৯ম পে স্কেল নিউজ

৩১ আগস্টের মধ্যে নবম পে-স্কেলের গেজেট না হলে নতুন কর্মসূচি, ২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন অভিমুখে পদযাত্রার ঘোষণা

বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে অপেক্ষা ও উদ্বেগের পাশাপাশি নতুন করে আন্দোলনের প্রস্তুতিও জোরদার হচ্ছে। ৩১ আগস্টের মধ্যে ‘বৈষম্যমুক্ত’ নবম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ না হলে ১ সেপ্টেম্বর থেকে ধারাবাহিক কর্মসূচিতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ। সংগঠনটির ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে দপ্তরের সামনে অবস্থান, স্মারকলিপি প্রদান, বিভাগীয় প্রতিনিধি সম্মেলন এবং সর্বশেষ ২ অক্টোবর ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন অভিমুখে শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা।

৩১ আগস্টকে ‘শেষ সময়সীমা’ হিসেবে দেখছে ঐক্য পরিষদ

২১ আগস্ট জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের নেতারা তাদের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কর্মচারীরা নতুন বেতন কাঠামোর অপেক্ষায় রয়েছেন। সর্বশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার পর আর নতুন জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে বর্তমান মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে পুরোনো বেতন কাঠামোর সামঞ্জস্য নিয়ে কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

ঐক্য পরিষদের মূল দাবি হলো—পে-কমিশনের সুপারিশের আলোকে ১:৪ বেতন অনুপাত, ১২টি গ্রেড এবং সর্বনিম্ন ৩৫ হাজার টাকা বেতন নির্ধারণ করে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা। সংগঠনটি ৩১ আগস্টের মধ্যেই এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশের দাবি জানিয়েছে।

১ সেপ্টেম্বর থেকেই শুরু হবে ধারাবাহিক কর্মসূচি

গেজেট নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকাশ না হলে ১ সেপ্টেম্বর থেকে কর্মসূচি শুরু করার কথা জানিয়েছে ঐক্য পরিষদ।

ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টায় দেশের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের মূল ফটকের সামনে ৩০ মিনিট অবস্থান করবেন কর্মচারীরা। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফিস প্রধানের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হবে।

এরপর ৬ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টায় বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধির মাধ্যমে জেলা প্রশাসকের কাছে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে। পাশাপাশি ১ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভাগীয় পর্যায়ে প্রতিনিধি সম্মেলন করার কথা জানিয়েছে সংগঠনটি।

২ অক্টোবর ঢাকায় বড় জমায়েতের পরিকল্পনা

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি রাখা হয়েছে ২ অক্টোবর। ওই দিন প্রজাতন্ত্রের সব সরকারি কর্মচারীকে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমবেত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সেখান থেকে নবম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন অভিমুখে পদযাত্রা করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

তবে সংগঠনের প্রচারিত বক্তব্যে এটিকে শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমানে ঘোষিত কর্মসূচি ‘প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাও’ নয়; বরং শহীদ মিনার থেকে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন অভিমুখে পদযাত্রা। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ঘেরাও’ শব্দ ব্যবহার করে যে প্রচারণা হচ্ছে, সেটিকে সংগঠনের ঘোষিত কর্মসূচির সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না।

সাত দফা দাবিতে জোর

গেজেট প্রকাশের পাশাপাশি ঐক্য পরিষদ বেশ কয়েকটি প্রশাসনিক ও বেতন বৈষম্যসংক্রান্ত দাবি সামনে এনেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

  • ১:৪ অনুপাতের ভিত্তিতে ১২ গ্রেডে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন;
  • সর্বনিম্ন বেতন ৩৫ হাজার টাকা নির্ধারণ;
  • ২০১৫ সালের পে-স্কেলে বাতিল হওয়া তিনটি টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পুনর্বহাল;
  • কর্মচারীদের জ্যেষ্ঠতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা;
  • ব্লক পদে কর্মরতদের পদোন্নতি অথবা নির্দিষ্ট সময় পর উচ্চতর গ্রেডের ব্যবস্থা;
  • টেকনিক্যাল পদে কর্মরতদের যথাযথ পদমর্যাদা নিশ্চিত করা;
  • স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের পেনশন সুবিধা সম্প্রসারণ এবং আনুতোষিকের হার বাড়ানো;
  • প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত কর্মচারীদের পূর্বের চাকরিকাল হিসাবের আওতায় আনা;
  • জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন ভাতা পুনর্নির্ধারণ;
  • ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি;
  • সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারীদের মধ্যকার বৈষম্য দূর করা;
  • বিভিন্ন সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে অভিন্ন নিয়োগবিধি প্রণয়ন।

কেন এতটা চাপ তৈরি হয়েছে?

নবম পে-স্কেল নিয়ে সরকারের কাজ এগোলেও গেজেট প্রকাশে একাধিক কারণে সময় লাগছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মূল বেতন বৃদ্ধির হার, বিভিন্ন ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা, জুডিশিয়াল সার্ভিসের বেতন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা—এসব বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা চলছে।

সাম্প্রতিক একাধিক প্রতিবেদনে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ বা মাঝামাঝি সময়ে গেজেট প্রকাশের প্রস্তুতির কথা বলা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী মন্ত্রিসভার অনুমোদন, আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে গেজেট প্রকাশ হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

এখানেই সরকারি কর্মচারীদের দাবির সঙ্গে সম্ভাব্য সরকারি সময়সূচির বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়েছে। কর্মচারীদের সংগঠন ৩১ আগস্টের মধ্যে গেজেট চায়, অন্যদিকে বিভিন্ন প্রতিবেদনে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ বা মাঝামাঝি সময়কে সম্ভাব্য সময় হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।

১ জুলাই থেকে কার্যকর হলে বকেয়া নিয়ে প্রত্যাশা

নবম পে-স্কেল নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর কার্যকর তারিখ। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হতে পারে, যদিও গেজেট প্রকাশে বিলম্ব হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে গেজেট প্রকাশের পর পূর্ববর্তী সময়ের বেতন পুনর্নির্ধারণ করে বকেয়া অর্থ সমন্বয়ের বিষয়টি সামনে আসবে।

অর্থাৎ গেজেট যদি সেপ্টেম্বরেও প্রকাশ হয়, তাহলে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের পার্থক্য পরবর্তী সময়ে সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে বকেয়া কীভাবে, কোন সময়ে এবং কোন নিয়মে দেওয়া হবে—তা চূড়ান্ত গেজেট ও বাস্তবায়ন নির্দেশনার ওপর নির্ভর করবে।

আন্দোলন কি আরও কঠোর হতে পারে?

ঐক্য পরিষদের ঘোষণায় আপাতত ধারাবাহিকভাবে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির কথাই বলা হয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর অবস্থান ও স্মারকলিপি, ৬ সেপ্টেম্বর জেলা পর্যায়ে স্মারকলিপি, সেপ্টেম্বরজুড়ে প্রতিনিধি সম্মেলন এবং ২ অক্টোবর বড় পদযাত্রা—এই ধাপে কর্মসূচি সাজানো হয়েছে।

তবে ৩১ আগস্টের মধ্যে গেজেট না হলে কর্মসূচি বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়ায় সেপ্টেম্বর মাসটি নবম পে-স্কেল ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ২ অক্টোবরের কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতে কত সংখ্যক সরকারি কর্মচারী অংশ নেন এবং সরকার তখন কী অবস্থান নেয়—তার ওপর পরবর্তী পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে।

সরকারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সময়

নবম পে-স্কেল কেবল বেতন বাড়ানোর বিষয় নয়; এর সঙ্গে রাষ্ট্রের বিশাল সংখ্যক সরকারি কর্মচারীর বেতন-ভাতা, অবসর সুবিধা, পেনশন, বিভিন্ন প্রশাসনিক কাঠামো এবং সরকারের রাজস্ব ব্যয়ের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব জড়িত। তাই সরকারকে একদিকে কর্মচারীদের প্রত্যাশা ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টিও দেখতে হচ্ছে।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে বেতন-ভাতা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতির বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ফলে গেজেট প্রকাশের তারিখ যত পিছোবে, কর্মচারীদের প্রত্যাশা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যে তত বেশি চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।

এখন নজর ৩১ আগস্টের দিকে

সব মিলিয়ে নবম জাতীয় পে-স্কেল ঘিরে পরিস্থিতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকারি কর্মচারীদের প্রতিনিধিত্বকারী বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ ৩১ আগস্টকে গেজেট প্রকাশের সময়সীমা হিসেবে সামনে এনেছে। নির্ধারিত সময়ে গেজেট না হলে ১ সেপ্টেম্বর থেকে কর্মসূচি এবং ২ অক্টোবর ঢাকায় বড় পদযাত্রার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।

অন্যদিকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ বা মাঝামাঝি সময়ে গেজেট প্রকাশের প্রস্তুতির কথা বলা হচ্ছে।

ফলে আগামী কয়েক দিনেই স্পষ্ট হবে—৩১ আগস্টের মধ্যে কর্মচারীদের দাবির সময়সীমা অনুযায়ী গেজেট প্রকাশ হবে, নাকি সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী নতুন বেতন কাঠামোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে। আর যদি সময়সীমা পার হয়ে যায়, তাহলে ঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবে কতটা বড় আকার নেয়—সেটিই হবে পরবর্তী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

সোর্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *