শিশুর টিকাদান কার্ডে সংরক্ষণ করুন সব তথ্য, কোন বয়সে কোন টিকা দিতে হবে জেনে নিন
শিশুর জন্মের পর থেকেই তার সুস্বাস্থ্য ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলতে নিয়ম অনুযায়ী টিকা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। হাম, পোলিও, যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, ডিপথেরিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে টিকাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ জন্য শিশুর অভিভাবকদের টিকাদানের সময়সূচি জানা এবং প্রতিটি ডোজের তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)-এর আওতায় শিশুদের বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে নির্ধারিত বয়সে টিকা দেওয়া হয়। শিশুর টিকাদান কার্ডে এসব টিকার নাম, ডোজ দেওয়ার তারিখ এবং পরবর্তী টিকা গ্রহণের তথ্য লিপিবদ্ধ করা হয়। ফলে শিশুকে কখন কোন টিকা দিতে হবে, তা সহজেই জানা যায়।
সম্প্রতি প্রকাশিত শিশুর টিকাদান কার্ডের তথ্য অনুযায়ী, জন্মের পর থেকে শিশুর বিভিন্ন বয়সে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে টিকার সুনির্দিষ্ট সময়সূচি অনুসরণের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের বর্তমান সরকারি নির্দেশনা ও টিকাদান কেন্দ্রের পরামর্শকে গুরুত্ব দিতে হবে।
শিশুর টিকাদান কার্ডে কী কী তথ্য থাকে?
শিশুর টিকাদান কার্ডে সাধারণত তার ব্যক্তিগত পরিচয়, জন্মসংক্রান্ত তথ্য, ঠিকানা এবং টিকাদানের বিবরণ সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকে। কার্ডটি পূরণের সময় প্রতিটি তথ্য নির্ভুলভাবে লেখা গুরুত্বপূর্ণ।
কার্ডে সাধারণত যেসব তথ্য উল্লেখ করা হয়, সেগুলো হলো—
- শিশুর নাম ও জন্মতারিখ।
- নিবন্ধন নম্বর ও নিবন্ধনের তারিখ।
- মা ও বাবার নাম।
- বাড়ি, গ্রাম, মহল্লা বা এলাকার নাম।
- ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, উপজেলা ও জেলার তথ্য।
- টিকাদান কেন্দ্রের নাম।
- টিকা প্রদানকারী স্বাস্থ্যকর্মীর নাম ও যোগাযোগের তথ্য।
- কোন টিকা কত তারিখে দেওয়া হয়েছে, তার বিবরণ।
এসব তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হলে শিশুর টিকাদানের ইতিহাস যাচাই করা এবং পরবর্তী ডোজের সময় নির্ধারণ করা সহজ হয়।
জন্মের পর কোন কোন টিকা গুরুত্বপূর্ণ?
শিশুর বয়স ও জাতীয় টিকাদান সূচি অনুযায়ী বিভিন্ন টিকা দেওয়া হয়। কার্ডে উল্লেখিত গুরুত্বপূর্ণ টিকাগুলোর কাজ সম্পর্কে অভিভাবকদের ধারণা থাকা প্রয়োজন।
বিসিজি (BCG): যক্ষ্মার বিশেষ করে শিশুদের গুরুতর ধরনের যক্ষ্মা প্রতিরোধে এই টিকা দেওয়া হয়।
পেন্টাভ্যালেন্ট: ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস-বি এবং হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-বি সংক্রমণের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়।
ওপিভি (OPV): মুখে খাওয়ানোর এই টিকা পোলিও প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়। পোলিও আক্রান্ত হলে শিশুর স্থায়ী পক্ষাঘাত হতে পারে।
পিসিভি (PCV): নিউমোকক্কাল ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্ট নিউমোনিয়া, মেনিনজাইটিসসহ গুরুতর সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
আইপিভি (IPV): ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া এই টিকাও পোলিও প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এমআর (MR): হাম ও রুবেলা প্রতিরোধে এই টিকা দেওয়া হয়। এসব রোগ থেকে সুরক্ষার জন্য নির্ধারিত ডোজ সম্পন্ন করা প্রয়োজন।
টিকার তারিখ ও ডোজ সংরক্ষণে সতর্কতা
টিকাদান কার্ডে শুধু টিকার নাম থাকলেই যথেষ্ট নয়; প্রতিটি ডোজ দেওয়ার তারিখও সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি। এতে শিশুর কোন টিকা সম্পন্ন হয়েছে এবং কোনটি বাকি রয়েছে, তা সহজে বোঝা যায়।
অভিভাবকদের করণীয়—
১. প্রতিবার টিকা দেওয়ার সময় কার্ড সঙ্গে নিতে হবে।
২. টিকা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ঘরে তারিখ লেখা হয়েছে কি না, যাচাই করতে হবে।
৩. পরবর্তী ডোজের তারিখ স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে জেনে নিতে হবে।
৪. কার্ডটি শুকনো ও নিরাপদ স্থানে রাখতে হবে।
৫. কার্ড হারিয়ে গেলে আগের টিকাদানের তথ্য সংগ্রহের জন্য সংশ্লিষ্ট টিকাদান কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
নির্ধারিত দিনে টিকা দিতে না পারলে কী করবেন?
অনেক সময় অসুস্থতা, যাতায়াতের সমস্যা বা অন্য কোনো কারণে শিশুকে নির্ধারিত দিনে টিকা দেওয়া সম্ভব হয় না। এমন পরিস্থিতিতে টিকাদান পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া উচিত নয়।
যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ সরকারি টিকাদান কেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মী শিশুর বয়স, আগে নেওয়া টিকার ডোজ এবং বর্তমান জাতীয় নির্দেশিকা অনুযায়ী পরবর্তী করণীয় জানাবেন।
কোনো ডোজ বাদ পড়লে সাধারণত আগের সব ডোজ নতুন করে শুরু করার প্রয়োজন হয় না। তবে কোন টিকা কখন দিতে হবে, তা শিশুর টিকাদানের ইতিহাস দেখে স্বাস্থ্যকর্মী নির্ধারণ করবেন।
টিকা দেওয়ার পর শিশুর যত্ন কীভাবে নেবেন?
টিকা দেওয়ার পর শিশুর সামান্য জ্বর, ব্যথা বা ইনজেকশনের স্থানে ফোলা দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এসব উপসর্গ স্বাভাবিকভাবে কমে যায়। তবে শিশুর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
শিশুর শ্বাসকষ্ট, মুখ বা গলা ফুলে যাওয়া কিংবা অন্য কোনো গুরুতর প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। শিশুকে জ্বরের ওষুধ দেওয়ার প্রয়োজন হলে বয়স ও ওজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
অভিভাবকদের জন্য বিশেষ পরামর্শ
শিশুর টিকাদান কার্ড ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য-নথি। তাই শিশুকে টিকা দেওয়ার প্রতিবার কার্ডটি সঙ্গে নেওয়া এবং টিকাদানের তথ্য হালনাগাদ রাখা প্রয়োজন। কোনো তথ্য নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দিলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পুরোনো তালিকার পরিবর্তে সরকারি টিকাদান কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
এ ছাড়া টিকার বয়স, ডোজের সংখ্যা কিংবা জাতীয় কর্মসূচিতে পরিবর্তন এলে পুরোনো কার্ডের সময়সূচি সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নাও হতে পারে। সে কারণে শিশুর টিকাদান সম্পন্ন করার আগে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে সময়সূচি মিলিয়ে নেওয়া ভালো।
শেষ কথা
শিশুর সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সময়মতো টিকা দেওয়া এবং টিকাদানের তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টিকাদান কার্ডের মাধ্যমে অভিভাবকেরা শিশুর টিকার অগ্রগতি জানতে পারেন এবং কোনো ডোজ বাদ পড়লে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন।
তাই জন্মের পর থেকেই শিশুর টিকাদান কার্ড যত্নসহকারে সংরক্ষণ করুন, নির্ধারিত সময়ে টিকা দিন এবং সর্বশেষ সরকারি নির্দেশনা সম্পর্কে জানতে নিকটস্থ ইপিআই কেন্দ্র বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নিন।

