টিপস এন্ড ট্রিকস

উপজেলা-ইউনিয়নে ৭ তলা পর্যন্ত ভবনের নকশা অনুমোদনে কমিটি, মান নিশ্চিতেও কঠোর নির্দেশনা

উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতাভুক্ত এলাকার বাইরে উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের অধিক্ষেত্রে ভবন নির্মাণকে আরও সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও মানসম্মত করতে ইমারত বা স্থাপনার নকশা অনুমোদন এবং ভবনের গুণগতমান নিশ্চিতকরণের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দিয়েছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং-৪৬.০০.০০০০.০১৭.৯৯.০০৪.১৫-৫৪২, তারিখ ১০ জুলাই ২০১৭ (১৮ আষাঢ় ১৪২৪ বঙ্গাব্দ)-এ জারি করা এ নির্দেশনায় উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতাবহির্ভূত উপজেলা ও ইউনিয়ন এলাকায় ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন, নির্মাণ তদারকি এবং ব্যবহার সনদ প্রদানের বিস্তারিত প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে।

কেন এই নির্দেশনা

স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর দ্বিতীয় তফসিলের ২২ নম্বর ক্রমিক অনুযায়ী ইউনিয়নে নতুন বাড়ি বা দালান নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ এবং বিপজ্জনক ভবন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ইউনিয়ন পরিষদের ওপর ন্যস্ত। সেই দায়িত্ব কার্যকর করতে এই কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

যেভাবে গঠিত হবে কমিটি

নির্দেশনা অনুযায়ী উপজেলা পর্যায়ে গঠিত কমিটিতে থাকবেন—

  • উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান — সভাপতি
  • উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)
  • সহকারী কমিশনার (ভূমি)
  • উপজেলা প্রকৌশলী, এলজিইডি
  • সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান
  • ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের প্রতিনিধি
  • ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের প্রতিনিধি
  • ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস, বাংলাদেশের প্রতিনিধি
  • বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের প্রতিনিধি
  • ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের প্রতিনিধি
  • সহকারী প্রকৌশলী/উপসহকারী প্রকৌশলী (সদস্য সচিব)

কোন ভবনের নকশা অনুমোদন করবে

কমিটি সাত তলা বা সর্বোচ্চ ৭৫ ফুট উচ্চতা পর্যন্ত সুউচ্চ নয় এমন ভবনের নকশা অনুমোদন দিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে Building Construction Act, 1952, Bangladesh National Building Code (BNBC) এবং অন্যান্য প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুসরণ বাধ্যতামূলক।

প্রতি তিন মাসে অন্তত একটি সভা

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কমিটিকে প্রতি তিন মাসে অন্তত একটি সভা করতে হবে। সভার কোরাম গঠনের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের উপস্থিতির পাশাপাশি কারিগরি সদস্যদের (প্রকৌশলী, স্থপতি, পরিকল্পনাবিদসহ) অন্তত দুইজনের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক।

নকশা অনুমোদনের জন্য যা জমা দিতে হবে

আবেদনকারীকে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ১৯৯৬-এর নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হবে। আবেদনপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে—

  • BNBC অনুযায়ী কী প্ল্যান (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে), সাইট প্ল্যান, বিল্ডিং প্ল্যান, সার্ভিস প্ল্যান ও স্পেসিফিকেশন।
  • সাত ফর্দ নকশা।
  • জমির দলিল, পর্চা ও ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের প্রমাণ।
  • যোগ্য প্রকৌশলীর দেওয়া মাটির ভার বহন ক্ষমতার (Soil Test) সনদ।
  • প্রয়োজন হলে ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র।
  • নির্মাণ তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীর সম্মতিপত্র।

যোগ্য প্রকৌশলী ছাড়া নকশা গ্রহণ নয়

নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, নকশা অবশ্যই যোগ্য স্থপতি বা প্রকৌশলী দ্বারা প্রস্তুত হতে হবে। প্রতিটি নকশায় প্রণেতার স্বাক্ষর, পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন নম্বর, যোগাযোগের ঠিকানা এবং ভবনের মালিকের স্বাক্ষর থাকতে হবে। এসব তথ্য যাচাই করেই কমিটি অনুমোদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

সরকারি কর্মকর্তা নকশা প্রণয়নে যুক্ত হতে পারবেন না

নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা ইউনিয়ন পরিষদের কোনো কর্মকর্তা কোনো অবস্থাতেই নকশা প্রণয়নের কাজে যুক্ত থাকতে পারবেন না বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

নির্মাণকাজে থাকবে একাধিক ধাপে তদারকি

ভবন নির্মাণের সময় একাধিক ধাপে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • লে-আউট দেওয়ার সময় সুপারভিশন ইঞ্জিনিয়ারের উপস্থিতি নিশ্চিত করা।
  • স্লিন্থ লেভেল পর্যন্ত কাজ শেষে যৌথ প্রতিবেদন জমা।
  • প্রতিটি ফ্লোরের ছাদ ঢালাইয়ের পর পৃথক অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল।
  • কমিটির সরেজমিন পরিদর্শন।
  • অনুমোদিত নকশা থেকে বিচ্যুতি হলে লিখিত নির্দেশনা।
  • নির্দেশনা না মানলে অবৈধ অংশ অপসারণ বা অনুমতিপত্র বাতিলসহ আইনগত ব্যবস্থা।

ভবন নির্মাণে মান নিয়ন্ত্রণ বাধ্যতামূলক

নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে—

  • নির্মাণকালে পার্শ্ববর্তী ভবন ও জনসাধারণের ক্ষতি করা যাবে না।
  • পানি, ড্রেনেজ, পয়ঃনিষ্কাশন, বিদ্যুৎ, গ্যাস, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণসহ সব ধরনের বিল্ডিং সার্ভিস BNBC অনুযায়ী বাস্তবায়ন করতে হবে।
  • প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন করে মতামত নেওয়া যাবে।
  • স্থাপত্য, স্ট্রাকচারাল, ইলেকট্রিক্যাল, প্লাম্বিং ও ফায়ার ফাইটিং নকশা বিশেষজ্ঞ দ্বারা প্রস্তুত করতে হবে।

ভবন ব্যবহার করতে লাগবে ব্যবহার সনদ

নির্মাণ শেষ হওয়ার পর ভবনে বসবাস বা ব্যবহার শুরুর আগে ব্যবহার সনদ (Occupancy Certificate) গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এ জন্য আবেদনপত্রের সঙ্গে জমা দিতে হবে—

  • সুপারভিশন ইঞ্জিনিয়ারের সমাপ্তি প্রতিবেদন।
  • অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্মিত ভবনের চূড়ান্ত নকশা।
  • ভবনের সব সার্ভিস নকশা।
  • সিলিন্ডার টেস্ট রিপোর্ট, এমএস রড টেস্ট রিপোর্টসহ প্রয়োজনীয় নির্মাণ পরীক্ষার প্রতিবেদন।

সবকিছু যাচাই ও সরেজমিন পরিদর্শনের পর কমিটি ভবন ব্যবহারের অনুমতিপত্র প্রদান করবে।

অনুমোদিত উদ্দেশ্যের বাইরে ব্যবহার করা যাবে না

নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, যে উদ্দেশ্যে ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হবে, সেই উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোনো কাজে ভবন ব্যবহার করা যাবে না।

গুরুত্বপূর্ণ দিক এক নজরে

  • উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বাইরে উপজেলা ও ইউনিয়ন এলাকায় এ নির্দেশনা কার্যকর।
  • সর্বোচ্চ ৭ তলা বা ৭৫ ফুট পর্যন্ত ভবনের নকশা অনুমোদন করবে উপজেলা কমিটি।
  • যোগ্য স্থপতি ও প্রকৌশলীর নকশা ছাড়া আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না।
  • নির্মাণের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে প্রকৌশলীর তদারকি ও প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক।
  • নির্মাণ শেষে ব্যবহার সনদ ছাড়া ভবন ব্যবহার করা যাবে না।
  • অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করলে অনুমতিপত্র বাতিল, অবৈধ অংশ অপসারণসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সোর্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *