Latest News

খুচরা খাতে সরকারের নজর : আসছে ০.২০% নতুন উৎসে কর, লক্ষ্য ৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব

করের আওতা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ ও খুচরা বিক্রেতাদের কর পরিপালন (ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স) ব্যবস্থার আওতায় আনতে এক বড় উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। এবার সরাসরি দেশের বিশাল খুচরা বাজারকে লক্ষ্য করে পণ্য সরবরাহের পয়েন্টে (ডিস্ট্রিবিউশন পয়েন্ট) ০.২০ শতাংশ নতুন উৎসে কর আরোপের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সংশ্লিষ্ট খাত সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নতুন এই কর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বছরে অন্তত ৬,০০০ কোটি টাকার বাড়তি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী জুন মাসে পেশ হতে যাওয়া আগামী অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী এই প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে পারেন এবং ইতিমধ্যেই এতে তার সবুজ সংকেত মিলেছে।

যেভাবে কাজ করবে এই নতুন কর ব্যবস্থা

প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, এই কর সংগ্রহের মূল দায়িত্ব থাকবে ডিলার ও সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থার সাথে যুক্ত পক্ষগুলোর ওপর।

  • আদায়ের প্রক্রিয়া: যেসব ডিলার খুচরা দোকানে পণ্য সরবরাহ করেন, তারা পণ্য বিক্রির মূল্যের ওপর ভিত্তি করে ডিস্ট্রিবিউশন পয়েন্টে এই কর সংগ্রহ করবেন। প্রতি ১,০০০ টাকার পণ্য মূল্যের বিপরীতে ২ টাকা হারে কর সংগ্রহ করা হবে। কোনো খুচরা বিক্রেতা একাধিক কোম্পানির কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করলেও প্রতিটি পয়েন্টেই এই হারে কর দিতে হবে।

  • ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও এ-চালান: এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের সহায়তায় ‘এ-চালান’ (A-Challan) নামক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে এই কর সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হবে। খুচরা বিক্রেতাদের মোবাইল নম্বরের মাধ্যমে ট্র্যাক করা হবে এবং প্রতি তিন মাস অন্তর এসএমএস-এর মাধ্যমে তাদের সংগৃহীত করের পরিমাণ জানানো হবে।

  • রিফান্ড সুবিধা: বছর শেষে ব্যবসায়ীর করযোগ্য আয় না থাকলে বা অতিরিক্ত কর কাটা হলে, রিটার্ন দাখিল করে তা রিফান্ড বা ফেরত দাবি করা যাবে। তবে এর জন্য সংশ্লিষ্ট খুচরা বিক্রেতার কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) থাকা বাধ্যতামূলক।

বিদ্যমান করের অতিরিক্ত বোঝা: বর্তমানে কোম্পানিগুলোকে বার্ষিক বিক্রির ওপর ন্যূনতম ১% টার্নওভার ট্যাক্স এবং ডিলারদের তাদের কমিশনের ওপর ১% উৎসে কর ও ০.২৫% টার্নওভার ট্যাক্স দিতে হয়। নতুন এই ০.২০% কর বিদ্যমান কর কাঠামোর অতিরিক্ত হিসেবে যুক্ত হবে।

প্রথম ধাপে লক্ষ্য ৫০ লাখ খুচরা বিক্রেতা

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘হাউসহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে ২০২৪’ অনুযায়ী, দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ অর্থনৈতিক ইউনিট বা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এনবিআরের ধারণা, দেশে প্রকৃতপক্ষে কার্যকরভাবে কর আদায় হয় মাত্র ১৫ লাখ মানুষের কাছ থেকে (যদিও টিআইএনধারী ১ কোটি ৩০ লাখ এবং রিটার্ন জমা দেন ৪৫ লাখ)।

এই বিশাল কর ফাঁকি ও অনানুষ্ঠানিক খাতকে নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রথম ধাপে দেশের আনুমানিক ১ কোটি খুচরা বিক্রেতার মধ্যে ৫০ লাখ বিক্রেতাকে এই করের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাস্তবায়ন নিয়ে ডিলার ও কর্পোরেট খাতের উদ্বেগ

এই প্রস্তাবিত পদক্ষেপকে ঘিরে দেশের বড় বড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তারা এটিকে বিশাল ‘পরিচালনগত চ্যালেঞ্জ’ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ হিসেবে দেখছেন।

  • নেসলে বাংলাদেশ: কোম্পানির লিগ্যাল অ্যান্ড কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স ডিরেক্টর দেবব্রত রায় চৌধুরী বলেন, “দেশব্যাপী আমাদের প্রায় ৬ লাখ খুচরা বিক্রেতা রয়েছে। তাদের কাছ থেকে কর সংগ্রহ করা বড় ধরনের অপারেশনাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। তাছাড়া ছোট ব্যবসায়ীদের অনেকেরই টিআইএন নেই, যা হয়রানির ঝুঁকি বাড়াবে। এই অতিরিক্ত প্রশাসনিক বোঝা পরিবেশকরা কীভাবে সামলাবেন তা এখনো স্পষ্ট নয়।”

  • প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ: দেশের এই শীর্ষস্থানীয় গ্রুপের দেশব্যাপী প্রায় ২২,০০০ ডিলার রয়েছে, যারা প্রায় ১৫ লাখ খুচরা বিক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছায়। গ্রুপের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল সতর্ক করে বলেন, “খুচরা বিক্রেতাদের কাছে সরাসরি পৌঁছানো কঠিন বলেই সরকার ডিস্ট্রিবিউটরদের ব্যবহার করতে চাইছে। তবে ডিস্ট্রিবিউশন পর্যায়ে এই দায়িত্ব যুক্ত করা হলে পরিচালন ব্যয় (অপারেশনাল কস্ট) উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং বিদ্যমান সাপ্লাই চেইনের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করবে।”

বাজারে মূল্যের ওপর প্রভাব: এনবিআর বনাম ব্যবসায়ী

নতুন এই করের ফলে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়বে কি না, তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতভিন্নতা দেখা দিয়েছে।

ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা: ব্যবসায়ী নেতারা সতর্ক করেছেন যে, খুচরা বিক্রেতারা তাদের মুনাফার মার্জিন বা লাভ ঠিক রাখতে এই অতিরিক্ত করের বোঝা পণ্যের মূল্যের সাথে যোগ করে দিতে পারেন। এর ফলে নিত্যব্যবহার্য ভোগ্যপণ্য (এফএমসিজি), খাদ্যসামগ্রী, ওষুধ, সিমেন্ট, স্টিল এবং আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন খাতের পণ্যের দাম বাড়তে পারে, যার চূড়ান্ত ভুক্তভোগী হবে সাধারণ ভোক্তা।

এনবিআরের ব্যাখ্যা: তবে এনবিআর কর্মকর্তারা এই আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, করের হার অত্যন্ত সামান্য (হাজারে মাত্র ২ টাকা) হওয়ায় পণ্যের দাম বাড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। এটি মূলত খরচ বাড়ানোর জন্য নয়, বরং কর পরিপালন ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য করা হচ্ছে এবং বছর শেষে সমন্বয় ও রিফান্ডের সুযোগ তো থাকছেই।

করের পরিধি বাড়ার সম্ভাবনা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা

চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও কর বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগের মধ্যে ইতিবাচক সম্ভাবনাও দেখছেন। আয়কর বিশেষজ্ঞ এবং এসএমএসি অ্যাডভাইজরি লিমিটেডের ম্যানেজিং পার্টনার স্নেহাশিষ বড়ুয়া বলেন, “পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়ে কর সংগ্রহ করা হলে তা অনানুষ্ঠানিক খুচরা খাতের লেনদেনগুলোকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে সাহায্য করবে।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, পাইকারি ক্রয়ের ডকুমেন্টেশন উন্নত হলে ছোট খুচরা বিক্রেতাদের অপ্রদর্শিত আয় সামনে আসবে। এর ফলে একদিকে যেমন জাতীয় করের পরিধি বাড়বে, অন্যদিকে কর প্রদানকারী সুপারমার্কেটগুলোর সাথে সাধারণ খুচরা বিক্রেতাদের একটি ন্যায্য ও সমমানের প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হবে। পাশাপাশি এই ব্যবস্থাটি ভ্যাট কাঠামোর ডাটা ইন্টিগ্রেশন বা তথ্য সমন্বয়কেও সহজতর করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *