নবম পে-স্কেলে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডে বেশি বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ, দুই ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রত্যাশিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রচলিত পদ্ধতিতে সব গ্রেডে প্রায় সমান হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার পরিবর্তে নতুন বেতন কাঠামোয় নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়ার নীতিগত সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত নতুন কাঠামোয় বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গ্রেডভেদে পার্থক্য রাখা হবে। বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত কম বেতন পাওয়া কর্মচারীদের মূল বেতন তুলনামূলক বেশি বাড়ানোর মাধ্যমে বিদ্যমান বেতন বৈষম্য কিছুটা কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এ কারণে নবম পে-স্কেল কার্যকর হলে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পেতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের অপেক্ষায় প্রস্তাব
নবম পে-স্কেলের সুপারিশ ইতোমধ্যে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কমিটির নীতিগত খসড়া প্রস্তাবের ওপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অর্থ বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখন মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিষয়টি উপস্থাপন করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অপেক্ষা।
সচিব কমিটির প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে আংশিক কার্যকর ধরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়া ২০২৮ সালের জানুয়ারি নাগাদ সম্পন্ন করার নীতিগত প্রস্তাব রয়েছে।
তবে বাস্তবায়ন ঠিক কতটি ধাপে হবে এবং কোন ধাপে কোন সুবিধা কার্যকর হবে—এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি মন্ত্রিসভা।
প্রথমে মূল বেতন, পরে ভাতা
সচিব কমিটির নীতিগত পরিকল্পনায় নবম পে-স্কেলকে মূলত দুই ধাপে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। প্রথম ধাপে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন পুনর্নির্ধারণ করা হবে। পরবর্তী ধাপে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা সমন্বয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর ফলে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার পর মূল বেতন দ্রুত সমন্বয় করা হলেও সব ধরনের ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা একই সময়ে কার্যকর নাও হতে পারে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পরই স্পষ্ট হবে।
নিম্ন গ্রেডে তুলনামূলক বেশি সুবিধার লক্ষ্য
নতুন পে-স্কেলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে গ্রেডভিত্তিক বেতন বৃদ্ধির হারে পরিবর্তন। এতদিনের প্রচলিত কাঠামোয় বিভিন্ন গ্রেডে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে বেতন বৃদ্ধির একটি নির্দিষ্ট ধারা অনুসরণ করা হয়েছে। কিন্তু নতুন ব্যবস্থায় সেই পদ্ধতি থেকে সরে এসে অপেক্ষাকৃত কম বেতন পাওয়া গ্রেডগুলোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
এর ফলে একই হারে শতাংশভিত্তিক বেতন বাড়ানোর পরিবর্তে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন তুলনামূলক বেশি বাড়তে পারে। এতে দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্য কমানোর পাশাপাশি নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপ মোকাবিলায় কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোয় গ্রেডভেদে বড় পার্থক্য
প্রদত্ত বেতন তালিকায় ২০টি গ্রেডের জন্য বিভিন্ন স্তরের মূল বেতনের একটি কাঠামো দেখা যায়। এতে ১ম গ্রেডের মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, ২য় গ্রেডে ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা, ৩য় গ্রেডে ১ লাখ ১৬ হাজার টাকা এবং ৪র্থ গ্রেডে ১ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে।
এ ছাড়া ৫ম গ্রেডে ৮৬ হাজার টাকা, ৬ষ্ঠ গ্রেডে ৭১ হাজার টাকা, ৭ম গ্রেডে ৫৮ হাজার টাকা, ৮ম গ্রেডে ৪৬ হাজার টাকা, ৯ম গ্রেডে ৪৪ হাজার টাকা এবং ১০ম গ্রেডে ৩২ হাজার টাকা মূল বেতনের উল্লেখ রয়েছে।
নিম্ন গ্রেডের দিকে ১১তম গ্রেডে ২৫ হাজার টাকা, ১২তম গ্রেডে ২২ হাজার ৬০০ টাকা, ১৩তম গ্রেডে ২২ হাজার টাকা, ১৪তম গ্রেডে ২০ হাজার ৪০০ টাকা, ১৫তম গ্রেডে ১৯ হাজার ৮০০ টাকা, ১৬তম গ্রেডে ১৮ হাজার ৬০০ টাকা, ১৭তম গ্রেডে ১৮ হাজার টাকা, ১৮তম গ্রেডে ১৭ হাজার ৬০০ টাকা, ১৯তম গ্রেডে ১৭ হাজার টাকা এবং ২০তম গ্রেডে ১৬ হাজার ৫০০ টাকা মূল বেতনের তথ্য রয়েছে।
তবে এসব অঙ্ককে চূড়ান্ত নবম পে-স্কেলের বেতন হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। মন্ত্রিসভার অনুমোদন, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের পরই কোন গ্রেডে কত মূল বেতন নির্ধারিত হবে, তা নিশ্চিত হবে।
১ জুলাই থেকে কার্যকরের লক্ষ্য
সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামোর কার্যকারিতা শুরু করা। তবে বাস্তবায়ন হবে ধাপে ধাপে। প্রথম পর্যায়ে মূল বেতন সমন্বয় এবং পরবর্তী পর্যায়ে ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা কার্যকর করার পরিকল্পনা থাকায় বাস্তবে পূর্ণাঙ্গ সুবিধা পেতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পে-স্কেলের কার্যকারিতা ১ জুলাই থেকে ধরা হলে পরবর্তী সময়ে গেজেট ও প্রশাসনিক নির্দেশনা অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ, বকেয়া হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি হিসাব ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সমন্বয় করতে হবে।
মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তই এখন মূল বিষয়
নবম পে-স্কেলের ক্ষেত্রে সচিব কমিটির সুপারিশ গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। মন্ত্রিসভার অনুমোদন এবং পরবর্তী সরকারি প্রজ্ঞাপন বা গেজেট প্রকাশের মাধ্যমেই নতুন বেতন কাঠামোর চূড়ান্ত রূপ নির্ধারিত হবে।
ফলে বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ তৈরি হয়েছে—কোন গ্রেডে কত মূল বেতন নির্ধারণ হবে, ইনক্রিমেন্টের হার কী হবে, ভাতা কত বাড়বে এবং বকেয়া কীভাবে পরিশোধ করা হবে তা নিয়ে।
সবকিছু ঠিক থাকলে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর দ্রুত চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। আর সচিব কমিটির বর্তমান পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে শুরু হয়ে ২০২৮ সালের জানুয়ারির মধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর পূর্ণ বাস্তবায়ন শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত প্রস্তাবিত বেতন, ধাপ, ভাতা ও বাস্তবায়ন সময়সূচির কোনোটি নিশ্চিত হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

