের অবস্থা
বর্তমান সরকারি পেনশন (৫০%) ৫০,০০,০০০/- (আনুমানিক) ২৩,০০০/- মৃত্যুর পর বা নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী সমাপিত (মূল টাকা ফেরতযোগ্য নয়)
পেনশনার সঞ্চয়পত্র (১১.৫২%*) ৫০,০০,০০০/- আনুমানিক ৪৫,০০০/- থেকে ৪৭,০০০/- ৫০ লক্ষ টাকা অক্ষুণ্ণ থাকবে
ব্যাংক স্থায়ী আমানত (FDR) ৫০,০০,০০০/- আনুমানিক ৪০,০০০/- থেকে ৪২,০০০/- ৫০ লক্ষ টাকা অক্ষুণ্ণ থাকবে

সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ও ট্যাক্স কর্তনের ওপর ভিত্তি করে হিসাব সামান্য পরিবর্তিত হতে পারে।

উপরোক্ত বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট যে, বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় এই ৫০ লক্ষ টাকা যদি কোনো পেনশনার নিজের নিয়ন্ত্রণে পেতেন এবং তা সরকারি সঞ্চয়পত্র বা কোনো তফসিলি ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট (FDR) করতেন, তবে তিনি প্রতি মাসে ৪০,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত মুনাফা পেতেন। সবচেয়ে বড় বিষয়, তাঁর মূল ৫০ লক্ষ টাকাও সম্পূর্ণ নিরাপদ ও অক্ষুণ্ণ থাকতো, যা তিনি পরবর্তীতে তাঁর পরিবারের যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে (যেমন: চিকিৎসা, সন্তানদের উচ্চশিক্ষা বা আবাসন) ব্যবহার করতে পারতেন।

পেনশনারদের ক্ষোভ ও ন্যায্য অধিকারের দাবি

অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের একাংশের মতে, চাকরি শেষে গ্রস পেনশনের পুরো টাকা এককালীন তুলে নেওয়া তাদের একটি আইনগত ও ন্যায্য অধিকার হওয়া উচিত। তাদের যুক্তি, পেনশনের টাকা কোনো দয়া বা অনুদান নয়, এটি দীর্ঘ কর্মজীবনের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল।

মাসিক পেনশনের সাথে ৫% ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হলেও বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে তা জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। ভুক্তভোগীদের দাবি—যেহেতু টাকাটি তাদের নিজেদের, তাই সেটি কীভাবে বিনিয়োগ বা ব্যবহার করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা তাদের থাকা উচিত। শতভাগ টাকা এককালীন ফেরত পেলে তারা বর্তমান বয়সে এসে অনেক বেশি আর্থিক স্বাধীনতার সাথে সচ্ছলভাবে জীবনযাপন করতে পারতেন।

বিশেষজ্ঞ মতামত

অর্থনীতিবিদদের মতে, ২০১৭ সালের এই প্রজ্ঞাপনটির মূল উদ্দেশ্য ছিল অবসরপ্রাপ্তদের এককালীন টাকা অপচয় থেকে রক্ষা করা এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক মন্দা ও ব্যাংকিং খাতে আমানতের সুদের হার বৃদ্ধির কারণে, সরকারের দেওয়া মাসিক পেনশনের রিটার্ন ওপেন মার্কেটের তুলনায় বেশ কম। ফলে, পেনশনাররা নিজেদের বঞ্চিত মনে করছেন। এই ব্যবস্থার সংস্কার করে পেনশনারদের একটি নির্দিষ্ট অংশকে বিশেষ বিবেচনায় পূর্ণ টাকা উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া অথবা মাসিক পেনশনের হার বাজার ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার বিষয়টি সরকার পুনর্বিবেচনা করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *