৯ম পে স্কেল নিউজ

পে-স্কেলের পাশাপাশি ১২ থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য আসছে রেশন সুবিধা

দেশের ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ১২ থেকে ২০তম গ্রেডের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য রেশন সুবিধা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কর্মচারীদের আর্থিক চাপ কমাতে এবং দাপ্তরিক কাজে মনোযোগ ও দক্ষতা বাড়াতে এই নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে এই প্রস্তাবে সরকারের অর্থ বিভাগ ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সম্মতি প্রদান করেছে এবং বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস জানিয়েছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের অনেক সরকারি চাকরিজীবী চরম আর্থিক সংকটে ভুগছেন। অনেকেই ধার-দেনা ও ঋণের জালে জড়িয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে তাঁদের দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনে। রেশন সুবিধা চালু হলে এই মানসিক চাপ কমবে এবং কর্মীদের জীবনযাত্রা অনেক সহজ হবে বলে মনে করছে সরকার।

ডিসি সম্মেলন থেকে এল প্রস্তাব

১২ থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের জন্য রেশন সুবিধা চালুর এই প্রস্তাবটি প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করেন পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক। গত ৩ মে অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে তিনি এই প্রস্তাবটি তুলে ধরেন। প্রস্তাবে বলা হয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই ১২ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রেশন সুবিধার আওতায় আনার বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও কঠোর তদারকি

ডিসি সম্মেলনের এই প্রস্তাবের পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে এবং গত জুন মাসে অর্থ বিভাগের সচিবকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চিঠি পাঠায়।

চিঠির নির্দেশনা অনুযায়ী, এই প্রস্তাবটি স্বল্প, মধ্য নাকি দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়ন করা হবে—তা নির্ধারণ করতে কাজ শুরু করেছে অর্থ বিভাগ। এ ছাড়া বাস্তবায়নের সার্বিক অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে কঠোর তদারকি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে:

  • অর্থ বিভাগকে প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসন শাখায় লিখিতভাবে জমা দিতে হবে।

  • আগামী তিন মাস পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয়গুলোর সচিবদের নিয়ে একটি যৌথ পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে কাজের সার্বিক অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসন অধিশাখার উপ-সচিব মো. মামুন জানান, ডিসি সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের জন্য ইতিমধ্যে সব মন্ত্রণালয়ের সচিবদের করণীয় জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং নিয়মিত এর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

কোন পদের কর্মচারীরা পাবেন এই সুবিধা?

১২ থেকে ২০তম গ্রেডের আওতায় মূলত সরকারি চাকরির নিম্ন ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা রয়েছেন।

  • ১২তম গ্রেড: এই স্তরে রয়েছেন অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক, হিসাব সহকারী, সাঁট-মুদ্রাক্ষরিক, গুদামরক্ষক, নিরাপত্তা পরিদর্শক, অডিটর এবং ডাটা এন্ট্রি সুপারভাইজারের মতো পদসমূহ।

  • ২০তম গ্রেড: এটি সরকারি চাকরির সর্বনিম্ন স্তর, যা সাধারণত চতুর্থ শ্রেণি হিসেবে পরিচিত। এই পদে রয়েছেন অফিস সহায়ক (পিয়ন), নিরাপত্তা প্রহরী, মালি এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা।

বর্তমানে বাংলাদেশে সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, কারা অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা সুলভ মূল্যে রেশন সুবিধা পেয়ে থাকেন। নতুন এই উদ্যোগের ফলে সাধারণ প্রশাসনের একটা বিশাল অংশের কর্মচারীরা এই কল্যাণকর সুবিধার আওতায় আসবেন।

বিশেষজ্ঞদের ইতিবাচক মূল্যায়ন ও সতর্কতা

সরকারের এই উদ্যোগকে অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সরকারের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া। তিনি বলেন, “বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, তাতে এই রেশন সুবিধা সরকারি কর্মচারীদের জন্য বিশাল স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসবে। অনেকে সুযোগ-সুবিধার অভাবকে দুর্নীতির অজুহাত হিসেবে তুলে ধরেন, রেশন সুবিধা চালু হলে এই প্রবণতাও কমতে পারে।” তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “সরকারকে রেশন বিতরণ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত স্বচ্ছ ও সুসংগঠিতভাবে পরিচালনা করতে হবে। বিতরণ ব্যবস্থায় কোনো অনিয়ম যেন না হয় এবং প্রকৃত উপকারভোগীরা যেন এই সুবিধা পান, তা নিশ্চিত করা জরুরি।”

উল্লেখ্য, এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সরকারি কর্মচারীরা রেশনসহ বিভিন্ন ভাতার দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন। সে সময় খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম রেশন সুবিধা চালুর পক্ষে মত দিয়ে অর্থ বিভাগে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ পাঠিয়েছিলেন। এরপর থেকেই বিষয়টি সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনায় ছিল, যা এখন দ্রুত বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *