নবম জাতীয় পে-স্কেলের প্রস্তাবিত কাঠামো: কোন গ্রেডে কত বেতন বাড়তে পারে, থাকছে সর্বোচ্চ ধাপও
সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল আলোচিত নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব ও খসড়া কাঠামো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোর ছবিতে ১ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত বর্তমান মূল বেতন, প্রস্তাবিত বৃদ্ধির হার, নতুন মূল বেতন, সর্বোচ্চ ধাপ এবং ইনক্রিমেন্ট ধাপের একটি তালিকা তুলে ধরা হয়েছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ছবিতে থাকা কাঠামোকে এখনই সরকারি গেজেট বা চূড়ান্ত পে-স্কেল হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই। ছবিটির নিচেও উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি গেজেট বা আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এটিকে চূড়ান্ত বা অফিসিয়াল বেতন স্কেল হিসেবে গণ্য করা যাবে না।
প্রস্তাবিত কাঠামোয় ২০ গ্রেডের বেতন
প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, ১ম গ্রেডে বর্তমান মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা এবং প্রস্তাবিত নতুন মূল বেতন ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। ২য় গ্রেডে ৬৬ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ১৮ হাজার টাকা, ৩য় গ্রেডে ৫৬ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ১ লাখ ২ হাজার টাকা এবং ৪র্থ গ্রেডে ৫০ হাজার টাকা থেকে ৯৩ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেখানো হয়েছে।
৫ম গ্রেডে বর্তমান ৪৩ হাজার টাকা থেকে নতুন মূল বেতন ৭৯ হাজার ৫০০ টাকা এবং ৬ষ্ঠ গ্রেডে ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৬৭ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছে।
এরপর ৭ম গ্রেডে ২৯ হাজার টাকা থেকে ৫৮ হাজার টাকা, ৮ম গ্রেডে ২৩ হাজার টাকা থেকে ৪৯ হাজার টাকা এবং ৯ম গ্রেডে ২২ হাজার টাকা থেকে ৪৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
১০ম গ্রেডে ১৬ হাজার টাকা থেকে ৩৪ হাজার টাকা, ১১তম গ্রেডে ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ২৭ হাজার ৫০০ টাকা এবং ১২তম গ্রেডে ১১ হাজার ৩০০ টাকা থেকে ২৫ হাজার ৬০০ টাকা করার কথা উল্লেখ রয়েছে।
১৩তম গ্রেডে ১১ হাজার টাকা থেকে ২৫ হাজার টাকা, ১৪তম গ্রেডে ১০ হাজার ২০০ টাকা থেকে ২৪ হাজার টাকা, ১৫তম গ্রেডে ৯ হাজার ৭০০ টাকা থেকে ২৩ হাজার টাকা এবং ১৬তম গ্রেডে ৯ হাজার ৩০০ টাকা থেকে ২২ হাজার ৬০০ টাকা করার প্রস্তাব দেখানো হয়েছে।
এ ছাড়া ১৭তম গ্রেডে ৯ হাজার টাকা থেকে ২২ হাজার ৫০০ টাকা, ১৮তম গ্রেডে ৮ হাজার ৬০০ টাকা থেকে ২১ হাজার ৫০০ টাকা, ১৯তম গ্রেডে ৮ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ২১ হাজার ২০০ টাকা এবং ২০তম গ্রেডে ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার ৯০০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে।
নিম্ন গ্রেডে তুলনামূলক বেশি শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব
ছবির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি হলো—উচ্চ গ্রেডের তুলনায় নিম্ন গ্রেডে শতকরা হিসাবে মূল বেতন বৃদ্ধির হার বেশি দেখানো হয়েছে।
তালিকা অনুযায়ী, ৭ম গ্রেডে ১০০ শতাংশ, ৮ম গ্রেডে ১১৩ শতাংশ, ৯ম গ্রেডে ১০৫ শতাংশ এবং ১০ম গ্রেডে ১১৩ শতাংশ বৃদ্ধির হার দেখানো হয়েছে।
১১তম গ্রেডে ১২০ শতাংশ, ১২তম গ্রেডে ১২৫ শতাংশ, ১৩তম গ্রেডে ১২৭ শতাংশ, ১৪তম গ্রেডে ১৩৩ শতাংশ এবং ১৫তম গ্রেডে ১৪০ শতাংশ বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
১৬তম গ্রেডে ১৪০ শতাংশ, ১৭তম গ্রেডে ১৪৬ শতাংশ, ১৮তম ও ১৯তম গ্রেডে ১৪৯ শতাংশ এবং ২০তম গ্রেডে সর্বোচ্চ ১৫১ শতাংশ বৃদ্ধির হার দেখানো হয়েছে।
অর্থাৎ প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন তুলনামূলকভাবে বড় হারে বাড়ানোর একটি কাঠামো তৈরি হতে পারে।
২০তম গ্রেডে ৮,২৫০ টাকা থেকে ২০,৯০০ টাকা
প্রস্তাবিত তালিকার সবচেয়ে নিচের ধাপ অর্থাৎ ২০তম গ্রেডের বর্তমান মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা। প্রস্তাবিত নতুন মূল বেতন ২০ হাজার ৯০০ টাকা। একইভাবে ১৯তম গ্রেডে ৮ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ২১ হাজার ২০০ টাকা এবং ১৮তম গ্রেডে ৮ হাজার ৬০০ টাকা থেকে ২১ হাজার ৫০০ টাকা করার প্রস্তাব দেখানো হয়েছে।
এতে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন বর্তমান কাঠামোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। তবে মূল বেতন বাড়ার পাশাপাশি বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, উৎসব ভাতা, অবসর সুবিধা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
সর্বোচ্চ ধাপ ও ইনক্রিমেন্টের বিষয়
প্রস্তাবিত টেবিলে শুধু প্রারম্ভিক মূল বেতন নয়, সর্বোচ্চ ধাপ এবং ইনক্রিমেন্ট ধাপও দেখানো হয়েছে।
ছবিতে ২য় গ্রেডের সর্বোচ্চ ধাপ ১ লাখ ৩৬ হাজার ৮০০ টাকা, ৩য় গ্রেডে ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা, ৪র্থ গ্রেডে ১ লাখ ৩২ হাজার ৫০০ টাকা এবং ৫ম গ্রেডে ১ লাখ ২৯ হাজার ১০০ টাকা দেখানো হয়েছে।
৬ষ্ঠ গ্রেডে সর্বোচ্চ ধাপ ১ লাখ ২৬ হাজার ৫০০ টাকা এবং ৭ম গ্রেডে ১ লাখ ২০ হাজার ৯০০ টাকা দেখানো হয়েছে। ৮ম গ্রেডে ১ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকা এবং ৯ম গ্রেডে ১ লাখ ৮ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত সর্বোচ্চ ধাপ দেখানো হয়েছে।
১০ম গ্রেডে সর্বোচ্চ ধাপ ৮৩ হাজার ২০০ টাকা, ১১তম গ্রেডে ৬৬ হাজার ৬০০ টাকা এবং ১২তম গ্রেডে ৬১ হাজার ৬০০ টাকা দেখানো হয়েছে।
অন্যদিকে ১৩তম থেকে ২০তম গ্রেডেও নির্ধারিত সর্বোচ্চ ধাপ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ নতুন কাঠামোয় একজন কর্মচারী চাকরির মেয়াদ ও নিয়মিত ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে প্রস্তাবিত প্রাথমিক বেতনের চেয়ে আরও বেশি মূল বেতনে পৌঁছাতে পারবেন—এমন ধারণাই টেবিলটিতে প্রতিফলিত হয়েছে।
তবে প্রস্তাবিত তালিকায় একটি অসামঞ্জস্যও চোখে পড়ছে
প্রকাশিত ছবির তথ্য বিশ্লেষণ করলে ১ম গ্রেডের ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে নজরে আসে। সেখানে বর্তমান মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা, প্রস্তাবিত বৃদ্ধির হার ৭৯ শতাংশ এবং নতুন মূল বেতন ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে।
কিন্তু ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা হলে বৃদ্ধির হার প্রায় ১৩১ শতাংশের কাছাকাছি হয়, ৭৯ শতাংশ নয়। ফলে ১ম গ্রেডের সারিতে তথ্যগত বা মুদ্রণজনিত অসঙ্গতি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এই টেবিলের কোনো সংখ্যাকেই সরকারি চূড়ান্ত হিসাব হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত হবে না।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই হবে মূল বিষয়
নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে সরকারি পর্যায়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, অনুমোদন, প্রজ্ঞাপন এবং বাস্তবায়ন নির্দেশনা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন টেবিল, পোস্টার বা খসড়াকে সম্ভাব্য প্রস্তাব হিসেবেই দেখতে হবে।
বিশেষ করে মূল বেতন, বেতন বৃদ্ধির হার, সর্বোচ্চ ধাপ, ইনক্রিমেন্ট, ভাতা, পেনশন এবং কার্যকর হওয়ার তারিখ—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমেই নিশ্চিত হবে।
সুতরাং প্রকাশিত এই টেবিলটি সরকারি কর্মচারীদের জন্য সম্ভাব্য নতুন বেতন কাঠামোর একটি ধারণা দিলেও এটি এখনো চূড়ান্ত নবম জাতীয় পে-স্কেল হিসেবে গণ্য করা যাবে না। সরকারি গেজেট প্রকাশের পরই কোন গ্রেডে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা মূল বেতন নির্ধারিত হয়েছে এবং কী হারে ইনক্রিমেন্ট ও সর্বোচ্চ ধাপ থাকবে—তা নিশ্চিতভাবে জানা যাবে।

