Latest News

উচ্চ বেসিকের আড়ালে বিদ্যুৎ কর্মীদের কান্না: ২৪ ঘণ্টা ডিউটি, তবুও মিলছে না ন্যায্য অধিকার

বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় ‘উচ্চ বেতন’ আর ‘ঝকঝকে কর্পোরেট সংস্কৃতি’। কিন্তু এই চাকচিক্যের আড়ালেই ঢাকা পড়ে আছে বিদ্যুৎ খাতের মাঠপর্যায়ের লাখো কর্মীর চরম বঞ্চনা, মানসিক ক্লান্তি আর পারিবারিক জীবনের নিঃসঙ্গতার গল্প। সাধারণ মানুষের ধারণা, পাওয়ার সেক্টরে চাকরি মানেই বিপুল সুযোগ-সুবিধা। অথচ বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা ডিউটি আর উৎসব-পার্বণেও ছুটি না পাওয়া এই খাতের কর্মীদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য ২০% বিশেষ সুবিধা ভাতা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কর্মীদের দাবি—উচ্চ বেসিকের অজুহাত দেখিয়ে তাদের এই ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

উৎসবহীন জীবন ও দিন-রাতের অন্তহীন ডিউটি

সাধারণ মানুষ যখন ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে পরিবারের কাছে ছোটেন, বিদ্যুৎ কর্মীদের তখন কাটে গ্রিড সাব-স্টেশন কিংবা কন্ট্রোল রুমে। তাদের জন্য ‘ঈদের ছুটি’ একটি বিলাসিতা মাত্র। ঝড়-বৃষ্টি, তীব্র দাবদাহ কিংবা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে যখন সবাই নিরাপদ আশ্রয়ে থাকেন, তখন এই কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখতে মাঠে কাজ করেন। বাস্তবে কর্মঘণ্টার নির্দিষ্ট কোনো সীমা এখানে মানা হয় না। জনদুর্ভোগ এড়াতে সরকারি ছুটির দিনেও তাদের মাঠে দাঁড়িয়ে ঘাম ঝরাতে হয়।

সুযোগ-সুবিধার দীর্ঘ তালিকা, প্রাপ্তি যেখানে শূন্য

পাওয়ার সেক্টরের কর্মীদের অভিযোগ, উচ্চ বেসিকের দোহাই দিয়ে তাদের মৌলিক অনেক প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। দীর্ঘ তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়:

  • ভাতা ও লোনের অভাব: বিপুল কর্মযজ্ঞের মাঝেও তাদের জন্য কোনো ওভারটাইম (Overtime) বা স্টেশন ভাতা নেই। আবাসন ও যাতায়াতের জন্য নেই কোনো বাড়ি লোন বা গাড়ি লোনের সুবিধা।

  • ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা অনিশ্চিত: এই খাতের সিংহভাগ কর্মীর কোনো পেনশন সুবিধা নেই। চাকরি জীবন শেষে যে গ্র্যাচুইটি পাওয়া যায়, তা-ও তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত কম। ফলে অবসর-পরবর্তী জীবন নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন তারা।

  • বিনোদনের অভাব: অন্যান্য সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে শ্রান্তি বিনোদন ভাতার (Rest and Recreation Allowance) ব্যবস্থা থাকলেও বিদ্যুৎ কর্মীদের জন্য এই সুযোগ নেই। এমনকি সরকারি অন্যান্য খাতের তুলনায় তাদের বিদেশ ভ্রমণের বা উচ্চতর প্রশিক্ষণের সুযোগও সীমিত।

ঝুঁকি ও জনরোষের ফ্রন্টলাইন যোদ্ধা

হাজার হাজার ভোল্টের লাইনে দাঁড়িয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করেন বিদ্যুৎ কর্মীরা। প্রতি বছরই লাইনে কাজ করতে গিয়ে প্রাণহানি কিংবা পঙ্গুত্ব বরণের ঘটনা ঘটে। অথচ এই চরম ঝুঁকিতে কাজ করেও তারা পর্যাপ্ত ‘ঝুঁকি ভাতা’ পান না। এর ওপর রয়েছে মনস্তাত্ত্বিক চাপ। সামান্য লোডশেডিং বা কারিগরি ত্রুটির কারণে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে মাঠপর্যায়ের এই কর্মীদের সরাসরি জনরোষের মুখে পড়তে হয়। অথচ নেপথ্যের গ্রিড বিপর্যয় বা উৎপাদন ঘাটতির ওপর এই সাধারণ কর্মীদের কোনো হাত থাকে না।

ক্যারিয়ারে স্থবিরতা ও বদলিজনিত ভোগান্তি

বিদ্যুৎ সেক্টরে পদোন্নতির ক্ষেত্রে রয়েছে দীর্ঘসূত্রিতা ও চরম বৈষম্য। বছরের পর বছর একই পদে কাজ করে অনেক কর্মী অবসরে যাচ্ছেন। এর সাথে রয়েছে ঘন ঘন এবং নিয়মনীতিহীন বদলিজনিত ভোগান্তি। এই তীব্র কর্মচাপ ও পারিবারিক জীবনকে সময় দিতে না পারার কারণে সিংহভাগ কর্মীই ভুগছেন চরম মানসিক অবসাদে।

২০% বিশেষ সুবিধা ভাতা চালুর দাবি

সংশ্লিষ্ট তথ্য ও মাঠপর্যায়ের ক্ষোভ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, উচ্চ মূল্যের বাজারে জীবনযাত্রার ব্যয় যখন আকাশচুম্বী, তখন বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য ২০% বিশেষ সুবিধা ভাতা বন্ধ রাখা হয়েছে। কর্মীদের স্পষ্ট বক্তব্য, “আমাদের ওপর কাজের যে চাপ এবং আমরা যেভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেবা দিই, সেই তুলনায় আমাদের প্রাপ্তি অত্যন্ত সামান্য। উচ্চ বেসিকের যুক্তি দিয়ে আমাদের ন্যায্য অধিকার কেড়ে নেওয়া অন্যায়।”

পাওয়ার সেক্টরের সামগ্রিক উন্নয়ন ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখতে হলে সবার আগে প্রয়োজন এই সম্মুখসারির কর্মীদের মানসিক স্বস্তি ও অধিকার নিশ্চিত করা। অবিলম্বে ২০% বিশেষ সুবিধা ভাতা পুনর্বহালসহ বৈষম্য দূরীকরণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী কর্মীরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *