bd Service Rules

e-Return নিয়ে করদাতাদের ৪৫ প্রশ্নের উত্তর, রিটার্ন দাখিলের আগে যেসব বিষয় জানা জরুরি

অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল নিয়ে করদাতাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। e-Return ব্যবস্থায় নিবন্ধন, রিটার্ন পূরণ, আয়-ব্যয় ও সম্পদের তথ্য প্রদান, উৎসে করের ক্রেডিট, কর পরিশোধ, ভুল সংশোধনসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সঠিক তথ্য ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতে রেখে ধাপে ধাপে রিটার্ন পূরণ করলেই ঘরে বসে অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করা সম্ভব।

রেজিস্ট্রেশনে যা লাগবে

e-Return-এ প্রথমবার নিবন্ধনের জন্য করদাতার টিআইএন এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর প্রয়োজন। টিআইএন খোলার সময় ব্যবহৃত পুরোনো মোবাইল নম্বর বর্তমানে না থাকলেও সমস্যা নেই; নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রে নিবন্ধিত অন্য মোবাইল নম্বর দিয়ে e-Return-এ রেজিস্ট্রেশন করা যাবে।

নিবন্ধনের সময় টিআইএন ও মোবাইল নম্বর দিয়ে ভেরিফাই করলে মোবাইলে ছয় সংখ্যার OTP পাঠানো হবে। OTP দিয়ে পাসওয়ার্ড সেট করে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করতে হবে। মোবাইল নম্বর নিজের নামে নিবন্ধিত কিনা তা জানতে *১৬০০১# ডায়াল করে জাতীয় পরিচয়পত্রের শেষ চারটি সংখ্যা দিতে হবে।

পাসওয়ার্ড কমপক্ষে আট অক্ষরের হতে হবে। এতে ছোট হাতের অক্ষর, বড় হাতের অক্ষর, সংখ্যা এবং বিশেষ চিহ্ন থাকতে হবে। পাসওয়ার্ড ভুলে গেলে ‘Forget Password’ অপশনের মাধ্যমে OTP নিয়ে তা পুনরায় সেট করা যাবে।

ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ ব্যবহারের পরামর্শ

এনবিআরের নির্দেশনায় e-Return ব্যবস্থার সব সুবিধা পাওয়ার জন্য মোবাইল ফোনের পরিবর্তে ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ কম্পিউটার ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কারণ সিস্টেমের অনেক ফিচার মোবাইল ডিভাইসে পাওয়া যায় না।

রিটার্ন দাখিলের জন্য কাগজপত্র আপলোড করতে হবে না

অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে চলতি ব্যবস্থায় কোনো supporting document আপলোড করতে হয় না। তবে আয়, বিনিয়োগ, সম্পদ, দায়, উৎসে কর ও অন্যান্য তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সামনে রেখে তথ্য ইনপুট দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে এনবিআর।

রিটার্ন submit করার সঙ্গে সঙ্গে সিস্টেমে assessment সম্পন্ন হবে এবং acknowledgement slip পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে tax certificate তৈরি হবে। Tax record মেনু থেকে acknowledgement slip, tax certificate এবং রিটার্নের কপি পরবর্তীতে ডাউনলোড বা প্রিন্ট করা যাবে। অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের পর আবার সংশ্লিষ্ট সার্কেলে গিয়ে রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

সাত ধাপে পূরণ হবে অনলাইন রিটার্ন

e-Return-এ রিটার্ন দাখিলের প্রক্রিয়াকে সাতটি প্রধান ধাপে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমে assessment অংশে assessment year, income year, আয়ের খাত, আয়ের প্রধান উৎস এবং প্রয়োজনীয় সম্পদ-সংক্রান্ত তথ্য দিতে হবে।

এরপর income অংশে চাকরি, বাড়িভাড়া, কৃষি, ব্যবসা, মূলধনি লাভ, আর্থিক সম্পদ ও অন্যান্য উৎসের আয় দেখাতে হবে। rebate অংশে জীবনবিমা, DPS, সঞ্চয়পত্র ও GPF-এর মতো রেয়াতযোগ্য বিনিয়োগের তথ্য দিতে হবে।

পরবর্তী ধাপে বাৎসরিক expenditure এবং asset & liabilities-এর বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে। এর মধ্যে ব্যবসার মূলধন, জমি-বাড়ি, আর্থিক সম্পদ, FDR, DPS, সঞ্চয়পত্র, মোটরযান, স্বর্ণ, নগদ অর্থসহ বিভিন্ন সম্পদ এবং ঋণের তথ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

সবশেষে tax & payment অংশে করের হিসাব, উৎসে কর্তিত কর, অগ্রিম কর এবং পরিশোধিত করের তথ্য দিতে হবে। এরপর return view-তে সম্পূর্ণ রিটার্ন যাচাই করে submit করা যাবে।

বেতন থেকে কাটা করের ক্রেডিট কীভাবে পাওয়া যাবে

সরকারি কর্মচারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো বেতন থেকে কর্তিত উৎসে করের ক্রেডিট। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, Tax & Payment অংশে ‘Update Tax Payment Status’-এ গিয়ে e-Return Ledger-এ প্রবেশ করতে হবে। সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে যাদের বেতন iBAS থেকে হয়, তারা ‘Claim Source Tax’ থেকে ‘Salary (iBAS)’ নির্বাচন করে Search করলে কর্তিত করের পরিমাণ দেখা যাবে। এরপর প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে।

ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র ও ডিভিডেন্ডের উৎসে কর

ব্যাংক আমানত, সঞ্চয়পত্র বা ডিভিডেন্ড থেকে উৎসে কর কাটা হলে সেটিও e-Return-এ ক্রেডিট হিসেবে দাবি করা যায়। এজন্য সংশ্লিষ্ট আয় আগে Income অংশে সঠিকভাবে দেখাতে হবে। এরপর Tax & Payment-এর Update Tax Payment Status থেকে e-Return Ledger-এ গিয়ে সংশ্লিষ্ট উৎস নির্বাচন করে ‘Sync from Income’ ব্যবহার করে তথ্য হালনাগাদ করা যাবে।

যৌথ সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে পুরো উৎসে করের পরিবর্তে নিজের অংশের জন্য প্রযোজ্য করের পরিমাণই TDS claim হিসেবে দেখাতে হবে।

মিটিং ফি ও সম্মানীর আয় কোন খাতে দেখাবেন

মিটিং ফি, ট্রেনিং ফি বা সম্মানী থেকে আয় হলে এবং উৎসে কর কাটা থাকলে তা ‘Income from other source’-এর ‘Other source (with TDS)’ হিসেবে দেখাতে হবে। উৎসে কর কাটা না হলে ‘Any other income’ নির্বাচন করে আয় দেখাতে হবে।

অনলাইনেই কর পরিশোধের সুযোগ

রিটার্ন দাখিলের সময় কোনো কর অপরিশোধিত থাকলে Tax & Payment অংশে Payable হিসেবে তা দেখা যাবে। ‘Pay Now’ অপশনের মাধ্যমে e-Challan বা Sonali Bank Gateway ব্যবহার করে মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে কর পরিশোধ করা যাবে।

আগের বছরের সম্পদের তথ্যও সহজে আনা যাবে

আগের বছর অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করা থাকলে সম্পদ-দায় অংশে Autofill অপশন ব্যবহার করে আগের বছরের তথ্য আনা যাবে। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী তথ্য edit, delete, add বা update করা যাবে। তবে আগের বছরের কোনো সম্পদ নগদায়ন বা হস্তান্তর হয়ে গেলে সেটি বাদ দিয়ে অবশিষ্ট সম্পদ চলতি বছরের রিটার্নে দেখাতে হবে।

একাধিক চাকরির আয় দেখানোর সুযোগ

একই বছরে কেউ একাধিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলে Employment Income অংশের ‘Add Employment’ অপশন ব্যবহার করে একাধিক চাকরির তথ্য ও আয় দেখাতে পারবেন।

গাড়ির অগ্রিম করের ক্ষেত্রেও অনলাইনে সমন্বয়

গাড়ির অগ্রিম করের ক্রেডিট দাবি করতে Tax & Payment-এর Update Tax Payment Status থেকে Claim AIT-এ গিয়ে ‘AIT on Car’ নির্বাচন করতে হবে। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ব্যাংক স্লিপে থাকা Transaction ID ব্যবহার করে কর পরিশোধের তথ্য হালনাগাদ করা যাবে।

ভুল হলে সংশোধনের সুযোগ

অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের পর কোনো ভুল ধরা পড়লে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের সুযোগ রয়েছে। এনবিআরের FAQ অনুযায়ী, মূল রিটার্ন দাখিলের ১৮০ দিনের মধ্যে অনলাইনে সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করতে হবে এবং সংশোধিত রিটার্ন একবারই দাখিল করা যাবে।

e-Return-এর বড় সুবিধা

অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের ফলে করদাতাকে আয়কর অফিসে গিয়ে রিটার্ন জমা দিতে হয় না। একই প্ল্যাটফর্ম থেকে TIN certificate, return, tax certificate, acknowledgement slip এবং কর পরিশোধের চালান ডাউনলোড ও প্রিন্ট করা যায়। আগের বছরগুলোর রিটার্নের রেকর্ডও প্রিন্ট করার সুবিধা রয়েছে।

২০২৫-২০২৬ কর বছরে সাধারণ ব্যক্তি করদাতাদের জন্য e-Return দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। তবে ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব প্রবীণ করদাতা, শারীরিকভাবে অসমর্থ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন করদাতা, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি করদাতা এবং মৃত করদাতার আইনগত প্রতিনিধি এ বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন বলে এনবিআরের FAQ-তে উল্লেখ রয়েছে।

সহায়তার জন্য এনবিআরের কল সেন্টার

e-Return ব্যবহারে কোনো সমস্যা হলে এনবিআরের কল সেন্টারে যোগাযোগ করা যাবে। FAQ-তে ০৯৬৪৩ ৭১৭১৭১ নম্বরে ছুটির দিন ছাড়া সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত e-Return-সংক্রান্ত সহায়তার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া কর সেবা মাসে বিভিন্ন কর অঞ্চল থেকেও e-Return সহায়তা দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে, e-Return ব্যবস্থায় করদাতার জন্য রিটার্ন দাখিলের প্রক্রিয়া আগের তুলনায় অনেক বেশি ডিজিটাল ও কেন্দ্রীয় হয়েছে। তবে অনলাইনে রিটার্ন দাখিল সহজ হলেও আয়, বিনিয়োগ, সম্পদ, দায় এবং উৎসে করের তথ্য ভুলভাবে দেওয়া হলে পরবর্তী সময়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই রিটার্ন submit করার আগে প্রতিটি তথ্য ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র মিলিয়ে দেখা এবং প্রয়োজন হলে এনবিআরের নির্দেশনা বা সহায়তা নেওয়াই নিরাপদ।

সোর্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *