২০২৬ সালের পে-স্কেলে বেতন নির্ধারণের পূর্ণ হিসাব: ৩১,৭৮০ টাকা মূল বেতনের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে কীভাবে বেতন হবে
নবম জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬ কার্যকর হওয়ার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—পুরোনো মূল বেতন থেকে নতুন পে-স্কেলে প্রকৃত মূল বেতন কীভাবে নির্ধারণ হবে এবং ধাপে ধাপে কত টাকা পাওয়া যাবে? প্রকাশিত বেতন নির্ধারণী বিবরণীর একটি উদাহরণে ১০ম গ্রেডের একজন কর্মচারীর ৩১,৭৮০ টাকা পুরোনো মূল বেতন ধরে পুরো হিসাবটি দেখানো হয়েছে।
সরকার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নতুন বেতন-ভাতার কাঠামোর গেজেট প্রকাশ করেছে। গেজেট অনুযায়ী জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর কার্যকারিতা ধরা হয়েছে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে।
নিচের উদাহরণটি সেই বেতন নির্ধারণী পদ্ধতিটি সহজভাবে বোঝার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
৩১,৭৮০ টাকা মূল বেতন থেকে শুরু
উদাহরণে ধরা হয়েছে, একজন চাকরিজীবী জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫-এর ১০ম গ্রেডে কর্মরত। ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে তার আহরিত মূল বেতন ছিল ৩১,৭৮০ টাকা।
তার ২০১৫ সালের ১০ম গ্রেডের স্কেল ছিল ১৬,০০০ টাকা থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে বৃদ্ধি পাওয়া একটি স্কেল। ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে তার মূল বেতন ছিল ৩১,৭৮০ টাকা।
অর্থাৎ, নতুন পে-স্কেলে যাওয়ার আগে এটিই হবে তার পুরোনো বেতন নির্ধারণের ভিত্তি।
প্রথম ধাপ: নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক মূল বেতন
জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুযায়ী ১০ম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৩২,০০০ টাকা।
অন্যদিকে ২০১৫ সালের স্কেলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল ১৬,০০০ টাকা।
এখানে পার্থক্য দাঁড়ায়—
৩২,০০০ − ১৬,০০০ = ১৬,০০০ টাকা।
অর্থাৎ নতুন স্কেলে একই গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন দ্বিগুণ হয়েছে।
নতুন পে-স্কেলের ক্ষেত্রে ১ম থেকে ১১তম গ্রেড পর্যন্ত প্রারম্ভিক মূল বেতন ১০০ শতাংশ বৃদ্ধির তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
দ্বিতীয় ধাপ: পুরোনো বেতনের পার্থক্য যোগ
বেতন নির্ধারণী বিবরণীতে ৩০ জুন ২০২৬-এর বেতন এবং নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক বেতনের পার্থক্য হিসাব করা হয়েছে।
পুরোনো আহরিত মূল বেতন:
৩১,৭৮০ টাকা
২০১৫ সালের স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন:
১৬,০০০ টাকা
পার্থক্য:
৩১,৭৮০ − ১৬,০০০ = ১৫,৭৮০ টাকা।
এই পার্থক্য নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক মূল বেতনের সঙ্গে যোগ করা হয়েছে।
অর্থাৎ—
৩২,০০০ + ১৫,৭৮০ = ৪৭,৭৮০ টাকা।
ফলে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে হিসাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে মূল বেতন দাঁড়াচ্ছে ৪৭,৭৮০ টাকা।
এরপর নতুন স্কেলের পরবর্তী ধাপে বেতন নির্ধারণ
নতুন স্কেলের ১০ম গ্রেডে ৩২,০০০ টাকার পরবর্তী ধাপ ৩৩,৬০০, এরপর ৩৫,৩০০, ৩৭,১০০, ৩৮,৯০০, ৪০,৯০০, ৪২,৯০০, ৪৫,০০০ এবং পরবর্তী ধাপ ৪৭,১০০ ও ৪৯,৭০০ টাকা—এভাবে স্কেলের ধাপগুলো এগিয়েছে।
বেতন নির্ধারণী উদাহরণে ৪৭,৭৮০ টাকার পরবর্তী প্রযোজ্য ধাপ হিসেবে ৪৯,৭০০ টাকা ধরা হয়েছে।
এরপর ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে একটি ইনক্রিমেন্টসহ প্রকৃত মূল বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে পরবর্তী ধাপ হিসেবে ৫২,২০০ টাকা দেখানো হয়েছে।
অর্থাৎ, নতুন স্কেলে শুধু ৩২,০০০ টাকা ধরে বেতন নির্ধারণ করা হচ্ছে না; বরং পুরোনো বেতন, পার্থক্য এবং প্রযোজ্য ধাপ ও ইনক্রিমেন্টের নিয়ম অনুসরণ করে চূড়ান্ত বেতন নির্ধারণ হচ্ছে।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে পুরো বেতন একবারে পাওয়া যাচ্ছে না
এখানেই নতুন পে-স্কেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি রয়েছে।
গেজেট অনুযায়ী নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হলেও বর্ধিত মূল বেতন ধাপে ধাপে কার্যকর হচ্ছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের জন্য পুরোনো ও নতুন মূল বেতনের পার্থকের ৪০ শতাংশ দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ছবিতে প্রদত্ত নির্দিষ্ট ১০ম গ্রেডের উদাহরণে পার্থক্যের ৫০ শতাংশ ধরে হিসাব দেখানো হয়েছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—গ্রেডভেদে বাস্তবায়নের হার আলাদা হওয়ায় প্রত্যেক কর্মচারীর ক্ষেত্রে একই শতাংশ প্রয়োগ করা যাবে না।
১০ম গ্রেডের উদাহরণে ৫০ শতাংশ পার্থক্য
এই উদাহরণে পুরোনো মূল বেতন ছিল:
৩১,৭৮০ টাকা
১ জুলাই ২০২৬-এর প্রকৃত নির্ধারিত মূল বেতন হিসেবে দেখানো হয়েছে:
৫২,২০০ টাকা
তাই পার্থক্য:
৫২,২০০ − ৩১,৭৮০ = ২০,৪২০ টাকা।
এই পার্থক্যের ৫০ শতাংশ—
২০,৪২০ × ৫০% = ১০,২১০ টাকা।
অতএব, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকরভাবে প্রাপ্য মূল বেতন হিসাব করা হয়েছে—
৩১,৭৮০ + ১০,২১০ = ৪১,৯৯০ টাকা।
অর্থাৎ উদাহরণটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হলো:
নতুন স্কেলে পূর্ণ নির্ধারিত ৫২,২০০ টাকা এবং বাস্তবে প্রথম পর্যায়ে প্রাপ্য ৪১,৯৯০ টাকা—এই দুটি বিষয় এক নয়।
এটি বেতন নিয়ে চলমান বিভ্রান্তি বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বেতন আরও বাড়বে
উদাহরণে পরবর্তী ধাপে ১০ম গ্রেডের বর্ধিত বেতনের পার্থকের ৭৫ শতাংশ কার্যকর করার হিসাব দেখানো হয়েছে।
মোট পার্থক্য:
২০,৪২০ টাকা
এর ৭৫ শতাংশ:
১৫,৩১৫ টাকা।
পুরোনো মূল বেতন ৩১,৭৮০ টাকার সঙ্গে এটি যোগ করলে—
৩১,৭৮০ + ১৫,৩১৫ = ৪৭,০৯৫ টাকা।
অর্থাৎ উদাহরণ অনুযায়ী ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে কার্যকর প্রাপ্য মূল বেতন ৪৭,০৯৫ টাকা।
২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ে আবার ইনক্রিমেন্ট
বেতন নির্ধারণী বিবরণীর শেষ ধাপে ১ জুলাই ২০২৭ তারিখে ২০২৬ সালের ১ জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্টসহ প্রকৃত মূল বেতনের পরবর্তী ধাপ হিসেবে ৫৪,৮০০ টাকা দেখানো হয়েছে।
অর্থাৎ উদাহরণটির ধারাবাহিকতা দাঁড়ায়—
| সময় | হিসাবের মূল বেতন |
|---|---|
| ৩০ জুন ২০২৬ | ৩১,৭৮০ টাকা |
| নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন | ৩২,০০০ টাকা |
| পার্থক্য যোগের পর | ৪৭,৭৮০ টাকা |
| পরবর্তী প্রযোজ্য ধাপ | ৪৯,৭০০ টাকা |
| ইনক্রিমেন্টসহ নির্ধারিত মূল বেতন | ৫২,২০০ টাকা |
| ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর প্রাপ্য | ৪১,৯৯০ টাকা |
| ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে কার্যকর প্রাপ্য | ৪৭,০৯৫ টাকা |
| ১ জুলাই ২০২৭-এর পরবর্তী ধাপ | ৫৪,৮০০ টাকা |
তবে এই টেবিলটি ছবিতে দেওয়া নির্দিষ্ট উদাহরণের হিসাব; সব কর্মচারীর ক্ষেত্রে একই অঙ্ক প্রযোজ্য হবে না।
বাড়িভাড়া ভাতায়ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে
বেতন নির্ধারণী বিবরণীর নিচে ভাতার প্রাপ্যতা সম্পর্কে আলাদা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সেখানে বলা হয়েছে, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে আহরিত মূল বেতনের ভিত্তিতে যে বাড়িভাড়া ভাতা প্রাপ্য ছিল, তা ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত প্রাপ্য থাকবে।
অর্থাৎ নতুন পে-স্কেলের পূর্ণ বেতন কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িভাড়া ভাতা নতুন মূল বেতনের ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনর্গণনা হবে—এমন ধারণা করা ঠিক হবে না।
একইভাবে চিকিৎসা ভাতা, নববর্ষ ভাতা, শিক্ষা সহায়ক ভাতা, খোলাই ভাতা, টিফিন ভাতাসহ অন্যান্য ভাতার ক্ষেত্রেও ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত আগের হিসাব বহাল রাখার বিষয়টি ওই নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এ কারণে নতুন পে-স্কেলে কারও মূল বেতন বড় অঙ্কে বাড়লেও তার মোট মাসিক বেতন একই অনুপাতে বাড়বে না—কারণ বিভিন্ন ভাতা কখন এবং কোন ভিত্তিতে পুনর্নির্ধারিত হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
কেন এই বেতন নির্ধারণী উদাহরণটি গুরুত্বপূর্ণ?
নতুন পে-স্কেল নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তির জায়গা হলো—“নতুন স্কেলে আমার বেতন কত?”
এখানে আসলে তিনটি আলাদা বিষয়কে পৃথক করতে হবে:
১. নতুন পে-স্কেলের স্কেল
এটি হলো সংশ্লিষ্ট গ্রেডের নতুন বেতনসীমা।
২. পে-ফিক্সেশন
পুরোনো মূল বেতন থেকে নতুন স্কেলে কোন ধাপে বেতন নির্ধারিত হবে, সেটিই পে-ফিক্সেশন।
৩. বাস্তবে কোন অংশ কখন পাওয়া যাবে
নতুন নির্ধারিত মূল বেতনের পুরো অংশ সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর নাও হতে পারে। ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কারণে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট অংশ প্রাপ্য হতে পারে।
এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে মিশিয়ে ফেললেই বেতন নিয়ে ভুল হিসাব তৈরি হচ্ছে।
২০২৬ সালের ইনক্রিমেন্ট নিয়ে বিভ্রান্তি
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইনক্রিমেন্ট।
নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার কারণে ২০২৬ সালের ইনক্রিমেন্ট সম্পূর্ণ বাদ যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক নয়। বরং নতুন বেতন নির্ধারণের সময় পুরোনো বেতন, নতুন স্কেলের সংশ্লিষ্ট ধাপ এবং ইনক্রিমেন্টের বিধান অনুসারে পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করা হচ্ছে।
প্রকাশিত গেজেটভিত্তিক ব্যাখ্যাতেও পুরোনো বেতন থেকে নতুন বেতন নির্ধারণ বা পে-ফিক্সেশনের পৃথক বিধান থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
১০ম গ্রেডের এই উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, একজন কর্মচারীর পুরোনো মূল বেতন যদি ৩১,৭৮০ টাকা হয়, তাহলে নতুন পে-স্কেলের হিসাব কেবল “৩১,৭৮০ থেকে ১০০ শতাংশ বাড়িয়ে ৬৩,৫৬০ টাকা” করার মতো সরল নয়।
বরং—
পুরোনো স্কেলের ধাপ → নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপ → পার্থক্য → নতুন স্কেলের সংশ্লিষ্ট ধাপ → ইনক্রিমেন্ট → বাস্তবায়নের নির্ধারিত শতাংশ → পরবর্তী ধাপ
—এই ধারাবাহিকতায় বেতন নির্ধারণ করতে হবে।
জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এ বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে এবং সর্বনিম্ন প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০,০০০ টাকা ও গ্রেড-১-এর নির্ধারিত মূল বেতন ১,৫৬,০০০ টাকা করা হয়েছে।
শেষ কথা
নবম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের পর এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ব্যক্তিভিত্তিক পে-ফিক্সেশন সঠিকভাবে বোঝা। একই গ্রেডের দুই কর্মচারীর পুরোনো মূল বেতন, ইনক্রিমেন্টের অবস্থান ও সংশ্লিষ্ট ধাপ ভিন্ন হলে নতুন মূল বেতনও ভিন্ন হতে পারে।
তাই শুধু নতুন গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন দেখে নিজের বেতন নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে আহরিত মূল বেতন, পুরোনো স্কেলের ধাপ, নতুন স্কেলের সংশ্লিষ্ট ধাপ এবং ২০২৬–২৭ সালের ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন—সবগুলো একসঙ্গে বিবেচনা করেই চূড়ান্ত বেতন নির্ধারণ করতে হবে।
সরকারি গেজেটের তথ্য অনুযায়ী জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর আদেশ ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে এবং নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট ধাপ নির্ধারণ করা হয়েছে।


