eVAT পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে ভ্যাট দাখিল বাধ্যতামূলক, ১১ খাতে নতুন নির্দেশনা
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভ্যাট অনুবিভাগের নতুন আদেশে নির্দিষ্ট কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ও সেবা খাতের জন্য eVAT পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে ভ্যাট দাখিলপত্র পেশ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট খাতের নিবন্ধিত ব্যবসা ও সেবা প্রদানকারীদের প্রচলিত পদ্ধতির পরিবর্তে অনলাইন ব্যবস্থায় ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত এনবিআরের আদেশে বলা হয়েছে, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা ৬৪-এর উপধারা (৫) এবং মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক বিধিমালা, ২০১৬-এর বিধি ১১৮(ক)-এ দেওয়া ক্ষমতাবলে সংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে এই বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদনেও এনবিআরের এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। The Daily Ittefaq
যেসব খাতে অনলাইনে ভ্যাট দাখিল বাধ্যতামূলক
এনবিআরের আদেশ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পণ্য ও সেবা খাতের উৎপাদনকারী/সরবরাহকারীদের eVAT পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে দাখিলপত্র পেশ করতে হবে।
পণ্য পর্যায়ে
আদেশের টেবিল-১ অনুযায়ী প্রধান পণ্য খাতগুলো হলো—
| শিরোনাম নম্বর | পণ্য |
|---|---|
| ২৪.০২ | সিগারেট |
| ৮৫.১৭ | মোবাইল ফোন |
| ৭২. | |
| ১৩ হতে ৭২.১৬ | এমএস পণ্য | ৩০.০৪ | ওষুধ | ২২. |
| ০১ হতে ২২.০৯ | পানীয় | ২৫.২৩ | সিমেন্ট | ৬৯.০৭ | টাইলস | ৩২. |
অর্থাৎ সিগারেট, মোবাইল ফোন, এমএস পণ্য, ওষুধ, পানীয়, সিমেন্ট, টাইলস এবং রং-বার্নিশ উৎপাদনকারী সংশ্লিষ্ট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অনলাইনে ভ্যাট দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমও একই আটটি পণ্য খাতের কথা জানিয়েছে। Shomoyer Alo
সেবা পর্যায়ে
টেবিল-২ অনুযায়ী তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাতকে অনলাইন দাখিলের আওতায় আনা হয়েছে—
১. বীমা সেবা — সেবা কোড ৬৫২৭/৬৫২৭.০০
২. ব্যাংকিং ও নন-ব্যাংকিং সেবা — সেবা কোড ৬৪৬/৬৪৬.০০
৩. মোবাইল ব্যাংকিং সেবা — সেবা কোড ৬৪৬.১০
ফলে এসব খাতের সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদানকারীদেরও eVAT পোর্টালের মাধ্যমে দাখিলপত্র জমা দিতে হবে। The Daily Ittefaq
শুধু নির্দিষ্ট পণ্য বিক্রি করলেই নয়, অন্য ব্যবসা থাকলেও প্রযোজ্য
নতুন নির্দেশনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো—কোনো নিবন্ধিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি তালিকাভুক্ত পণ্য বা সেবার পাশাপাশি অন্য কোনো পণ্য বা সেবা সরবরাহের কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত থাকে, তাহলেও তার ক্ষেত্রে এই আদেশ প্রযোজ্য হবে।
অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত এবং অন্যান্য পণ্য বা সেবা নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করলে শুধু তালিকাভুক্ত কার্যক্রমের জন্য আলাদা করে অনলাইন ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ নেই; আদেশের আওতায় পড়লে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধিত ব্যক্তিকেই eVAT ব্যবস্থার মাধ্যমে দাখিলপত্র পেশ করতে হবে।
কেন এই ব্যবস্থা
মূল্য সংযোজন কর ব্যবস্থাকে আরও ডিজিটাল, স্বচ্ছ ও তথ্যনির্ভর করার অংশ হিসেবে অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের পরিধি বাড়ানো হচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যেও eVAT ব্যবস্থার মাধ্যমে অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল। একই সঙ্গে ছোট ভ্যাটদাতাদের জন্য পৃথক সহজ রিটার্ন ফরম এবং ERP সফটওয়্যার থেকে সরাসরি রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করা হয়। National Board of Revenue
আইনেও বোর্ডকে নির্দিষ্ট নিবন্ধিত বা তালিকাভুক্ত ব্যক্তির জন্য ইলেকট্রনিক মাধ্যমে দাখিলপত্র পেশ বাধ্যতামূলক করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। Laws of Bangladesh
আগের নির্দেশনা বাতিল
নতুন আদেশে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। এনবিআর আগে অনলাইনে দাখিলপত্র পেশ বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে কোনো আদেশ জারি করে থাকলে, নতুন আদেশ জারির পর আগের সেই আদেশগুলো বাতিল বলে গণ্য হবে।
এর ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও সেবা প্রদানকারীদের ক্ষেত্রে কোন নির্দেশনা বর্তমানে কার্যকর—তা নির্ধারণে নতুন আদেশটিই গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে। The Daily Ittefaq
তালিকায় ভবিষ্যতে পরিবর্তন আনতে পারবে এনবিআর
আদেশে এনবিআরকে ভবিষ্যতে তালিকাভুক্ত পণ্য ও সেবার পরিধি সংযোজন বা বিয়োজনের ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ বর্তমানে যে খাতগুলো তালিকায় রয়েছে, ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী সেখানে নতুন পণ্য বা সেবা যুক্ত হতে পারে। আবার কোনো খাতকে তালিকা থেকে বাদও দেওয়া যেতে পারে।
এ কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য শুধু বর্তমান তালিকা জানা যথেষ্ট নয়; পরবর্তী সময়ে এনবিআরের নতুন আদেশ বা নির্দেশনাও নিয়মিত অনুসরণ করা প্রয়োজন।
অনলাইন ভ্যাট রিটার্ন ব্যবস্থায় কী পরিবর্তন আসবে
নতুন ব্যবস্থার ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভ্যাট-সংক্রান্ত কাজ আরও বেশি ডিজিটাল প্রক্রিয়ার মধ্যে চলে আসবে। বিশেষ করে—
- ভ্যাট দাখিলপত্র অনলাইনে জমা দিতে হবে;
- eVAT পোর্টাল ব্যবহার করতে হবে;
- কাগজভিত্তিক বা প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভরতা কমবে;
- ব্যবসার ভ্যাট-সংক্রান্ত তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত হবে;
- এনবিআরের পক্ষে তথ্য যাচাই ও বিশ্লেষণ সহজ হবে;
- সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট কমপ্লায়েন্স বা পরিপালন পর্যবেক্ষণ আরও সহজ হতে পারে।
এর ফলে ভ্যাট প্রশাসনে ডিজিটাল নজরদারি বাড়ার পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য সময়মতো অনলাইন দাখিল নিশ্চিত করার গুরুত্বও বেড়ে গেল।
জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৬ কর মেয়াদের রিটার্ন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
এদিকে অনলাইন ভ্যাট রিটার্ন ব্যবস্থায় রূপান্তরের সময় কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জুলাই ও আগস্ট ২০২৬ কর মেয়াদের রিটার্ন eVAT ব্যবস্থায় জমা দিতে পারেনি। এ পরিস্থিতিতে এনবিআর ১ অক্টোবর ২০২৬-এর আদেশে সংশ্লিষ্ট জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর ২০২৬ কর মেয়াদের রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়িয়েছে এবং নির্ধারিত বর্ধিত সময়ের মধ্যে জমা দিলে জরিমানা না নেওয়ার কথা জানিয়েছে। BSS
অতএব, নতুন অনলাইন ব্যবস্থার আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো eVAT পোর্টালে নিবন্ধন/প্রবেশের প্রস্তুতি, প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করা।
ব্যবসায়ীদের জন্য কী করণীয়
নতুন নির্দেশনার পর সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সেবা প্রদানকারীদের কয়েকটি বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
প্রথমত, প্রতিষ্ঠানটি এনবিআরের নির্ধারিত ১১টি খাতের মধ্যে পড়ে কি না তা যাচাই করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিষ্ঠানের BIN ও ভ্যাট-সংক্রান্ত তথ্য সঠিক আছে কি না তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, eVAT পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইন দাখিলের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবহারকারী-সংক্রান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে।
চতুর্থত, বিক্রয়, ক্রয়, ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক ও সংশ্লিষ্ট হিসাব-নিকাশ সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের সময় তথ্যের অসঙ্গতি না থাকে।
পঞ্চমত, নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম না করে দাখিলপত্র জমা দিতে হবে।
কার্যকর হয়েছে অবিলম্বে
আদেশের শেষাংশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। ফলে এটি ভবিষ্যতে কার্যকর করার কোনো দীর্ঘমেয়াদি সময়সূচি নয়; বরং আদেশ জারির পর থেকেই সংশ্লিষ্ট খাতগুলোকে নতুন অনলাইন দাখিল ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে। The Daily Ittefaq
সারসংক্ষেপ
সব মিলিয়ে এনবিআরের এই সিদ্ধান্ত ভ্যাট ব্যবস্থাকে আরও বেশি অনলাইন ও কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সিগারেট, মোবাইল ফোন, এমএস পণ্য, ওষুধ, পানীয়, সিমেন্ট, টাইলস, রং ও বার্নিশ উৎপাদনকারী এবং বীমা, ব্যাংকিং, নন-ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবা প্রদানকারী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এখন eVAT পোর্টালের মাধ্যমে দাখিলপত্র পেশ করতে হবে।
বিশেষ করে কোনো নিবন্ধিত ব্যক্তি তালিকাভুক্ত পণ্য বা সেবার পাশাপাশি অন্য পণ্য বা সেবার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এই বাধ্যবাধকতা প্রযোজ্য হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী তালিকায় নতুন খাত যুক্ত বা কোনো খাত বাদ দেওয়ার ক্ষমতাও এনবিআর সংরক্ষণ করেছে। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন অনলাইন ভ্যাট কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা এখন আর ঐচ্ছিক নয়—এটি বাধ্যতামূলক ব্যবস্থার অংশ।

