৯ম বেতন কমিশন প্রতিবেদন পর্যালোচনায় উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন: স্বপ্নপূরণের পথে সরকারি কর্মচারীগণ
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ‘জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫’, ‘জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন’ এবং ‘সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি’-র দাখিলকৃত প্রতিবেদন পর্যালোচনার জন্য একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। গত ৮ ফেব্রুয়ারি (রবিবার) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
কমিটির গঠন ও দায়িত্ব
মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে গঠিত ৯ সদস্যের এই কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সচিবদের রাখা হয়েছে। কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন:
- জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব
- প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব
- অর্থ বিভাগের সচিব
- মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব
- প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিব
- স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব
- আইন ও বিচার বিভাগের সচিব
- হিসাব মহানিয়ন্ত্রক (সিজিএ)
কমিটির কাজ: এই কমিটি ইতিপূর্বে জমা পড়া প্রতিবেদনগুলোর বেতন সংক্রান্ত বিষয়াদি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে এবং দ্রুততম সময়ে সরকারের কাছে পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য সুপারিশ জমা দেবে। প্রজ্ঞাপনে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ না করে “অবিলম্বে” বা “যথা সময়ে” প্রতিবেদন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা দ্রুত বাস্তবায়নের ইঙ্গিত দেয়।
বেতন কমিশনের মূল সুপারিশসমূহ (একনজরে)
সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ৯ম বেতন কমিশন গত ২১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। কমিশনের কিছু উল্লেখযোগ্য সুপারিশ হলো:
- বেতন বৃদ্ধি: মূল বেতন প্রায় ১০০% থেকে ১৪৭% পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
- সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতন: সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৬০,০০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
- গ্রেড বিন্যাস: বর্তমানের ২০টি গ্রেডই বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
- ভাতা বৃদ্ধি: বৈশাখী ভাতা ২০% থেকে বাড়িয়ে ৫০% করা এবং সন্তানদের শিক্ষা ভাতা ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২,০০০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
- নতুন সুবিধা: প্রথমবারের মতো সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
বাস্তবায়নের সম্ভাব্য সময়সীমা
কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে আংশিক এবং ১ জুলাই ২০২৬ (নতুন অর্থবছর) থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন এই রিভিউ কমিটি সুপারিশগুলো চূড়ান্ত করলেই সরকার আনুষ্ঠানিক বেতন স্কেল বা গেজেট ঘোষণা করবে।
বিশ্লেষণ: এবারের বেতন কাঠামোতে মূল্যস্ফীতির বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ২০তম গ্রেডে বেতন প্রায় দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও নতুন কমিটি কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নেয়নি, তবে “অবিলম্বে” শব্দটি ব্যবহারের মাধ্যমে ধারণা করা হচ্ছে যে আগামী বাজেটের আগেই পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারে।

কমিটি কবে প্রতিবেদন দিবে?
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ বা সময়সীমা (Deadline) উল্লেখ করা হয়নি।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, এই উচ্চপর্যায়ের কমিটি বেতন সংক্রান্ত সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করে “যথা সময়ে” বা “অবিলম্বে” সরকারের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করবে।
সাধারণত এ ধরনের কমিটির ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় কাজ করে:
১. দ্রুত বাস্তবায়ন: যেহেতু বর্তমান বাজারমূল্য ও মূল্যস্ফীতির কারণে কর্মচারীরা চাপে আছেন, তাই ধারণা করা হচ্ছে সরকার খুব বেশি সময় নেবে না।
২. বাজেট সমন্বয়: আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নতুন বেতন স্কেল অন্তর্ভুক্ত করতে হলে কমিটিকে আগামী ২-৩ মাসের মধ্যেই তাদের চূড়ান্ত সুপারিশ জমা দিতে হবে।
সংক্ষেপে, প্রজ্ঞাপনে নির্দিষ্ট কোনো তারিখ না থাকলেও দাপ্তরিক ভাষায় “যথা সময়ে” বলতে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করার নির্দেশনা বোঝানো হয়েছে। কমিটির কার্যক্রম শুরু হলে হয়তো কয়েক সপ্তাহ পর নির্দিষ্ট অগ্রগতির খবর পাওয়া যেতে পারে।

