সরকারি কেনাকাটায় স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আনবে ‘পিপিআর-২০২৫’: গুরুত্বপূর্ণ বিধিমালা একনজরে
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি প্রণয়ন করেছে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) ২০২৫’। সরকারি কেনাকাটা, নির্মাণ কাজ এবং সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোই এই নতুন বিধিমালার মূল লক্ষ্য। পেশাজীবী এবং সংশ্লিষ্ট মহলে এই বিধিমালা নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। পিপিআর ২০২৫-এর গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক এবং প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের উত্তর নিয়ে সাজানো হয়েছে আজকের প্রতিবেদন।
ক্রয় ও স্টেকহোল্ডারদের সংজ্ঞা
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, শুধুমাত্র সরাসরি ক্রয়ই নয়, বরং কোনো পণ্য, কার্য বা সেবা ভাড়া করাও ক্রয় হিসেবে বিবেচিত হবে। এছাড়া কেনাকাটার প্রক্রিয়ায় যুক্ত ব্যক্তিদের তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়েছে:
-
ঠিকাদার: যারা নির্মাণ বা কার্যসম্পাদনের জন্য চুক্তিবদ্ধ হন।
-
সরবরাহকারী: যারা পণ্য ও সংশ্লিষ্ট সেবা সরবরাহ করেন।
-
সেবা প্রদানকারী: যারা ভৌত সেবা প্রদানের জন্য চুক্তিবদ্ধ হন।
উল্লেখ্য যে, বিদ্যুৎ এবং অফ-দ্য-শেলফ কম্পিউটার সফটওয়্যারকেও পণ্য হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও কমিটি গঠন
ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতে পিপিআর ২০২৫-এ বেশ কিছু কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিধি ১১ (১৪) অনুযায়ী, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্যদের ব্যক্তিগতভাবে পক্ষপাতহীনতার ঘোষণা এবং যৌথভাবে একটি প্রত্যয়নপত্র স্বাক্ষর করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়ম হলো, মূল্যায়ন কমিটির কোনো সদস্য সংশ্লিষ্ট কারিগরি সাব-কমিটির অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন না। এছাড়া, কারিগরি পরিদর্শন ও গ্রহণ কমিটি অনধিক ৩ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হবে।
ক্রয় পরিকল্পনা ও প্রাক্কলন
নতুন বিধিতে ক্রয় পরিকল্পনা (Procurement Plan) প্রণয়ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দরপত্র আহ্বানের পূর্বেই দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয় প্রস্তুত করতে হবে এবং এটি সিলগালা অবস্থায় রাখতে হবে। এই প্রাক্কলিত ব্যয় দরপত্র খোলার ঠিক আগমুহূর্তে উন্মুক্তকরণ কমিটির নিকট হস্তান্তর করতে হবে, যা সভায় সবার সামনে ঘোষণা করা হবে।
জামানত ও আর্থিক নিরাপত্তা
দরপত্র দাতার যোগ্যতা ও আন্তরিকতা নিশ্চিতে জামানতের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে:
-
দরপত্র জামানত: সাধারণত প্রাক্কলিত মূল্যের সর্বোচ্চ ৩% বা আইটেম ভিত্তিক দরপত্রের ক্ষেত্রে উদ্ধৃত মূল্যের ন্যূনতম ২%। এই জামানত বৈধতার মেয়াদের পর আরও অন্তত ২৮ দিন কার্যকর থাকতে হবে।
-
কার্যসম্পাদন জামানত (Performance Security): চুক্তিমূল্যের ৫% থেকে ১০% পর্যন্ত হতে পারে। তবে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত নির্মাণ কাজের ক্ষেত্রে এটি দাখিলের প্রয়োজন হবে না। এক্ষেত্রে বিল থেকে ১০% টাকা নিরাপত্তা জামানত হিসেবে কর্তন করা যাবে।
ফ্রন্ট লোডিং (Front Loading) ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা
ঠিকাদারি ব্যবসায় প্রকল্পের শুরুতে অস্বাভাবিক অর্থ উত্তোলন বা ‘ফ্রন্ট লোডিং’ একটি আলোচিত বিষয়। পিপিআর ২০২৫ অনুযায়ী, ফ্রন্ট লোডিংয়ের ক্ষেত্রে চুক্তিসংশ্লিষ্ট জামানতের পরিমাণ চুক্তিমূল্যের সর্বাধিক ২৫% পর্যন্ত হতে পারে। এটি ক্রয়কারীর আর্থিক ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করবে।
দরপত্র দাখিল ও বিজ্ঞাপনের সময়সীমা
উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে (OTM) অভ্যন্তরীণ ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রাক্কলিত মূল্যের ভিত্তিতে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে:
-
১ কোটি টাকা পর্যন্ত: ন্যূনতম ১০ দিন।
-
১ কোটি থেকে ৫ কোটি টাকা: ন্যূনতম ১৪ দিন।
-
৩০ কোটি টাকার বেশি: ন্যূনতম ২৮ দিন।
-
জরুরি প্রয়োজনে: ন্যূনতম ৭ দিন।
সরাসরি ক্রয় ও বিশেষ পদ্ধতি
কোটেশন প্রদান পদ্ধতি (RFQ) এবং সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির (DPM) ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনের প্রয়োজন নেই, তবে এক্ষেত্রে ক্রয়কারী কার্যালয় প্রধানের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক। কোটেশনের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৫টি প্রতিষ্ঠানকে অনুরোধ জানাতে হবে এবং অন্তত ৩টি রেসপনসিভ কোটেশন থাকতে হবে। ফেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্টের মেয়াদ সর্বোচ্চ ৩ বছর পর্যন্ত হতে পারবে।
উপসংহার
পিপিআর ২০২৫-এর মাধ্যমে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় কারিগরি বিনির্দেশে নির্দিষ্ট কোনো ব্র্যান্ড বা দেশের নাম উল্লেখ করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে, যা প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করবে। তবে ক্রয়কারীর কারিগরি দক্ষতার অভাব থাকলে ‘সমতুল্য’ শব্দ যোগ করে ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বিধিমালার সঠিক অনুসরণ সরকারি অর্থের সাশ্রয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
সতর্কতা: এই প্রশ্নোত্তর ও তথ্যসমূহ পিপিআর ২০২৫-এর মূল পাঠের বিকল্প নয়। বিস্তারিত তথ্যের জন্য সরকারি গেজেট অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হলো।

