সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা ‘ই-পেমেন্ট ক্রেডিট’ চালু, মিলবে ৩০ দিন পর্যন্ত সময়
হঠাৎ হাতে টাকা না থাকলেও জরুরি বিল বা প্রয়োজনীয় ডিজিটাল পেমেন্ট আটকে থাকবে না। গ্রাহকদের সাময়িক তারল্য সংকট মোকাবিলায় সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ‘ই-পেমেন্ট ক্রেডিট’ সুবিধা চালুর অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সুবিধায় প্রচলিত সুদের পরিবর্তে নির্ধারিত সার্ভিস ফি দিতে হবে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি হবে ডিজিটাল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর BRPD-1 Circular No. 17-এ ‘e-Payment Credit’ চালুর বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটেও সার্কুলারটি প্রকাশ করা হয়েছে।
কী এই ‘ই-পেমেন্ট ক্রেডিট’
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন ব্যবস্থাটি মূলত এমন একটি স্বল্পমেয়াদি ডিজিটাল ঋণসুবিধা, যার মাধ্যমে কোনো গ্রাহকের কাছে তাৎক্ষণিক পর্যাপ্ত টাকা না থাকলেও নির্দিষ্ট জরুরি পেমেন্ট সম্পন্ন করা যাবে।
তবে এটি সাধারণভাবে হাতে নগদ টাকা পাওয়ার ঋণ নয়। অনুমোদিত ক্রেডিট সরাসরি নির্ধারিত বিলার বা সেবা প্রদানকারীকে ডিজিটাল মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে। অর্থাৎ গ্রাহক এই অর্থ নিজের হাতে নিতে পারবেন না, নিজের ওয়ালেটে যোগ করতে পারবেন না এবং নিজের অন্য কোনো ব্যাংক হিসাবেও স্থানান্তর করতে পারবেন না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, সাময়িক তারল্য সংকটের কারণে ইউটিলিটি বিল, মোবাইল রিচার্জ, শিক্ষা বা চিকিৎসা ব্যয়সহ প্রয়োজনীয় পেমেন্ট বিলম্বিত হলে সেবা বিচ্ছিন্নতা বা আর্থিক জরিমানার মতো সমস্যা হতে পারে। নতুন সুবিধার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো এসব পেমেন্ট সময়মতো সম্পন্ন করা।
কত টাকা পর্যন্ত পাওয়া যাবে?
নতুন ব্যবস্থায় সর্বনিম্ন ৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্রেডিট সুবিধা রাখা হয়েছে।
ঋণের পরিমাণ ও নির্ধারিত সর্বোচ্চ সার্ভিস ফি হলো—
| ক্রেডিটের পরিমাণ | ৭ দিনের ফি | ১৫ দিনের ফি | ৩০ দিনের ফি |
|---|---|---|---|
| ৫০–২৫০ টাকা | ৩ টাকা | ৪ টাকা | ৬ টাকা |
| ২৫১–৫০০ টাকা | ৫ টাকা | ৮ টাকা | ১৫ টাকা |
| ৫০১–১,০০০ টাকা | ৭ টাকা | ১২ টাকা | ২০ টাকা |
| ১,০০১–২,০০০ টাকা | ১০ টাকা | ২০ টাকা | ৩০ টাকা |
| ২,০০১–৩,০০০ টাকা | ১৫ টাকা | ৩০ টাকা | ৫০ টাকা |
| ৩,০০১–৫,০০০ টাকা | ২০ টাকা | ৪০ টাকা | ৭০ টাকা |
| ৫,০০১–৭,০০০ টাকা | ২৫ টাকা | ৫০ টাকা | ৯০ টাকা |
| ৭,০০১–১০,০০০ টাকা | ৩৫ টাকা | ৭০ টাকা | ১৩০ টাকা |
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত কাঠামো অনুযায়ী, ক্রেডিটের মেয়াদ হবে ৭, ১৫ অথবা ৩০ দিন।
উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক
ধরা যাক, কোনো গ্রাহকের জরুরি ১০ হাজার টাকার বিল পরিশোধ করতে হবে, কিন্তু ওই মুহূর্তে অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত অর্থ নেই। অনুমোদিত ব্যাংকের ব্যবস্থার মাধ্যমে তিনি যদি ১০ হাজার টাকা ‘ই-পেমেন্ট ক্রেডিট’ নেন এবং ৩০ দিনের মেয়াদ বেছে নেন, তাহলে নির্ধারিত সর্বোচ্চ ফি হবে ১৩০ টাকা।
অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মূল ১০ হাজার টাকা এবং ১৩০ টাকা ফি পরিশোধ করতে হবে।
অন্যদিকে ৭ দিনের জন্য একই ১০ হাজার টাকার ক্রেডিট নিলে সর্বোচ্চ ফি হবে ৩৫ টাকা।
কোন কোন কাজে ব্যবহার করা যাবে?
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রাথমিকভাবে কয়েকটি নির্দিষ্ট খাতকে এ সুবিধার আওতায় এনেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাসসহ ইউটিলিটি বিল
- মোবাইল রিচার্জ
- শিক্ষাসংক্রান্ত ফি
- স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত ব্যয়
- টোল ও টিকিটের খরচ
- কর ও অন্যান্য সরকারি সেবা ফি
- আমানতের কিস্তি
- বীমার প্রিমিয়াম
- বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত অন্যান্য ব্যয় বা ফি
অর্থাৎ, নতুন সুবিধাটি মূলত দৈনন্দিন ও প্রয়োজনীয় ডিজিটাল পেমেন্ট নির্বিঘ্ন রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
এটি কি সাধারণ ঋণ বা নগদ লোন?
না।
‘ই-পেমেন্ট ক্রেডিট’কে সাধারণ ভোক্তা ঋণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, এ ক্রেডিট কেবল নির্ধারিত ডিজিটাল পেমেন্টের জন্য ব্যবহার করা যাবে। এটি নগদে রূপান্তর, গ্রাহকের ওয়ালেটে যোগ কিংবা গ্রাহকের অন্য কোনো হিসাবে স্থানান্তর করা যাবে না।
এ কারণে কোনো গ্রাহক ব্যক্তিগত কেনাকাটা, নগদ উত্তোলন বা অন্য কোনো ভোক্তা ব্যয়ের জন্য এ সুবিধা ব্যবহার করতে পারবেন না।
সুদ নয়, দিতে হবে নির্ধারিত ফি
নতুন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে প্রচলিত অর্থে সুদের পরিবর্তে নির্ধারিত সার্ভিস ফি নেওয়া হবে।
আর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করলে অতিরিক্ত কোনো ফি, সুদ, চার্জ, আগাম পরিশোধ ফি বা ফোরক্লোজার চার্জ নেওয়া যাবে না।
তবে নির্ধারিত তারিখে টাকা পরিশোধ না করলে অতিরিক্ত দৈনিক জরিমানা বা ফি আরোপের বিধান রয়েছে। এই অতিরিক্ত ফি সংশ্লিষ্ট ৩০ দিনের ক্রেডিটের দৈনিক ফি অনুযায়ী হিসাব করা হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক এর সর্বোচ্চ সীমাও নির্ধারণ করে দিয়েছে।
টাকা পরিশোধের সময় কখন?
৭ দিনের ক্রেডিটের মূল টাকা ও প্রযোজ্য ফি পরিশোধের নির্ধারিত দিন হবে অর্থ ছাড়ের ৮ম দিন।
১৫ দিনের ক্ষেত্রে ১৬তম দিন এবং ৩০ দিনের ক্ষেত্রে ৩১তম দিন পরিশোধের দিন হিসেবে গণ্য হবে।
অর্থাৎ, নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই গ্রাহককে মূল টাকা ও প্রযোজ্য ফি পরিশোধের প্রস্তুতি রাখতে হবে।
পুরো প্রক্রিয়াই হবে ডিজিটাল
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ‘ই-পেমেন্ট ক্রেডিট’-এর আবেদন থেকে শুরু করে অনুমোদন, অর্থ প্রদান এবং পরিশোধ—সবকিছুই ব্যাংক অনুমোদিত ডিজিটাল অ্যাপ বা চ্যানেলের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে।
কাগজে ভেজা স্বাক্ষরের পরিবর্তে গ্রাহকের পরিচয় ইলেকট্রনিক অথেনটিকেশন পদ্ধতিতে যাচাই করা হবে। গ্রাহকের নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে অনবোর্ডিং এবং OTP-এর পাশাপাশি 2FA, MFA বা ব্যাংক অনুমোদিত নিরাপদ অথেনটিকেশন পদ্ধতি ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে।
প্রয়োজনে ব্যাংকগুলো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার, পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটর ও অন্যান্য ফিনটেক প্রতিষ্ঠানকে সেবা প্রদানের চ্যানেল হিসেবে যুক্ত করতে পারবে।
সবার জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১০ হাজার টাকা পাওয়া যাবে না
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বোচ্চ সীমা ১০ হাজার টাকা নির্ধারণ করলেও এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক গ্রাহক স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১০ হাজার টাকা পাবেন।
ব্যাংকগুলোকে নিজস্ব বোর্ড-অনুমোদিত নীতির ভিত্তিতে ডিজিটাল ক্রেডিট স্কোরিং ও ঝুঁকিভিত্তিক ক্রেডিট সীমা নির্ধারণ করতে হবে। ফলে গ্রাহকভেদে অনুমোদিত সীমা ভিন্ন হতে পারে।
এ ছাড়া খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের নতুন করে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। গ্রাহকের বিদ্যমান ঋণ ও সামগ্রিক ঋণ শ্রেণিকরণ পরিস্থিতি সম্পর্কেও ডিজিটাল ‘Yes/No’ ঘোষণা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
ছয় মাসের পাইলট প্রকল্পের পর বাণিজ্যিকভাবে চালু
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনা দিলেও সব ব্যাংকে সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ গ্রাহকের জন্য এটি চালু হয়ে যাচ্ছে না।
সার্কুলার অনুযায়ী, বাণিজ্যিকভাবে চালুর আগে ব্যাংকগুলোকে কমপক্ষে ছয় মাসের পাইলট বাস্তবায়ন করতে হবে। পাইলটের ফলাফল মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় সংশোধন ও গ্রাহকের মতামত বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে Product Program Guidelines (PPG) চূড়ান্ত করতে হবে। এরপর পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে সেবা চালু করা যাবে।
বাণিজ্যিকভাবে চালুর পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে পাইলট মূল্যায়ন প্রতিবেদন ও অনুমোদিত PPG জমা দিতে হবে।
গ্রাহকের জন্য সুবিধা কোথায়?
এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে স্বল্প সময়ের নগদ সংকটের কারণে জরুরি বিল বা ফি আটকে যাওয়া ঠেকানো।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো পরিবারের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের শেষ তারিখ চলে এসেছে, কিন্তু বেতন পাওয়ার আর কয়েক দিন বাকি। এমন পরিস্থিতিতে যোগ্য গ্রাহক ব্যাংকের অনুমোদিত ডিজিটাল চ্যানেলের মাধ্যমে ক্রেডিট নিয়ে সরাসরি বিল পরিশোধ করতে পারবেন। পরে নির্ধারিত সময়ে মূল টাকা ও ফি পরিশোধ করবেন।
একইভাবে মোবাইল রিচার্জ, শিক্ষা ফি, চিকিৎসা ব্যয়, সরকারি ফি কিংবা বীমার প্রিমিয়ামের মতো প্রয়োজনীয় পেমেন্টেও এ সুবিধা কাজে লাগতে পারে।
তবে সতর্কতাও জরুরি
সুবিধাটি স্বল্পমেয়াদি হলেও এটিকে নিয়মিত আয়ের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না। কারণ সময়মতো পরিশোধ না করলে অতিরিক্ত দৈনিক ফি যুক্ত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি অনাদায়ের ক্ষেত্রে ঋণ শ্রেণিকরণ ও আদায়সংক্রান্ত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ব্যাংকের রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকও ব্যাংকগুলোকে গ্রাহকের সম্মতি নেওয়ার আগে ক্রেডিটের ধরন, পরিমাণ, মেয়াদ, ফি ও পরিশোধ পদ্ধতিসহ সব গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পরিষ্কারভাবে জানাতে বলেছে।
‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’-এর পথে নতুন পদক্ষেপ
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগকে দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও সম্প্রসারণের একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলারেও ডিজিটাল পেমেন্টের প্রসার, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং ক্যাশলেস সমাজ গঠনের সঙ্গে এ উদ্যোগের উদ্দেশ্যকে যুক্ত করা হয়েছে।
তবে বাস্তব সাফল্য নির্ভর করবে ব্যাংকগুলো কতটা নিরাপদ, স্বচ্ছ ও গ্রাহকবান্ধবভাবে এই সেবা চালু করতে পারে তার ওপর। বিশেষ করে ক্রেডিট সীমা নির্ধারণ, ডিজিটাল পরিচয় যাচাই, তথ্যের নিরাপত্তা, ফি প্রকাশ এবং সময়মতো ঋণ পরিশোধ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সারকথা হলো—বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন ‘ই-পেমেন্ট ক্রেডিট’ ব্যবস্থায় যোগ্য গ্রাহক ৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্দিষ্ট জরুরি ডিজিটাল পেমেন্ট করতে পারবেন। মেয়াদ হবে ৭, ১৫ বা ৩০ দিন এবং নির্ধারিত ফি দিতে হবে। তবে এটি হাতে পাওয়া নগদ ঋণ নয়; অর্থ সরাসরি অনুমোদিত বিলারকে পরিশোধ করা হবে। আর সাধারণ গ্রাহকের জন্য বাণিজ্যিকভাবে চালুর আগে ব্যাংকগুলোকে অন্তত ছয় মাসের পাইলট বাস্তবায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার: BRPD-1 Circular No. 17 — e-Payment Credit

