বেতনকাঠামো তিন ধাপ হতে দুই ধাপে বাস্তবায়ন ২০২৬ : সম্পদ বিবরণী দাখিলের শর্তে নতুন বেতন বৃদ্ধি কার্যকরের সুপারিশ?
সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো (পে-স্কেল) বাস্তবায়নে দুই ধাপের পরিকল্পনার দিকে এগোচ্ছে সরকার। অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন বেতনকাঠামোর মূল বেতন কার্যকর হতে পারে। তবে নতুন কাঠামোর আওতায় ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা ২০২৭-২৮ অর্থবছরের শুরু থেকে কার্যকর করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
এদিকে, যেসব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়মিত আয়, ব্যয় ও সম্পদের বিবরণী (সম্পদ বিবরণী) প্রকাশ করবেন, তাদের ক্ষেত্রেই শর্তসাপেক্ষে নতুন বেতন বৃদ্ধি কার্যকর করার সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
দুই ধাপে বাস্তবায়নের চিন্তা কেন?
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী শুরুতে একসঙ্গে পুরো বেতনকাঠামো কার্যকর করার বিষয়টি বিবেচনায় থাকলেও বাস্তব হিসাব-নিকাশে বেশ কিছু জটিলতা সামনে এসেছে। বিশেষ করে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, বর্তমান বেতন কাঠামো এবং নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে বিভিন্ন অসামঞ্জস্য দেখা দেওয়ায় বাস্তবায়নের কৌশলে পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রথম ধাপে কেবল মূল বেতন বৃদ্ধি কার্যকর করা হলে সরকারি কর্মচারীরা দ্রুত এর সুবিধা পাবেন এবং দ্বিতীয় ধাপে বিভিন্ন ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুবিধা কার্যকর করা তুলনামূলক সহজ হবে।
অর্থ বিভাগের মূল্যায়ন
অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকেই নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের প্রস্তুতি রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১১ বছর ধরে সরকারি চাকরিজীবীরা একই বেতনকাঠামোর আওতায় রয়েছেন। এ সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাই নতুন কাঠামো বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদও মনে করেন, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা থাকলে একবারেই পুরো বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করা উত্তম। তবে তা সম্ভব না হলে তিন ধাপের পরিবর্তে দুই ধাপে বাস্তবায়ন অধিক যৌক্তিক হবে। একই সঙ্গে তিনি সরকারি কর্মচারীদের রাজস্ব আহরণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
আগে কী সুপারিশ ছিল?
সরকার গঠিত বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন কমিটি শুরুতে তিন ধাপে নতুন পে-স্কেল কার্যকর করার সুপারিশ করেছিল। সে অনুযায়ী—
- ১ জুলাই ২০২৬ থেকে প্রস্তাবিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ,
- ১ জুলাই ২০২৭ থেকে বাকি ৫০ শতাংশ,
- ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে নতুন ভাতা কার্যকর করার প্রস্তাব ছিল।
তবে পরবর্তীতে বাস্তব প্রয়োগের জটিলতা বিবেচনায় এনে এখন দুই ধাপের মডেল নিয়ে আলোচনা চলছে।
সম্পদ বিবরণী প্রকাশে শর্ত
নতুন বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তও সামনে এসেছে। যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়মিতভাবে আয়, ব্যয় ও সম্পদের বিবরণী দাখিল ও প্রকাশ করবেন, তাদের ক্ষেত্রেই নতুন বেতন সুবিধা কার্যকর করার সুপারিশ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আরও জোরদার হতে পারে।
অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন কত?
বেতন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, নতুন বেতনকাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে বছরে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হতে পারে।
অন্যদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অনুমোদিত বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে পুরো নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মত
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের আগে সরকারের রাজস্ব আয়, বাজেট ঘাটতি, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনা করা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের কর্মদক্ষতা, সেবা প্রদান এবং জবাবদিহিতা বৃদ্ধির বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
কী হতে পারে পরবর্তী পদক্ষেপ?
বর্তমান আলোচনার ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে—
- ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতনকাঠামোর মূল বেতন কার্যকর হতে পারে।
- ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে নতুন ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা চালু হতে পারে।
- সম্পদ বিবরণী দাখিল ও প্রকাশের বিষয়টি বেতন সুবিধা পাওয়ার অন্যতম শর্ত হিসেবে যুক্ত হতে পারে।
- চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারের অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন জারির পরই কার্যকর হবে।
উল্লেখ্য, এ বিষয়ে এখনও সরকারের চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়নি। ফলে বাস্তবায়নের সময়সূচি ও কাঠামো সরকারিভাবে ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত এটিকে নীতিগত আলোচনা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রভিত্তিক তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

