Pay Fixation ফিক্সেশন

৯ম পে স্কেলে বেতন নির্ধারণের হিসাব: ৩০ জুনের মূল বেতন থেকে ১ জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্ট—যেভাবে ফিক্সেশন হবে

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ কার্যকর হয়েছে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে। নতুন বেতন কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো পুরোনো স্কেলের বেতন থেকে নতুন স্কেলে ‘পে ফিক্সেশন’ কীভাবে হবে। এ নিয়ে প্রকাশিত একটি বিস্তারিত ফিক্সেশন ছকে ৩০ জুন ২০২৬-এর মূল বেতন, সংশ্লিষ্ট গ্রেড, নতুন স্কেলের ধাপ এবং ১ জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্ট—সবকিছু ধারাবাহিকভাবে দেখানো হয়েছে।

প্রকাশিত ছকটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নতুন পে স্কেলে কর্মচারীর বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন দেখলেই চূড়ান্ত অঙ্ক পাওয়া যাবে না। বরং ৩০ জুন ২০২৬-এ যে মূল বেতন পাওয়া যাচ্ছিল, সেই বেতন নতুন স্কেলের সংশ্লিষ্ট ধাপে কীভাবে রূপান্তরিত হচ্ছে এবং ১ জুলাইয়ের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট কীভাবে যুক্ত হচ্ছে—এই দুই বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ।

৩০ জুনের বেতনই হবে ফিক্সেশনের অন্যতম ভিত্তি

জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী নতুন বেতন নির্ধারণে প্রথমে বিবেচনায় আসবে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে কর্মচারীর আহরিত মূল বেতন। এরপর কর্মচারী কোন গ্রেডে ছিলেন এবং সেই গ্রেডের নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপ কত—তা নির্ধারণ করে পুরোনো ও নতুন স্কেলের মধ্যে সামঞ্জস্য করা হবে।

অর্থাৎ, একই গ্রেডের দুজন কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতন যদি ভিন্ন হয়, তাহলে নতুন স্কেলেও তাদের ফিক্সেশন একই অঙ্কে নাও হতে পারে। নতুন প্রজ্ঞাপনে পে ফিক্সেশনের জন্য এ বিষয়ে পৃথক বিধান রাখা হয়েছে।

পে ফিক্সেশনের মূল হিসাবটি কী?

প্রকাশিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতন যদি পুরোনো সংশ্লিষ্ট স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে প্রথমে বর্তমান মূল বেতন থেকে পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন বাদ দিয়ে পার্থক্য বের করতে হবে।

এরপর সেই পার্থক্য নতুন জাতীয় বেতন স্কেলের সংশ্লিষ্ট গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে যোগ করা হবে।

সহজভাবে—

বর্তমান মূল বেতন – পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন = পার্থক্য

এরপর—

নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন + পার্থক্য = নতুন স্কেলে সমতুল্য বেতন

এই যোগফল যদি নতুন স্কেলের কোনো নির্দিষ্ট ধাপের সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে ওই ধাপে বেতন নির্ধারণ হবে। আর যদি ঠিক কোনো ধাপের সঙ্গে না মেলে, তাহলে বিধান অনুযায়ী পরবর্তী উচ্চতর ধাপে বেতন নির্ধারণ করা হবে।

উদাহরণে বিষয়টি আরও পরিষ্কার

ধরা যাক, কোনো কর্মচারীর ৩০ জুন ২০২৬-এর মূল বেতন ১৩,৭৯০ টাকা। তাঁর পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন ১২,৫০০ টাকা।

তাহলে পার্থক্য:

১৩,৭৯০ – ১২,৫০০ = ১,২৯০ টাকা।

যদি নতুন অনুরূপ স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন হয় ২৫,০০০ টাকা, তাহলে—

২৫,০০০ + ১,২৯০ = ২৬,২৯০ টাকা।

কিন্তু নতুন স্কেলে যদি ২৬,২৯০ টাকার কোনো ধাপ না থাকে এবং পরবর্তী ধাপ ২৬,৩০০ টাকা হয়, তাহলে নতুন মূল বেতন ২৬,৩০০ টাকায় নির্ধারিত হবে। প্রকাশিত ব্যাখ্যাতেও এই উদাহরণটি দেওয়া হয়েছে।

১ জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্ট কেন গুরুত্বপূর্ণ?

পে ফিক্সেশনের পাশাপাশি ১ জুলাই ২০২৬-এর বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট নতুন হিসাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ অনুযায়ী বার্ষিক বেতনবৃদ্ধির তারিখ প্রতি অর্থবছরের প্রথম দিন, অর্থাৎ ১ জুলাই। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারীর ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট যোগ্যতামূলক চাকরির মেয়াদ পূরণ হলে ইনক্রিমেন্টের বিধান রয়েছে।

এ কারণে প্রকাশিত ফিক্সেশন ছকে ৩০ জুনের বেতন এবং ১ জুলাইয়ের বেতনকে আলাদা করে দেখানো হয়েছে। একজন কর্মচারীর ক্ষেত্রে নতুন স্কেলে নির্ধারিত মূল বেতনের পর ১ জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্ট প্রযোজ্য হলে সেটিও চূড়ান্ত হিসাবের অংশ হবে।

তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার—ইনক্রিমেন্টের হিসাব কীভাবে প্রয়োগ হবে, সেটি সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনের বিধান অনুযায়ী করতে হবে; শুধু পুরোনো বেতনের ওপর সাধারণ শতাংশ প্রয়োগ করে নতুন বেতন ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

পুরো বর্ধিত বেতন এক ধাপে পাওয়া যাচ্ছে না

নতুন স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হলেও বর্ধিত বেতনের পুরো অংশ একসঙ্গে কার্যকর করার পরিবর্তে ধাপে ধাপে দেওয়ার বিধান রয়েছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের ক্ষেত্রে বর্ধিত বেতনের ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ কার্যকর হবে।

এরপর ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত যথাক্রমে ৭০ শতাংশ ও ৭৫ শতাংশ হারে বর্ধিত অংশ কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

ফলে নতুন স্কেলে একজন কর্মচারীর ‘পূর্ণ ফিক্সড বেতন’ এবং নির্দিষ্ট সময়ে বাস্তবে প্রাপ্য মূল বেতন—দুটি অঙ্ক আলাদা হতে পারে।

৯ম গ্রেড পর্যন্ত এবং ১০ম গ্রেড থেকে আলাদা হিসাব

এখানে গ্রেডভিত্তিক পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।

বিষয়১ম–৯ম গ্রেড১০ম–২০তম গ্রেড
১ জুলাই–৩১ ডিসেম্বর ২০২৬বর্ধিত অংশের ৪০%বর্ধিত অংশের ৫০%
১ জানুয়ারি–৩০ জুন ২০২৭বর্ধিত অংশের ৭০%বর্ধিত অংশের ৭৫%
পরবর্তী ধাপপূর্ণ কার্যকরপূর্ণ কার্যকর

এই কারণে একই পরিমাণ বর্তমান বেতন থেকে নতুন স্কেলে ফিক্সেশন হলেও সংশ্লিষ্ট সময়ে হাতে পাওয়া মূল বেতনের অঙ্ক গ্রেডভেদে আলাদা হতে পারে।

ছকটিতে ১ম থেকে ১০ম গ্রেডের ধারাবাহিক হিসাব

প্রদত্ত ছকে ১ম থেকে ১০ম গ্রেড পর্যন্ত বিভিন্ন বেতনের ধাপ দেখানো হয়েছে। প্রতিটি গ্রেডের ক্ষেত্রে বর্তমান বেতন, ৩০ জুন ২০২৬-এর অবস্থান এবং ১ জুলাই ২০২৬-এর ইনক্রিমেন্টসহ পরবর্তী বেতনধাপ আলাদা করে উপস্থাপন করা হয়েছে।

এ ধরনের ছকের মূল উদ্দেশ্য হলো একজন কর্মচারীকে বোঝানো—বর্তমান মূল বেতন থেকে নতুন পে স্কেলে গেলে তিনি কোন ধাপে যেতে পারেন এবং পরবর্তী ইনক্রিমেন্টের পর বেতন কোন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

তবে এটি ব্যবহার করে নিজের বেতন নির্ধারণের সময় ছকের অঙ্ক সরাসরি কপি না করে সংশ্লিষ্ট গ্রেড, বর্তমান বেতন, পুরোনো স্কেলের ধাপ এবং সরকারি প্রজ্ঞাপনের নির্ধারণী বিধান মিলিয়ে নিতে হবে।

২০ গ্রেডই বহাল রয়েছে

জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এ বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। সরকারি অনুমোদনের তথ্য অনুযায়ী ১ম গ্রেডের সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন প্রারম্ভিক বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থাৎ, নতুন স্কেলে গ্রেড সংখ্যা পরিবর্তন না হলেও প্রতিটি গ্রেডের বেতনক্রম এবং পুরোনো বেতন থেকে নতুন বেতনে যাওয়ার পদ্ধতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে।

পে ফিক্সেশনে কোন তথ্যগুলো হাতে রাখতে হবে

নিজের নতুন মূল বেতন যাচাই করার আগে একজন সরকারি কর্মচারীর নিচের তথ্যগুলো মিলিয়ে নেওয়া জরুরি—

  1. ৩০ জুন ২০২৬-এর মূল বেতন
  2. বর্তমান গ্রেড
  3. পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপ
  4. নতুন স্কেলের সংশ্লিষ্ট গ্রেডের প্রারম্ভিক ধাপ
  5. পুরোনো বেতন ও প্রারম্ভিক ধাপের পার্থক্য
  6. নতুন স্কেলে সমতুল্য বেতন
  7. সমতুল্য অঙ্কটি কোনো ধাপে না থাকলে পরবর্তী উচ্চতর ধাপ
  8. ১ জুলাই ২০২৬-এর ইনক্রিমেন্ট
  9. পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেড থাকলে তার প্রভাব
  10. ২০২৬ সালের নতুন স্কেলে নির্ধারিত কার্যকর বেতন

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সেবা-সংক্রান্ত তথ্যেও বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণের কপি, প্রশাসনিক আদেশ এবং যোগদানপত্রসহ প্রয়োজনীয় নথির কথা উল্লেখ রয়েছে।

উচ্চতর গ্রেডের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ

নতুন বেতন কাঠামোয় একই পদে দীর্ঘদিন কর্মরত স্থায়ী কর্মচারীদের জন্য উচ্চতর গ্রেডের বিধানও রয়েছে। প্রকাশিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পদোন্নতি ছাড়া একই পদে আট বছর পূর্ণ করলে এবং চাকরি সন্তোষজনক হলে নবম বছরে ওই পদের মূল স্কেলের পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেতন পাওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

তাই কোনো কর্মচারীর পে ফিক্সেশন করতে গিয়ে শুধু বর্তমান গ্রেড দেখলে হবে না; তার উচ্চতর গ্রেড, পদোন্নতি এবং চাকরির ধারাবাহিকতার তথ্যও প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

শেষ কথা

প্রদত্ত ফিক্সেশন ছকটি মূলত ৯ম পে স্কেলে বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়াকে সহজভাবে বোঝানোর একটি ম্যানুয়াল হিসাবচিত্র। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—নতুন বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ৩০ জুন ২০২৬-এর মূল বেতন → পুরোনো স্কেলের সংশ্লিষ্ট ধাপ → নতুন স্কেলের সমতুল্য ধাপ → পরবর্তী উচ্চতর ধাপ → ১ জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্ট—এই ধারাবাহিকতা বুঝতে হবে।

আর নতুন স্কেল ১ জুলাই থেকেই কার্যকর হলেও বর্ধিত বেতনের সম্পূর্ণ অংশ ধাপে ধাপে কার্যকর হওয়ার কারণে ‘নতুন স্কেলে নির্ধারিত বেতন’ এবং ‘বর্তমানে প্রাপ্য বেতন’ একই অঙ্ক নাও হতে পারে।

সুতরাং, নিজের বেতন কত হবে তা জানতে কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো কোনো চার্টের ওপর নির্ভর না করে জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এর প্রজ্ঞাপনের বিধান এবং অনুমোদিত iBAS++ পে-ফিক্সেশন হিসাব অনুসরণ করাই প্রয়োজন। নতুন স্কেলের গেজেট অনুযায়ী পুরোনো বেতন থেকে নতুন বেতন নির্ধারণের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে এবং ব্যক্তিভেদে পূর্ববর্তী বেতন ও চাকরির অবস্থার কারণে ফল ভিন্ন হতে পারে।

সোর্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *