৯ম পে স্কেল নিউজ

দুই সপ্তাহেও পে-স্কেলের গেজেট নয়: খসড়া আসলে কোথায়, কেন দেরি—কতদিন লাগতে পারে?

সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে নবম জাতীয় পে-স্কেল। অনুমোদনের পর দ্রুত প্রজ্ঞাপন বা গেজেট প্রকাশের প্রত্যাশা তৈরি হলেও দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও তা প্রকাশ হয়নি। এতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে কোথায় আটকে আছে প্রজ্ঞাপনের খসড়া—এ নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য সামনে আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কিছু গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর খসড়াটি আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বিবিসি বাংলা যে তথ্য পেয়েছে, তাতে খসড়াটি এখনো আইন মন্ত্রণালয়ে যায়নি; অর্থ মন্ত্রণালয়েই রয়েছে।

মন্ত্রিসভা অনুমোদনের পরও গেজেট কেন হয়নি?

মন্ত্রিসভায় কোনো সিদ্ধান্ত অনুমোদন পাওয়ার অর্থ এই নয় যে, সেটি সঙ্গে সঙ্গেই গেজেট আকারে প্রকাশ করা যাবে। অনুমোদিত সিদ্ধান্তকে কার্যকর করতে প্রশাসনিক ও আইনগত বেশ কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়ায় কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাসও লেগে যেতে পারে। তবে দীর্ঘদিন পর পে-স্কেলের ঘোষণা আসায় এবার স্বাভাবিকভাবেই দ্রুত গেজেট প্রকাশের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল।

বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল প্রশ্ন হচ্ছে—মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত পে-স্কেলের খসড়া কেন এখনো অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়নি?

গত দুই সপ্তাহ ধরে অর্থ মন্ত্রণালয়ে কী হচ্ছে?

প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে একদিকে দাবি করা হয়েছে, খসড়া ইতোমধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ে রয়েছে। অন্যদিকে, সর্বশেষ পাওয়া তথ্য বলছে, খসড়াটি এখনো অর্থ মন্ত্রণালয়ের পর্যায়েই রয়েছে।

এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর শুধু আগের খসড়াটি গেজেট আকারে ছাপানোর বিষয় নয়। অনুমোদিত সিদ্ধান্তের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনের ভাষা, বেতন-ভাতা সংক্রান্ত বিধান, বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নির্দেশনা ঠিকঠাক আছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হয়।

অর্থাৎ, মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পাওয়ার পরও কোনো অস্পষ্টতা, অসামঞ্জস্য কিংবা বাস্তবায়নসংক্রান্ত প্রশ্ন থাকলে অর্থ মন্ত্রণালয়কে সেগুলো নিষ্পত্তি করে তবেই আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠাতে হবে।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বেতন ও কিছু ভাতা কীভাবে নতুন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করা হবে, তা নিয়েও আলোচনার কথা এসেছে।

আরেকটি বড় বিষয়—বেতন ফিক্সেশন

পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের পাশাপাশি নতুন বেতন কাঠামো কীভাবে বাস্তবে প্রয়োগ করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন পে-স্কেলে মূল বেতন একাধিক ধাপে বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে iBAS++-এ বেতন ফিক্সেশন কীভাবে করা হবে, তা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। ধাপে ধাপে বেতন সমন্বয় করতে হলে সফটওয়্যারে হিসাবের পদ্ধতি কী হবে—এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে আলোচনা চলছে বলে খবর এসেছে।

অর্থাৎ, গেজেট প্রকাশের আগে একদিকে আইনি ভাষা চূড়ান্ত করা, অন্যদিকে বাস্তবায়ন কাঠামো পরিষ্কার করার প্রয়োজন রয়েছে।

গেজেট প্রকাশের আগে কী কী ধাপ বাকি?

বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় মোটামুটি প্রক্রিয়াটি এভাবে দেখা যায়—

মন্ত্রিসভার অনুমোদন → অর্থ মন্ত্রণালয়ে চূড়ান্ত যাচাই ও খসড়া প্রস্তুতি → আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং → সংশোধন থাকলে তা সম্পন্ন → এসআরও নম্বর/প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা → বিজি প্রেস → বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশ।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভেটিং শেষ হওয়ার পর এসআরও নম্বর দিয়ে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এ ছাড়া নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে বিভিন্ন শ্রেণি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক এসআরও জারির বিষয়টিও সামনে এসেছে। এতে গেজেট প্রকাশের পরও বাস্তবায়নের প্রশাসনিক কাজ চলবে।

তাহলে আর কতদিন লাগতে পারে?

এ মুহূর্তে নির্দিষ্ট তারিখ নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কারণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খসড়াটি এখনো আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং পর্যায়ে পৌঁছেছে কি না—এ নিয়েই তথ্যের পার্থক্য রয়েছে।

তবে প্রক্রিয়াটি যদি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ পর্যায় থেকে দ্রুত শেষ করে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় এবং ভেটিংয়ে বড় ধরনের সংশোধন প্রয়োজন না হয়, তাহলে এরপর তুলনামূলক দ্রুত গেজেট প্রকাশের সুযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে, ভেটিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন প্রয়োজন হলে, কিংবা বেতন ফিক্সেশন, ভাতা বা বিভিন্ন ক্যাডার/প্রতিষ্ঠানের বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হলে সময় আরও বাড়তে পারে।

তাই ‘কয়েক দিনের মধ্যেই গেজেট’ অথবা ‘আরও কয়েক সপ্তাহ লাগবে’—এ দুটির কোনোটি এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদারের বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের প্রক্রিয়ায় কয়েক সপ্তাহ থেকে কখনো মাসও লাগতে পারে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—খসড়া কখন আইন মন্ত্রণালয়ে যাবে?

৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর ইতোমধ্যে প্রায় দুই সপ্তাহ পার হয়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল প্রত্যাশা এখন আর পে-স্কেল অনুমোদিত হবে কি না—তা নয়; বরং অনুমোদিত পে-স্কেলের গেজেট ঠিক কবে প্রকাশ হবে, সেটিই।

সর্বশেষ তথ্যের আলোকে বলা যায়, পে-স্কেলের মূল নীতিগত অনুমোদন হয়ে গেছে। বিলম্বের কেন্দ্র এখন প্রজ্ঞাপনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি, আইনগত যাচাই এবং বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিষ্পত্তি। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া দৃশ্যমানভাবে শেষ ধাপে ঢুকবে।

ফলে আগামী কয়েক দিনে অর্থ মন্ত্রণালয় খসড়াটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে পারে কি না, সেটিই এখন নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সারকথা: মন্ত্রিসভার অনুমোদন পাওয়ার পর পে-স্কেল বাতিল বা পুনরায় অনুমোদনের পর্যায়ে নেই; বরং গেজেট প্রকাশের প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়াতেই সময় যাচ্ছে। তবে বর্তমানে খসড়াটি ঠিক কোন মন্ত্রণালয়ে রয়েছে—এ বিষয়ে গণমাধ্যমে পরস্পরবিরোধী তথ্য থাকায় সরকারি পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক অবস্থান পরিষ্কার হওয়া জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *