মাথাপিছু আয়ে এগিয়ে থেকেও কেন বেতনে পিছিয়ে? ২০ হাজার টাকা সর্বনিম্ন বেতনের দাবি এখন গণদাবিতে পরিণত
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এখন দক্ষিণ এশিয়ায় এক বিস্ময়। ২০২৫ সালের প্রাক্কলন অনুযায়ী, দেশের মাথাপিছু আয় ২,৭৮৪ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা প্রতিবেশী পাকিস্তানের (১,৭০৭ ডলার) চেয়ে অনেক বেশি এবং ভারতের (২,৮০০ ডলার) প্রায় সমান। কিন্তু এই অভাবনীয় উন্নতির সুফল কি সরকারি কর্মচারীরা পাচ্ছেন? পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। বর্তমানে সর্বনিম্ন ৮,২৫০ টাকা মূল বেতন নিয়ে জীবন যাপন করা কেবল কঠিন নয়, বরং অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ২০,০০০ টাকা সর্বনিম্ন মূল বেতন নির্ধারণ করা এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার জন্য এক অপরিহার্য দাবি।
আঞ্চলিক বৈষম্য: কেন আমরা পিছিয়ে?
দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশের আয় ও বেতনের তুলনা করলে বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত কর্মচারীদের বঞ্চনার চিত্র পরিষ্কার হয়:
পাকিস্তান: মাথাপিছু আয়ে বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও তাদের সরকারি কর্মচারীদের সর্বনিম্ন বেতন বাংলাদেশের দ্বিগুণ (১৬,২৩৭ টাকা)।
ভারত: মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের সমান হলেও তাদের সর্বনিম্ন বেতন ৩ গুণ বেশি (২৪,০৪৫ টাকা)।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাথাপিছু আয়ে ভারতকে ছুঁইছুঁই করলেও বেতন কাঠামোতে আমরা পাকিস্তানের চেয়েও পেছনে পড়ে আছি। এটি সরাসরি দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানকে আঘাত করছে।
২০,০০০ টাকা কি খুব বেশি? বাস্তবতার নিরিখে বিশ্লেষণ
বর্তমান বাজার দরে এক কেজি চাল কিনতে খরচ হয় ৭০-৮০ টাকা, এক লিটার তেল ১৬০-১৮০ টাকা। ২০২৬ সালের মুদ্রাস্ফীতির হিসাব আমলে নিলে ৮,২৫০ টাকা মূল বেতন দিয়ে একটি পরিবারের ডাল-ভাতের সংস্থান করাও দায়। ২০,০০০ টাকা মূল বেতন নির্ধারণ করা হলে বাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য ভাতা মিলিয়ে একজন কর্মচারীর হাতে মাসিক ৩৫-৪০ হাজার টাকা আসবে। ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো ব্যয়বহুল শহরে একটি চার সদস্যের পরিবারের সাধারণ জীবন যাপনের জন্য এটিই বর্তমান সময়ের ‘মিনিমাম লিভিং ওয়েজ’ বা জীবনধারণের উপযোগী মজুরি।
বেতন বৃদ্ধির সুফল: দুর্নীতি হ্রাস ও সক্ষমতা বৃদ্ধি
প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন কর্মচারীর বৈধ আয় যখন তার পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়, তখন প্রশাসনে অসততা ও অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। বেতন সম্মানজনক পর্যায়ে উন্নীত করলে: ১. সরকারি কাজে গতিশীলতা বাড়বে। ২. দুর্নীতির প্রবণতা কমবে। ৩. মেধাবীরা সরকারি চাকরিতে আরও বেশি আগ্রহী হবে। ৪. বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়বে, যা অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে আরও চাঙ্গা করবে।
উপসংহার
বাংলাদেশের জিডিপি এবং মাথাপিছু আয়ের যে উল্লম্ফন আমরা দেখছি, তার সত্যিকারের প্রতিফলন ঘটাতে হলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামোর আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। ২০,০০০ টাকা সর্বনিম্ন বেতন দাবি করা কর্মচারীদের মতে, “উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ থাকলেও আমরা পড়ে আছি ২০১৫ সালের মান্ধাতা আমলের বেতন কাঠামোতে।” এখন সময় এসেছে এই বৈষম্য দূর করে একটি আধুনিক ও ইনক্লুসিভ বেতন কাঠামো গড়ার।

