এক্সেল পে-ফিক্সেশন ২০২৬: এক্সেলে স্বয়ংক্রিয় বেতন ফিক্সেশনের হিসাব, ধাপে ধাপে নতুন মূল বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি
নিজের বর্তমান গ্রেড ও মূল বেতন বসালেই জানা যাবে নতুন বেসিক, ইনক্রিমেন্ট এবং পর্যায়ক্রমে বেতন বৃদ্ধির হিসাব—তবে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য যাচাই জরুরি
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন নির্ধারণ বা পে-ফিকেশন নিয়ে আগ্রহের মধ্যে জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ অনুযায়ী বেতন হিসাবের একটি স্বয়ংক্রিয় এক্সেল ফরম গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারে। ফরমটিতে বর্তমান গ্রেড ও মূল বেতন ইনপুট দিলে নির্ধারিত সূত্র অনুযায়ী নতুন বেসিক, বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ, ইনক্রিমেন্টসহ বেতন এবং বিভিন্ন পর্যায়ে প্রাপ্য বেতনের হিসাব দেখা যায়।
‘Pay Fixation Form 2026’ নামের এক্সেল ফাইলটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এতে তিনটি শিট রয়েছে—‘ফিক্সেশন ফরম’, ‘স্কেল ২০২৬’ এবং ‘নির্দেশিকা’। প্রথম শিটে তথ্য ইনপুট ও হিসাবের ফলাফল, দ্বিতীয় শিটে গ্রেডভিত্তিক বেতনধাপ এবং তৃতীয় শিটে হিসাবের নিয়ম, ব্যবহারবিধি ও সতর্কতা দেওয়া হয়েছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি একটি সহায়ক হিসাবের ফরম। ফাইলের নির্দেশিকায় উল্লেখিত সূত্র ও বেতনধাপ সরকারি গেজেটের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। এক্সেলে কোনো হিসাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হওয়া মানেই সেটি সরকারি কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত চূড়ান্ত পে-ফিকেশন নয়।
কীভাবে কাজ করবে স্বয়ংক্রিয় পে-ফিকেশন ফরম?
ফরমটির ব্যবহারবিধি অনুযায়ী, প্রথমে ‘ফিক্সেশন ফরম’ শিটে যেতে হবে। এরপর দুটি নির্ধারিত ঘরে তথ্য দিতে হবে।
১. বর্তমান গ্রেড নম্বর: ১ থেকে ২০-এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট গ্রেড নম্বর লিখতে হবে।
২. বর্তমান মূল বেতন: ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে প্রযোজ্য মূল বেতন লিখতে হবে।
এখানে ইংরেজি সংখ্যায় তথ্য দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। এই দুটি তথ্য সঠিকভাবে বসানোর পর ফরমের সূত্রগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে। কর্মচারীর নাম, পদবি, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, অফিসের নাম, মোবাইল নম্বর, জন্মতারিখ এবং চাকরিতে যোগদানের তথ্যের মতো অন্যান্য ঘর প্রয়োজন অনুযায়ী পূরণ করতে হবে।
ফরমের নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, পিপি বা পার্সোনাল পে থাকলে সংশ্লিষ্ট ঘরে তা লিখতে হবে; না থাকলে শূন্য রাখা যাবে। তবে পিপি-সংক্রান্ত হিসাবের ক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশনার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া বিশেষভাবে জরুরি।
নতুন মূল বেতন কীভাবে নির্ধারণ করা হয়?
এক্সেল ফাইলটির নির্দেশিকা অনুযায়ী, সাধারণ বেতন ফিক্সেশনের জন্য প্রথমে ২০১৫ সালের বেতনস্কেলে সংশ্লিষ্ট গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন এবং কর্মচারীর বর্তমান মোট বেতনের পার্থক্য নির্ণয় করা হয়। এরপর সেই পার্থক্য ২০২৬ সালের বেতনস্কেলে সংশ্লিষ্ট গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে যোগ করা হয়।
হিসাবের ফলাফল নতুন স্কেলের কোনো নির্ধারিত ধাপের সঙ্গে মিলে গেলে সেই ধাপ বিবেচনা করা হয়। আর ফলাফল দুটি ধাপের মাঝখানে পড়লে পরবর্তী উচ্চতর ধাপ নেওয়ার নিয়ম ফরমটিতে ব্যবহার করা হয়েছে।
এ পদ্ধতির উদ্দেশ্য হলো, শুধু বর্তমান মূল বেতনের ওপর একটি নির্দিষ্ট শতাংশ যোগ না করে সংশ্লিষ্ট গ্রেডের পুরোনো স্কেল, বর্তমান বেতন এবং নতুন স্কেলের ধাপের ভিত্তিতে প্রাথমিক হিসাব করা।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ফরমটির সূত্রে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মূল বেতনের সঙ্গে পিপি যোগ করে মোট বেতন নির্ণয় করা হয়। ফলে পিপি থাকা কর্মচারীর ক্ষেত্রে হিসাবের ভিত্তি এবং চূড়ান্ত ফল সরকারি বিধির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত।
২০২৬ সালের বেতনস্কেলে গ্রেডভিত্তিক বেতনধাপ
এক্সেল ফাইলের ‘স্কেল ২০২৬’ শিটে ১ থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত বেতনধাপ সংরক্ষিত রয়েছে। এতে প্রতিটি গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন এবং পরবর্তী ধাপগুলো দেওয়া হয়েছে।
ফাইলটিতে অন্তর্ভুক্ত বেতনধাপের কয়েকটি উদাহরণ নিচে তুলে ধরা হলো।
| গ্রেড | প্রারম্ভিক মূল বেতন | সর্বোচ্চ প্রদর্শিত মূল বেতন |
|---|---|---|
| ১ম | ১,৫৬,০০০ টাকা | ১,৫৬,০০০ টাকা |
| ৫ম | ৮৬,০০০ টাকা | ১,৩৯,৭০০ টাকা |
| ৯ম | ৪৪,০০০ টাকা | ১,০৫,৯০০ টাকা |
| ১০ম | ৩২,০০০ টাকা | ৭৭,৩০০ টাকা |
| ১৬তম | ২১,৯০০ টাকা | ৫২,৯০০ টাকা |
| ২০তম | ২০,০০০ টাকা | ৪৮,৪০০ টাকা |
সূত্র: ব্যবহারকারীর সরবরাহ করা Pay Fixation Form 2026.xlsx ফাইলের ‘স্কেল ২০২৬’ শিট। এগুলো ফাইলের অন্তর্ভুক্ত তথ্য; সরকারি গেজেটের মূল সারণির সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া উচিত।
এই সারণির সুবিধা হলো, প্রতিটি গ্রেডের বেতনধাপ আলাদাভাবে মুখস্থ করে হিসাব করার প্রয়োজন হয় না। সংশ্লিষ্ট গ্রেড নির্বাচন করলে এক্সেল ফরম নিজেই সেই গ্রেডের বেতনধাপ ব্যবহার করে হিসাব করতে পারে।
নতুন বেতন নির্ধারণের পর কোন কোন তথ্য পাওয়া যাবে?
ফরমটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এতে শুধু নতুন মূল বেতন নয়, বরং বেতন নির্ধারণের একাধিক পর্যায়ের ফলাফলও দেখানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
১. পুরোনো স্কেলে বর্তমান বেতন: ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে প্রাপ্ত মূল বেতন এবং পিপি থাকলে তা যোগ করে মোট বেতন নির্ণয় করা হয়।
২. পুরোনো ও নতুন স্কেলের পার্থক্য: ২০১৫ সালের স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপের সঙ্গে বর্তমান বেতনের পার্থক্য নির্ণয় করা হয়।
৩. নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণ: নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপের সঙ্গে প্রাপ্ত পার্থক্য যোগ করে উপযুক্ত ধাপ নির্বাচন করা হয়।
৪. বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ: ফরমের সূত্র অনুযায়ী নতুন নির্ধারিত বেতন থেকে পুরোনো মোট বেতন বাদ দিয়ে বৃদ্ধির অঙ্ক বের করা হয়।
৫. ইনক্রিমেন্টসহ বেতন: ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হিসাবসহ সম্ভাব্য বেতন দেখানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
৬. পর্যায়ক্রমিক বেতন বৃদ্ধির হিসাব: ১ জুলাই ২০২৬, ১ জানুয়ারি ২০২৭ এবং ১ জুলাই ২০২৭-কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পর্যায়ের হিসাবের ঘর রয়েছে।
এখানে মনে রাখতে হবে, ফরমে দেখানো প্রতিটি ফলাফল সংশ্লিষ্ট গেজেটের প্রযোজ্য বিধি, কর্মচারীর চাকরির ইতিহাস এবং ইনক্রিমেন্টের যোগ্যতার সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করতে হবে।
পর্যায়ক্রমে বেতন বৃদ্ধির হিসাব নিয়ে কী জানা যাচ্ছে?
ফাইলটির ‘নির্দেশিকা’ শিটে প্রথম পর্যায়ে ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬, দ্বিতীয় পর্যায়ে ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন ২০২৭ এবং পরবর্তী পর্যায়ে ১ জুলাই ২০২৭ থেকে পূর্ণ বেতন বৃদ্ধির হিসাব দেখানোর সূত্র রয়েছে।
ফাইলের সূত্র অনুযায়ী, ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের জন্য প্রথম পর্যায়ে ৪০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির হিসাব দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে, ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের জন্য প্রথম পর্যায়ে ৫০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ৭৫ শতাংশের হিসাব রয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধির হিসাব দেখানো হয়েছে।
তবে এই শতাংশগুলোকে সব কর্মচারীর ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে প্রযোজ্য সরকারি পাওনা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। সংশ্লিষ্ট বেতন আদেশের সঠিক অনুচ্ছেদ এবং ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান যাচাই না করে এ হিসাবের ভিত্তিতে আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
সরকারি গেজেট ও iBAS++ পে-ফিকেশনের সঙ্গে সম্পর্ক
বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের গেজেট আর্কাইভে ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এস.আর.ও. নং ৩৪৭-আইন/২০২৬, ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ প্রকাশের তথ্য রয়েছে।
সরকারি বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে গেজেটের বিধানই মূল ভিত্তি। অন্যদিকে, এক্সেল ফরমটি প্রাথমিক হিসাব, সম্ভাব্য ফলাফল যাচাই এবং ভুল শনাক্ত করার কাজে সহায়ক হতে পারে।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সহায়ক ফরমে হিসাব পাওয়া এবং iBAS++ পোর্টালে আনুষ্ঠানিক পে-ফিকেশন সম্পন্ন হওয়া এক বিষয় নয়। ফাইলটির নির্দেশিকাতেও বলা হয়েছে, পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড, অগ্রিম ইনক্রিমেন্টসহ বিশেষ পরিস্থিতির সব বিধান এতে অন্তর্ভুক্ত নেই।
তাই কারও পদোন্নতি হয়ে থাকলে, উচ্চতর গ্রেড পাওয়া থাকলে, পিপি প্রযোজ্য হলে অথবা চাকরির ইতিহাসে বিশেষ কোনো বিষয় থাকলে সাধারণ ফরমের ফলাফল সরাসরি চূড়ান্ত বলে গ্রহণ করা উচিত নয়।
ফরম ব্যবহারের সময় যে ভুলগুলো এড়াতে হবে
স্বয়ংক্রিয় হিসাবের সুবিধা নিতে গিয়ে ভুল তথ্য দিলে ফলাফলও ভুল হতে পারে। তাই কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল রাখা দরকার।
- বর্তমান গ্রেড নম্বর সঠিকভাবে দিতে হবে।
- ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মূল বেতন নির্ভুলভাবে লিখতে হবে।
- পিপি থাকলে সংশ্লিষ্ট ঘরে সঠিক অঙ্ক দিতে হবে।
- ইনপুট ঘর এবং সূত্রযুক্ত ঘর আলাদা করে চিনতে হবে।
- ফরমের সতর্কবার্তা উপেক্ষা না করে পুরোনো ও নতুন বেতনস্কেলের সীমা যাচাই করতে হবে।
- হিসাবের ফলাফল iBAS++-এর ফলাফল ও প্রযোজ্য সরকারি আদেশের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে।
ফাইলটির নির্দেশিকায় আরও উল্লেখ রয়েছে, ফলাফলের ইংরেজি সংখ্যাগুলো ফরমের ডান পাশের হিসাবের কলামে দেখা যায়। ফলে প্রয়োজনে সংখ্যাগত হিসাব আলাদাভাবে যাচাই করা সম্ভব।
শেষ কথা
জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের হিসাব অনেক কর্মচারীর জন্য জটিল হতে পারে। বিশেষ করে পুরোনো স্কেলের বেতন, নতুন স্কেলের ধাপ, পিপি, ইনক্রিমেন্ট এবং পর্যায়ক্রমিক বেতন বৃদ্ধির হিসাব একসঙ্গে মিলিয়ে দেখা সহজ নয়।
‘Pay Fixation Form 2026.xlsx’ ফাইলটি এই কাজের একটি সহায়ক উপায়। বর্তমান গ্রেড ও মূল বেতন ইনপুট দিলে এটি একাধিক হিসাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেখাতে পারে। তবে সঠিক ফল পেতে ইনপুটের নির্ভুলতা, বেতনধাপের যথার্থতা এবং প্রযোজ্য সরকারি বিধান যাচাই করা অপরিহার্য।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য পরামর্শ: এক্সেল ফরমকে প্রাথমিক হিসাব ও যাচাইয়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করুন। চূড়ান্ত বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিস এবং iBAS++ পে-ফিকেশন পোর্টালের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
Download Link: Pay Fixation Form 2026
NB: ফাইলটি ডাউনলোড করে ওপেন করুন এবং হলুদ সেলগুলো পূরণ করুন ব্যাস ম্যাজিক দেখুন সব হিসাব অটো হয়ে যাবে।

