সরকারি আপডেট নিউজ

ঘুষ ছাড়া TA-DA বিল পাস : ভোগান্তি এড়াতে সরকারি চাকরিজীবীদের করণীয়

সরকারি চাকরিতে দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে কর্মকর্তাদের প্রায়শই বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত এবং অবস্থান করতে হয়, যার খরচ মেটাতে তারা বিধি মোতাবেক ভ্রমণ ও দৈনিক ভাতা (TA-DA) বিল পেয়ে থাকেন। সমস্ত কাগজপত্র শতভাগ বৈধ এবং বিধিসম্মতভাবে সাবমিট করার পরও অনেক সময় হিসাবরক্ষণ কার্যালয় (CA/AG অফিস) বা ক্যাশ সেকশনে বিল পাসের ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা ও পরোক্ষ অর্থ দাবির অভিযোগ ওঠে।

তবে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বিধি মোতাবেক জমা দেওয়া বিল পাসের জন্য কোনো ধরনের অনৈতিক লেনদেন বা অর্থ প্রদান করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ন্যায্য বিল সময়মতো পাওয়ার আইনি অধিকার রয়েছে। কোনো প্রকার অবৈধ অর্থ প্রদান না করেই নিয়মতান্ত্রিকভাবে কীভাবে এই বিল পাস করিয়ে নেওয়া সম্ভব, তার কিছু কার্যকর উপায় নিচে তুলে ধরা হলো:

১. আপত্তির লিখিত প্রমাণ চাওয়া (Audit Objection)

কোনো বিল টেবিলে আটকে থাকলে বা মৌখিক অজুহাতে বিলম্ব করা হলে, প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সংশ্লিষ্ট অডিট সেকশনের কাছে লিখিত আপত্তি দাবি করা উচিত।

“উত্থাপিত আপত্তিটি (Audit Objection) দয়া করে আমাকে লিখিতভাবে বা বিলের গায়ে নোট আকারে দিন, যেন আমি বিধি মোতাবেক সংশোধন করতে পারি।” অফিসিয়াল নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বিল আটকে রাখলে তার সুনির্দিষ্ট কারণ নথিতে বা সিস্টেমে উল্লেখ করতে হয়। সাধারণত লিখিতভাবে আপত্তি দিতে বললে অনাহুত বা খামখেয়ালি অজুহাত দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়, কারণ যেকোনো লিখিত সিদ্ধান্তের জন্য পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট অডিটরকে জবাবদিহি করতে হয়।

২. আইবাস++ (iBAS++)-এ ডিজিটাল ট্র্যাকিং

বর্তমানে সরকারি সকল আর্থিক লেনদেন এবং বিল প্রক্রিয়া iBAS++ (Integrated Budget and Accounting System) নামক অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। বিল সাবমিট করার পর সেটি কোন টেবিলে, কী অবস্থায় (Audited, Approved, নাকি Rejected) আছে, তা অনলাইনেই ট্র্যাক করা সম্ভব। কোনো বৈধ কারণ ছাড়া যদি সিস্টেমে বিল রিজেক্ট বা হোল্ড করা হয়, তবে তার ডিজিটাল রেকর্ড থেকে যায়, যা পরবর্তীতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।

৩. ডিডিও (DDO) বা দপ্তর প্রধানের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি

বিলটি যেহেতু বিধিসম্মত, তাই নিজ দপ্তরের DDO (Drawing and Disbursing Officer) বা সংস্থাপন শাখার প্রধানের শরণাপন্ন হওয়া অত্যন্ত কার্যকর। আপনার দপ্তরের প্রধান কর্মকর্তা বিলটি পাসের জন্য CA/AG অফিসের সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তাদের (যেমন: CAO বা DCA) অফিসিয়ালি ডিও লেটার (DO Letter) পাঠাতে পারেন অথবা দাপ্তরিকভাবে যোগাযোগ করে চাপ সৃষ্টি করতে পারেন। আন্তঃদাপ্তরিক এই যোগাযোগ সাধারণত দ্রুত ফল দেয়।

৪. জেলা/বিভাগীয় হিসাবরক্ষণ অফিসে অভিযোগ ও গণশুনানি

যদি কোনো নির্দিষ্ট টেবিলে বা কর্মচারীর দ্বারা ইচ্ছাকৃতভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়, তবে ভুক্তভোগী কর্মকর্তা নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে পারেন:

  • লিখিত অভিযোগ: সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের প্রধান (যেমন: Divisional Controller of Accounts বা District Accounts and Finance Officer)-এর নিকট লিখিতভাবে বিষয়টি জানানো।

  • গণশুনানি (Public Hearing): বর্তমানে প্রায় প্রতিটি জেলা ও বিভাগীয় হিসাবরক্ষণ অফিসে সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে (যেমন: প্রতি বুধবার) গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সরাসরি উপস্থিত হয়ে চিফ অ্যাকাউন্টস অফিসারের সামনে হয়রানির বিষয়টি তুলে ধরলে তাৎক্ষণিক সমাধান পাওয়া সম্ভব।

৫. দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সহায়তা গ্রহণ

সমস্ত নিয়ম মেনে চলার পরও যদি চরম হয়রানি বা সরাসরি ঘুষের দাবি করা হয়, তবে চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসেবে দুর্নীতি দমন কমিশনের হটলাইন নম্বর ১০৬ (106)-এ কল করে অভিযোগ জানানো যেতে পারে। অভিযোগের সত্যতা থাকলে দুদক টিম যেকোনো সরকারি দপ্তরে আকস্মিক অভিযান বা ‘ফাঁদ পেতে’ অপরাধীকে ধরার এখতিয়ার রাখে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ:

আপনার কাগজপত্র এবং বিলের ভাউচার যদি শতভাগ সঠিক ও নিয়মতান্ত্রিক থাকে, তবে কোনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে ধৈর্য ধরে দাপ্তরিক ও আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে এগোলে অনিয়ম প্রতিরোধ করা সম্ভব। সচেতনতাই পারে সরকারি সেবা খাতগুলোকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করে তুলতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *