নির্বাচিত এমপিদের শপথ পড়াবেন ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ: নেপথ্যে বিশেষ পরিস্থিতিতে এমন সিদ্ধান্ত?
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ভিন্নধর্মী এক প্রক্রিয়ায় শপথ নিতে যাচ্ছেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীদের শপথবাক্য পাঠ করানোর জন্য রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
কেন এই ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত?
সাধারণত বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, নতুন নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান বিদায়ী সংসদের স্পিকার। স্পিকারের অনুপস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকার এই দায়িত্ব পালন করেন। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন:
-
স্পিকারের পদত্যাগ: ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেন।
-
ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতি: সাবেক ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন এবং নৈতিকভাবে ও আইনত তিনি এ দায়িত্ব পালনের অবস্থায় নেই।
এই সাংবিধানিক শূন্যতা পূরণে সংবিধানের বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি কাউকে মনোনীত করার এখতিয়ার রাখেন। সেই আলোকেই প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদকে এই বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
আইন উপদেষ্টার পূর্ব সংকেত
এর আগে গত ৫ ফেব্রুয়ারি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন যে, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির মনোনীত কোনো ব্যক্তি বা প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়াতে পারেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, দ্রুততম সময়ে শপথ আয়োজনের স্বার্থে রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো উচ্চপদস্থ ব্যক্তি বা প্রধান বিচারপতির মাধ্যমেই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
শপথের সম্ভাব্য তারিখ ও পরবর্তী ধাপ
বঙ্গভবন ও সংসদ সচিবালয় সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ ভবনে নবনির্বাচিত এমপিদের এই শপথ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতে পারে।
-
মন্ত্রিপরিষদের শপথ: এমপিদের শপথ শেষ হওয়ার পরদিনই অর্থাৎ ১৭ ফেব্রুয়ারি বঙ্গভবনে নতুন মন্ত্রিপরিষদ শপথ নিতে পারে।
-
সরকার গঠন: নিয়ম অনুযায়ী, শপথের পর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাবেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি।
ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ সম্পর্কে
ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বাংলাদেশের ২৫তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বিচার বিভাগ পুনর্গঠনে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একজন দক্ষ এবং সর্বজনগ্রাহ্য আইনবিদ হিসেবে তার ওপর রাষ্ট্রপতির এই আস্থা সংসদীয় গণতন্ত্রের নতুন যাত্রায় একটি বিশেষ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্র: দৈনিক কালের কণ্ঠ ও বিভিন্ন সংবাদ সংস্থা।
সাধারণত এমপিদের শপথ কে পড়ায়?
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করানোর সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। সাধারণত এই দায়িত্ব পালন করেন বিদায়ী সংসদের স্পিকার।
শপথ সংক্রান্ত মূল নিয়মগুলো নিচে সহজভাবে তুলে ধরা হলো:
১. মূল দায়িত্ব কার? (স্পিকার)
সংবিধানের ১৪৮(২) অনুচ্ছেদ এবং তৃতীয় তফশিল অনুযায়ী, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করাবেন বিদায়ী সংসদের স্পিকার। সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রকাশের ৩ দিনের মধ্যে এই শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হয়।
২. স্পিকার না থাকলে কে পড়ান? (ডেপুটি স্পিকার)
যদি কোনো কারণে স্পিকার অনুপস্থিত থাকেন বা শপথ পাঠ করাতে অসমর্থ হন, তবে সেই দায়িত্ব পালন করেন ডেপুটি স্পিকার। সংবিধানের ৭৪(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্পিকারের অনুপস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকার তার সকল দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
৩. দুজনেই না থাকলে বা অসমর্থ হলে কী হয়?
বর্তমান পরিস্থিতির মতো যদি স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার দুজনেই অনুপস্থিত থাকেন বা পদটি শূন্য থাকে, তবে সংবিধান দুটি বিকল্প পথের কথা বলে:
-
রাষ্ট্রপতির মনোনীত প্রতিনিধি: সংবিধানের ১৪৮(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, শপথ যিনি পাঠ করাবেন তিনি যদি কোনো কারণে তা করতে না পারেন, তবে তিনি (বা বিশেষ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি) যাকে মনোনীত করবেন, তার নিকট শপথ নেওয়া যাবে। বর্তমান ক্ষেত্রে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদকে এভাবেই মনোনীত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
-
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (CEC): যদি গেজেট প্রকাশের ৩ দিনের মধ্যে স্পিকার বা তার মনোনীত ব্যক্তি শপথ পড়াতে ব্যর্থ হন, তবে পরবর্তী ৩ দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পাঠ পরিচালনা করবেন (১৪৮-২ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী)।
একটি বিশেষ নোট:
সাধারণত স্পিকার নিজেই সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান। তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগেও বিশেষ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তির কাছে শপথ নেওয়ার নজির রয়েছে। যেমন—১৯৯৬ সালে তৎকালীন স্পিকার শপথ পড়াতে অস্বীকৃতি জানালে রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তির মাধ্যমে শপথ হয়েছিল।

