দ্রুত পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপনে রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপ চান সরকারি কর্মচারীরা
নবম জাতীয় পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন দ্রুত জারির দাবিতে এবার রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সরকারি কর্মচারীরা। দীর্ঘদিন ধরে নতুন বেতন কাঠামোর অপেক্ষায় থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রজ্ঞাপন প্রকাশে বিলম্ব নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। একই সময়ে সরকার পে-স্কেল চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকার কথা জানালেও প্রজ্ঞাপন জারির নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা বলছেন, নতুন পে-স্কেল নিয়ে দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও বারবার সময় পরিবর্তনের কারণে কর্মচারীদের প্রত্যাশা ও উদ্বেগ—দুই-ই বাড়ছে। তাদের দাবি, পে কমিশনের সুপারিশের মূল কাঠামো বজায় রেখে দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করা হলে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা দূর হবে।
৩১ আগস্টের মধ্যে গেজেট প্রকাশের দাবি
সর্বশেষ কর্মসূচিতে বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ ৩১ আগস্টের মধ্যে বৈষম্যহীন নবম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গেজেট প্রকাশ না হলে ১ সেপ্টেম্বর থেকে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করা হবে।
সংগঠনটির সাত দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—১২টি গ্রেডে ১:৪ অনুপাতের ভিত্তিতে সর্বনিম্ন বেতন ৩৫ হাজার টাকা নির্ধারণ, ২০১৫ সালের পে-স্কেলে বাতিল হওয়া টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পুনর্বহাল অথবা পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন, পদোন্নতি ও উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং বিদ্যমান ভাতাদি বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পুনর্নির্ধারণ।
এ ছাড়া ১১–২০ গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু এবং সরকারি, আধাসরকারি, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের মধ্যে বেতন ও পদ বৈষম্য কমানোর দাবিও জানানো হয়েছে।
কেন রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপের দাবি?
কর্মচারী নেতাদের বক্তব্যের মূল বিষয় হলো—পে-স্কেলের সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পর্যায় থেকে বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, প্রশাসনিক বিভিন্ন ধাপের কারণে প্রজ্ঞাপন বারবার পিছিয়ে গেলে কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা আরও বাড়বে।
তবে রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপ চাওয়ার বিষয়টি মূলত সরকারি কর্মচারী সংগঠনগুলোর দাবি; এটি সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা রাষ্ট্রপতির কোনো নির্দেশ হিসেবে দেখা যাবে না। প্রজ্ঞাপন জারির আগে সরকারের নির্ধারিত প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়াই নিয়ম।
সরকারের অবস্থান কী?
সরকারের পক্ষ থেকেও পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হয়েছে। ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার জানান, নতুন পে-স্কেল চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং যেকোনো সময় তা ঘোষণা হতে পারে। তিনি বলেন, সরকার এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তা বাস্তবায়ন করা হবে।
এর আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছিলেন, পে-স্কেল সংক্রান্ত কাজ শেষ হলে তা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিসভা অনুমোদনের পর শুরু হবে প্রজ্ঞাপন জারির প্রক্রিয়া।
নবম পে-স্কেলের সুপারিশ পর্যালোচনা ও বাস্তবায়নের জন্য ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র অনুযায়ী, ওই কমিটির সুপারিশও প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
পে কমিশনের সুপারিশে কী ছিল?
২০২৫ সালের ২৭ জুলাই নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়। কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছিল। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব ছিল।
অন্যদিকে, বর্তমানে কর্মচারীদের একটি অংশ আরও উচ্চতর সর্বনিম্ন বেতন এবং কম গ্রেডের কাঠামো দাবি করছে। ফলে পে কমিশনের মূল সুপারিশ, সচিব কমিটির পর্যালোচনা এবং কর্মচারী সংগঠনগুলোর দাবির মধ্যে শেষ পর্যন্ত সরকার কী সমন্বয় করে—সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
১ জুলাই থেকে কার্যকর হলে বকেয়া কী হবে?
চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণায় ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছিল। তবে এখনো প্রজ্ঞাপন প্রকাশ না হওয়ায় কার্যকর হওয়ার বিষয়টি বাস্তবে নির্ভর করছে চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্তের ওপর।
সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে গেজেট প্রকাশের লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে; আইনগত প্রক্রিয়া শেষ হলে গেজেট প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন পে-স্কেল ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হলে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের বেতন পুনর্নির্ধারণ করে বকেয়া হিসেবে সমন্বয় করার পরিকল্পনা থাকতে পারে। তবে বকেয়া অর্থ একবারে না দিয়ে কয়েক ধাপে পরিশোধের সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে। এটি এখনো চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত নয়।
সেপ্টেম্বরের দিকে কেন তাকিয়ে কর্মচারীরা?
জুলাই ও আগস্টে গেজেট প্রকাশের বিভিন্ন আলোচনা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এখন সেপ্টেম্বরের শুরুতে পে-স্কেলের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় তোলার প্রস্তুতির কথা জানা যাচ্ছে। মন্ত্রিসভা অনুমোদন, আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং এবং প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার পর সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে গেজেট প্রকাশের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ কারণে সরকারি কর্মচারীদের কাছে আগামী কয়েক সপ্তাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে সরকার বলছে পে-স্কেল চূড়ান্ত পর্যায়ে; অন্যদিকে কর্মচারী সংগঠনগুলো ৩১ আগস্টের মধ্যে গেজেট প্রকাশের দাবি জানিয়ে আন্দোলনের সময়সীমা ঘোষণা করেছে।
সামনে কী হতে পারে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—প্রথমত, সচিব কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশ; দ্বিতীয়ত, মন্ত্রিসভার অনুমোদন; এবং তৃতীয়ত, আইনগত ভেটিং শেষে প্রজ্ঞাপন বা গেজেট প্রকাশ।
কর্মচারীদের দাবির চাপ যদি আরও বাড়ে, তাহলে সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দিকে যেতে পারে। আবার সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, বেতন বৃদ্ধির হার, ভাতা, বিভিন্ন শ্রেণির কর্মচারীর মধ্যে সামঞ্জস্য এবং বাস্তবায়নের ধাপ নির্ধারণে আরও পর্যালোচনার প্রয়োজন হলে সময় কিছুটা বাড়তেও পারে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—কর্মচারীদের দাবি আর সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এক বিষয় নয়। পে কমিশনের সুপারিশের পর সরকারের পর্যালোচনা, মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত এবং প্রজ্ঞাপনের ভাষাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে নতুন বেতন কাঠামোর প্রকৃত রূপ।
তাই রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপের দাবি বর্তমানে কর্মচারীদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক-প্রশাসনিক আবেদন হলেও, বাস্তবে পে-স্কেলের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন নির্ভর করবে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রজ্ঞাপন জারির আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার ওপর।
এখন সরকারি কর্মচারীদের মূল অপেক্ষা—দাবি, প্রতিশ্রুতি ও আলোচনার পর কবে আসবে সেই কাঙ্ক্ষিত প্রজ্ঞাপন।

