মসজিদ ব্যবস্থাপনায় নতুন যুগের সূচনা: ‘মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৫’ প্রজ্ঞাপন জারি
দেশের মসজিদসমূহের ব্যবস্থাপনা আরও সুষ্ঠু, সুশৃঙ্খল এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ করার লক্ষ্যে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ‘মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৫’ চূড়ান্ত করেছে। গত ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই নীতিমালা জারি করা হয়, যা সরকারি মসজিদ ব্যতীত দেশের অন্য সকল মসজিদের ক্ষেত্রে অবিলম্বে কার্যকর হবে ।
নতুন এই নীতিমালার আলোকে একটি বিশেষ প্রতিবেদন:
ব্যবস্থাপনা কমিটির কাঠামো ও মেয়াদ নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি মসজিদ পরিচালনার জন্য ১৫ সদস্যের একটি ‘মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটি’ থাকবে । এই কমিটির সাধারণ মেয়াদ হবে ৩ বছর । কমিটির প্রধান পদগুলোর মধ্যে থাকবে একজন সভাপতি, দুইজন সহ-সভাপতি, একজন সাধারণ সম্পাদক, এবং একজন অর্থ সম্পাদক । বিশেষ উল্লেখ্য যে, মসজিদের প্রধান ইমাম পদাধিকারবলে এই কমিটির একজন নির্বাহী সদস্য হবেন । তবে, তার নিজের পদ বা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে আলোচনা চললে তিনি ওই সভায় উপস্থিত থাকতে পারবেন না ।
স্বচ্ছ নির্বাচন ও ভোটার তালিকা মসজিদ কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ‘মুসল্লি তালিকা’ প্রস্তুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত নামাজ আদায়কারী এবং মসজিদে দান করেন এমন স্থায়ী ও অস্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে এই ভোটার তালিকা তৈরি হবে । কমিটি গঠনের জন্য তিন সদস্যের একটি নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে এবং প্রয়োজনে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান রাখা হয়েছে ।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা মসজিদের ইমাম, খতিব, মুয়াজ্জিন ও খাদেম নিয়োগের জন্য সাত সদস্যের একটি ‘বাছাই কমিটি’ গঠনের বিধান করা হয়েছে । সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে অন্তত ১৫ দিন সময় দিয়ে জাতীয় বা স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে । নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার পাশাপাশি খতিব ও ইমামদের জন্য তিলাওয়াত, খুতবা ও ইমামতির ওপর ব্যবহারিক পরীক্ষা নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে ।
সামাজিক সেবায় মসজিদের ভূমিকা নতুন নীতিমালায় মসজিদকে কেবল ইবাদতখানা নয়, বরং সামাজিক উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কমিটির সভাপতিকে মসজিদে জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, প্রতিবন্ধী, বেকার যুবক, বিধবা ও এতিমদের তথ্য সম্বলিত রেজিস্টার খোলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে । এর মাধ্যমে জাকাত ও অন্যান্য সহায়তার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন ও মানবসেবামূলক কাজ করা হবে । এছাড়া, সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য মসজিদে পাঠাগার স্থাপন এবং শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে ।
অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত বিধিবিধান মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে অবশ্যই শরিয়াহসম্মত স্থান এবং নিজস্ব জমি থাকতে হবে; অন্যথায় মসজিদ উচ্ছেদ করার আইনি সুযোগ রাখা হয়েছে । মসজিদের উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে আয়বর্ধক প্রকল্প যেমন—মার্কেট নির্মাণ, মৎস্য চাষ বা কৃষি খামার স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে । এছাড়া, নারী মুসল্লিদের জন্য পৃথক কক্ষ বা নামাজের স্থানের ব্যবস্থা রাখার বিধানও নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ।
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের মুসলিম জনজীবনে মসজিদের গুরুত্ব অপরিসীম। এই নীতিমালা কার্যকর হওয়ার ফলে দেশের মসজিদগুলোর ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এবং মসজিদগুলো সমাজ সংস্কারে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে ।

মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৫
ইমামের বেতন কি সরকার নির্ধারণ করে দিল?
‘মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৫’ অনুযায়ী সরকার সরাসরি ইমামদের কোনো নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো নির্ধারণ করে দেয়নি। তবে এই নীতিমালায় ইমামদের বেতন ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে:
-
বেতন নির্ধারণের দায়িত্ব: মসজিদের খতিব, পেশ ইমাম, ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং খাদেমদের বেতন, ভাতা ও সম্মানী প্রদানের মূল দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটির।
-
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বেতন: মসজিদের কোনো পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে পত্রিকায় যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে, সেখানেই ওই পদের বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার কথা উল্লেখ থাকতে হবে।
-
নিয়োগপত্র ও শর্ত: নিয়োগের সময় মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটি যে নিয়োগপত্র প্রদান করবে, সেখানে বেতন, ভাতা এবং অন্যান্য দায়িত্ব ও শর্তাবলি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।
-
ব্যয়ের উৎস: মসজিদের ইমামসহ অন্যান্য জনবলের বেতন ও মসজিদের যাবতীয় পরিচালন ব্যয় মুসল্লিদের স্বেচ্ছায় দেওয়া দান, অনুদান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহায়তা বা মসজিদের নিজস্ব আয় থেকে মেটানো হবে।
সারসংক্ষেপে, সরকারি মসজিদ ব্যতীত অন্যান্য মসজিদের ক্ষেত্রে বেতন কত হবে তা সংশ্লিষ্ট মসজিদের আয়তন ও সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের নিজস্ব পরিচালনা কমিটিই নির্ধারণ করবে।
যে কোন ব্যক্তি কি মসজিদ কমিটির সদস্য হতে পারবে?
‘মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৫’ অনুযায়ী যেকোনো ব্যক্তিই মসজিদ কমিটির সদস্য হতে পারবেন না। কমিটির সদস্য হওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু যোগ্যতা ও শর্ত পালন করতে হবে।
নীতিমালা অনুযায়ী সদস্য হওয়ার প্রধান শর্তগুলো নিচে দেওয়া হলো:
-
নিয়মিত মুসল্লি হওয়া: কমিটির সদস্য হতে হলে সংশ্লিষ্ট মসজিদের নিয়মিত মুসল্লি হতে হবে।
-
স্থানীয় বাসিন্দা: ওই মসজিদের ক্যাচমেন্ট এরিয়া বা সংলগ্ন এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। তবে শর্ত সাপেক্ষে ওই এলাকায় বসবাসরত অস্থায়ী বাসিন্দারাও (যেমন: সরকারি/বেসরকারি চাকুরীজীবী বা ব্যবসায়ী) সদস্য হতে পারবেন।
-
ভোটার তালিকায় নাম: মসজিদের জন্য প্রস্তুতকৃত ‘মুসল্লি তালিকা’ বা ভোটার তালিকায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম থাকতে হবে।
-
আর্থিক অবদান: মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ বা উন্নয়নে সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত আর্থিক দান বা চাঁদা প্রদান করতে হবে।
-
ব্যক্তিগত চারিত্র্য: প্রার্থীকে অবশ্যই নীতিবান, সৎ এবং ইসলামী মূল্যবোধের অনুসারী হতে হবে।
কারা সদস্য হতে পারবেন না:
-
যিনি নিয়মিত জামায়াতে নামাজ আদায় করেন না।
-
যিনি মসজিদের স্বার্থবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত।
-
যিনি ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত বা সামাজিকভাবে বিতর্কিত।
উল্লেখ্য যে, মসজিদের খতিব বা ইমাম পদাধিকারবলে কমিটির নির্বাহী সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন, তবে মসজিদের সাধারণ সম্পাদক বা সভাপতির মতো প্রশাসনিক পদগুলোতে সাধারণত স্থানীয় মুসল্লিদের মধ্য থেকেই নির্বাচন বা সিলেকশনের মাধ্যমে সদস্য মনোনীত করা হয়।

