একাধিক বিয়ে নিয়ে বাংলাদেশের আইন ২০২৬ । দ্বিতীয় বিয়ে করতে কি প্রথম বউয়ের অনুমতির বিধান রয়েছে?
বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন এবং ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতির বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টিকে দুইভাবে দেখা যেতে পারে: আইনি বাধ্যবাধকতা এবং ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি।
১. বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী
১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, প্রথম স্ত্রী থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক:
-
সালিশি পরিষদের অনুমতি: দ্বিতীয় বিয়ে করতে চাইলে বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীগণের অনুমতি নিয়ে একটি নির্দিষ্ট ফরমের মাধ্যমে ‘সালিশি পরিষদ’-এর কাছে আবেদন করতে হয়।
-
যুক্তিসঙ্গত কারণ: সালিশি পরিষদ খতিয়ে দেখে যে দ্বিতীয় বিয়ের কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ (যেমন: প্রথম স্ত্রীর দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা বা বন্ধ্যাত্ব) আছে কি না।
-
শাস্তি: যদি কোনো ব্যক্তি প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া বা সালিশি পরিষদের অনুমতি না নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তবে তিনি আইনত অপরাধী সাব্যস্ত হবেন। এক্ষেত্রে:
-
তাকে অবিলম্বে মোহরানার সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করতে হবে।
-
আদালত তাকে এক বছর পর্যন্ত জেল বা ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা (বা উভয় দণ্ড) দিতে পারে।
-
২. ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী
ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী একজন পুরুষ সর্বোচ্চ চারটি বিয়ে করতে পারেন, তবে এর জন্য কঠোর শর্ত রয়েছে:
-
সমতা বা ইনসাফ: পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, যদি কেউ একাধিক স্ত্রীর মধ্যে ইনসাফ বা সমান অধিকার (ভরণপোষণ, সময় কাটানো ও আচরণে সমতা) নিশ্চিত করতে না পারে, তবে তার জন্য একটির বেশি বিয়ে করা জায়েজ নয়।
-
অনুমতি: শরীয়াহ অনুযায়ী দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রথম স্ত্রীর “অনুমতি” নেওয়া বাধ্যতামূলক বা শর্ত নয়, তবে প্রথম স্ত্রীকে অবহিত করা এবং তার হক নষ্ট না করার ব্যাপারে কড়া নির্দেশ রয়েছে। তবে বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে পারিবারিক শান্তি বজায় রাখার জন্য আলোচনা করে নেওয়াকে ওলামায়ে কেরাম উত্তম মনে করেন।
সারসংক্ষেপ
সংক্ষেপে বলতে গেলে, বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী প্রথম স্ত্রীর অনুমতি বা সালিশি পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা দণ্ডনীয় অপরাধ। যদিও ধর্মীয়ভাবে বিয়ের বৈধতা পাওয়া যায়, কিন্তু আইনি জটিলতা ও শাস্তির হাত থেকে বাঁচতে অনুমতি নেওয়া আবশ্যক।
প্রথম বউকে না জানিয়ে বিয়ে করলে কি আদালতে মামলা দিতে পারবে?
হ্যাঁ, প্রথম স্ত্রীকে না জানিয়ে বা তার অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে প্রথম স্ত্রী অবশ্যই আদালতে মামলা করতে পারবেন। বাংলাদেশের ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ অনুযায়ী এটি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ।
এক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রী যে ধরনের আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেন বা স্বামী যে আইনি সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন তা নিচে দেওয়া হলো:
১. মামলা দায়ের: প্রথম স্ত্রী বা তার পক্ষ থেকে সালিশি পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করার অপরাধে ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে মামলা করা যায়।
২. কারাদণ্ড ও জরিমানা: দোষী সাব্যস্ত হলে আদালত স্বামীকে এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা (বা উভয় দণ্ড) দিতে পারে।
৩. মোহরানা পরিশোধ: দ্বিতীয় বিয়ে করার সাথে সাথে প্রথম স্ত্রীর দেনমোহরের সম্পূর্ণ টাকা (যদি বাকি থাকে) তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করতে স্বামী বাধ্য থাকবেন। স্ত্রী চাইলে বকেয়া মোহরানা আদায়ের জন্য পারিবারিক আদালতেও মামলা করতে পারেন।
৪. তালাকের অধিকার: যদি বিয়ের সময় নিকাহনামার ১৮ নম্বর ঘরে স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা (তালাকে তাফভিজ) দেওয়া থাকে, তবে স্বামী অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করার কারণে স্ত্রী তাকে তালাক দিতে পারেন। এছাড়া ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন অনুযায়ী এটি বিবাহ বিচ্ছেদের একটি কারণ হতে পারে।
৫. ভরণপোষণ: দ্বিতীয় বিয়ে করলেও স্বামী প্রথম স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকবেন। যদি ভরণপোষণ না দেন, তবে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা করে তা আদায় করতে পারবেন।
সারসংক্ষেপ: অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে বিয়েটি বাতিল হয়ে যায় না, তবে এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং এর ফলে স্বামী আইনি ও আর্থিক উভয় সংকটে পড়তে পারেন।
সতর্কবার্তা: এটি একটি সাধারণ আইনি তথ্য। সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করা জরুরি।
সোর্স দেখুন: http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-305.html?lang=bn

