৯ম পে স্কেল নিউজ

অনুমোদনের চূড়ান্ত ধাপে নবম পে-স্কেল: কার বেতন কত বাড়ছে, কার্যকর কবে থেকে?

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নবম পে-স্কেল (নতুন বেতন কাঠামো) বাস্তবায়ন এখন আর শুধু আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা বাস্তবায়নের একেবারে শেষ ধাপে এসে পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের কমিটি ইতিমধ্যে তাদের চূড়ান্ত সুপারিশ প্রস্তুত করেছে। এই মুহূর্তে প্রস্তাবটি অর্থমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক সম্মতির অপেক্ষায় রয়েছে এবং সেখান থেকে সবুজ সংকেত মিললেই তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে।

সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে অর্থ বিভাগকে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে নতুন পে-স্কেলের এই প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় তোলার জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মূলত বিচার বিভাগ সংক্রান্ত কিছু কারিগরি ও আইনি বিষয়ের জটিলতা নিরসন এবং সমাধানের জন্যই এই সর্বশেষ বৈঠকটি ডাকা হয়েছিল। বৈঠক শেষে জানা গেছে, নীতিগতভাবে বড় কোনো জটিলতা বা বাধা আর অবশিষ্ট নেই। ফলে সরকারি চাকুরিজীবীদের বহুল প্রত্যাশিত নতুন বেতন কাঠামো এখন আলোর মুখ দেখার একেবারে দ্বারপ্রান্তে।

গ্রেডভেদে কার বেতন কত বাড়ছে?

চূড়ান্ত সুপারিশের প্রস্তাবনা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গ্রেডভেদে বেতন বৃদ্ধির হারে একটি যৌক্তিক তারতম্য রাখা হয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের দিকে বাড়তি নজর দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত বৃদ্ধির হার নিম্নরূপ:

  • ১ থেকে ১০ গ্রেড: এই উচ্চ ও মধ্যম গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন প্রায় ১০০ শতাংশ (শতভাগ) বা তার কাছাকাছি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

  • ১১ থেকে ২০ গ্রেড: নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বর্তমান বাজারমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় মূল বেতন গড়ে প্রায় ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে অর্থ मंत्रालय সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে সরকারি চাকুরিজীবীরা মূল বেতনের ওপর যে ১০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা এবং ৫ শতাংশ বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পাচ্ছেন, তা নতুন পে-স্কেলের এই বর্ধিত কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় (অ্যাডজাস্ট) করা হবে।

দুই ধাপে বাস্তবায়নের কৌশলগত পরিকল্পনা

নতুন এই পে-স্কেলটি একবারে পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় দুই ধাপে বাস্তবায়ন করা হতে পারে। গৃহীত পরিকল্পনা অনুযায়ী:

  1. প্রথম ধাপ (চলতি অর্থবছর): শুধুমাত্র নতুন নির্ধারিত ‘মূল বেতন’ (Basic Salary) কার্যকর করা হবে এবং কর্মচারীরা বর্ধিত মূল বেতন পেতে শুরু করবেন।

  2. দ্বিতীয় ধাপ (আগামী অর্থবছর): চিকিৎসা ভাতা, বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত ভাতাসহ অন্যান্য সকল প্রকার আনুষঙ্গিক ভাতাগুলো নতুন কাঠামো অনুযায়ী কার্যকর করা হবে।

উল্লেখ্য, এর আগে ২০১৫ সালে যখন অষ্টম পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল, তখনও সরকার দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর চাপ কমাতে এই একই পদ্ধতি বা দুই ধাপে বাস্তবায়নের কৌশল অবলম্বন করেছিল।

কার্যকর কবে থেকে এবং টাকা কবে নাগাদ হাতে মিলবে?

খসড়া প্রস্তাবে নতুন পে-স্কেলের কার্যকারিতা আগামী ১লা জুলাই থেকে কার্যকর ধরার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত অনুমোদনের পরও বিভিন্ন আইনি, প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রক্রিয়া এবং প্রজ্ঞাপন জারির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে সাধারণত কয়েক মাস সময় লেগে যায়।

ফলে অনুমোদন পেলেও সরকারি চাকুরিজীবীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বাড়তি টাকা ঢুকতে কিছুটা সময় লাগবে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৫ সালের অষ্টম পে-স্কেলের ঘোষণা জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হলেও, সকল প্রক্রিয়া শেষ করে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সেই বাড়তি বেতন বাস্তবে হাতে পেয়েছিলেন ওই বছরের ডিসেম্বর মাসে। তবে নিয়ম অনুযায়ী জুলাই থেকে বকেয়া (Arrears) হিসেবে এই টাকা পরবর্তীতে সমন্বয় করে এককালীন দেওয়া হবে।

জাতীয় বাজেট ও সামগ্রিক আর্থিক চাপ

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন এই বেতন কাঠামোর আংশিক (প্রথম ধাপের মূল বেতন) বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে সরকার ইতিমধ্যে ৪৪,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১৪ লাখ সক্রিয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগী রয়েছেন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বেতন-ভাতা ও পেনশনের পেছনে সরকারের প্রতি বছর বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। এমতাবস্থায় নবম পে-স্কেল সম্পূর্ণ এবং পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে দেশের সামগ্রিক আর্থিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় একটি বড় ধরনের প্রভাব ও ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যা সামাল দিতে সরকারের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে।

সারসংক্ষেপ: সার্বিকভাবে বলা যায়, নবম পে-স্কেল এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের দ্বারপ্রান্তে। এখন সরকারি চাকুরিজীবীদের মূল নজর থাকবে অর্থমন্ত্রীর সম্মতি এবং মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে, যা আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই স্পষ্ট হতে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *