নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশে প্রস্তুতি জোরদার, ভেটিং শেষে জারি হবে প্রজ্ঞাপন
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল-২০২৬ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়েছে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর এখন গেজেট প্রকাশের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে নেওয়া হচ্ছে। খসড়া প্রজ্ঞাপন পর্যালোচনা, প্রয়োজনীয় সংশোধন ও হালনাগাদের কাজ চলছে। এরপর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং সম্পন্ন করে আনুষ্ঠানিকভাবে গেজেট প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রজ্ঞাপনটি আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং পর্যায়ে যাওয়ার তথ্যও এসেছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের কাছে গেজেটটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণ হলো—মন্ত্রিসভায় পে-স্কেলের মূল কাঠামো অনুমোদিত হলেও চূড়ান্ত বাস্তবায়নের নিয়ম, বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন এবং সংশ্লিষ্ট শ্রেণি-পেশার জন্য প্রয়োগবিধি প্রজ্ঞাপন ও পরবর্তী এসআরওতে স্পষ্ট হবে। ফলে গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত নতুন বেতন কাঠামোর বাস্তব প্রয়োগ পুরোপুরি শুরু করা সম্ভব নয়।
ভেটিং শেষে গেজেট, এরপর এসআরও
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মূল পে-স্কেলের জন্য একটি এসআরও’র পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পৃথক এসআরও জারির প্রস্তুতিও চলছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসআরওর সংখ্যা নিয়ে কিছু পার্থক্য দেখা যাচ্ছে—কোথাও ছয়টি, আবার কোথাও মূল প্রজ্ঞাপনসহ মোট সাতটি পৃথক এসআরওর কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ, শুধু একটি গেজেট প্রকাশ করেই পুরো পে-স্কেল বাস্তবায়ন শেষ হবে না। সংশ্লিষ্ট বাহিনী, বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে পৃথক বাস্তবায়ন নির্দেশনা প্রয়োজন হবে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় বেসামরিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পুলিশ, বিজিবি, স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, সশস্ত্র বাহিনী এবং বিচার বিভাগের জন্য পৃথক প্রয়োগবিধির প্রয়োজন হতে পারে।
২০টি গ্রেডই থাকছে
মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত নতুন জাতীয় বেতন স্কেলে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করার কথা জানানো হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হিসেবে গণ্য হবে।
তবে নতুন কাঠামোর বর্ধিত বেতন একবারে পুরোপুরি কার্যকর না করে ধাপে ধাপে সমন্বয়ের বিষয়টি সামনে এসেছে। ফলে গেজেটে শুধু নতুন মূল বেতন নয়, কোন অংশ কখন কার্যকর হবে এবং কীভাবে বেতন পুনর্নির্ধারণ করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আইবাস++-এ বড় ধরনের পরিবর্তন
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে সরকারি হিসাব ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যার আইবাস++। নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার কাজ চলছে।
এর মাধ্যমে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিসংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে নতুন বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়াকে আরও স্বয়ংক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্মচারীদের পদ, গ্রেড, চাকরিতে যোগদানের তারিখ, ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি ও উচ্চতর গ্রেডের মতো তথ্য হালনাগাদের প্রয়োজন হতে পারে।
এর ফলে নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে প্রত্যেক কর্মচারীর বেতন পুনর্নির্ধারণে আগের তুলনায় কম ম্যানুয়াল কাজের প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে ভুল বেতন নির্ধারণ বা অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের ঝুঁকিও কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে পেনশনভোগীদের তথ্য
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তুতিতে শুধু কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তথ্য নয়, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন-সংক্রান্ত তথ্যও হালনাগাদ করা হচ্ছে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পেনশন পুনর্নির্ধারণ করতে হলে অবসরপ্রাপ্তদের বিদ্যমান তথ্য সঠিক ও হালনাগাদ থাকা প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে পেনশনভোগীদের তথ্য হালনাগাদের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর অর্থ হলো, নতুন পে-স্কেলের প্রভাব শুধু বর্তমান সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন সুবিধার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়বে।
গেজেট প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে চূড়ান্ত হিসাব
নতুন পে-স্কেল নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় আগ্রহ এখন গেজেটের চূড়ান্ত ভাষা নিয়ে। কারণ বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত খসড়া, প্রস্তাব ও সংবাদভিত্তিক তথ্যের সঙ্গে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনের কিছু পার্থক্য থাকতে পারে।
বিশেষ করে—
- নতুন মূল বেতন কীভাবে নির্ধারিত হবে;
- পদোন্নতির পর বেতন কীভাবে ফিক্সেশন হবে;
- বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট কীভাবে গণনা হবে;
- উচ্চতর গ্রেডের ক্ষেত্রে নিয়ম কী হবে;
- বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা কখন কার্যকর হবে;
- বকেয়া বা আর্থিক সুবিধা কীভাবে সমন্বয় করা হবে;
- অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন কীভাবে পুনর্নির্ধারণ হবে—
এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর গেজেট ও সংশ্লিষ্ট এসআরওতে পাওয়া যাবে।
কেন এত গুরুত্ব পাচ্ছে আইবাস++?
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে শুধু অর্থ বরাদ্দ করাই যথেষ্ট নয়। লাখ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য নতুন বেতন নির্ধারণ, বেতন বিল প্রস্তুত, পেনশন পুনর্নির্ধারণ এবং সরকারি অর্থ পরিশোধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে আইবাস++।
তাই গেজেট প্রকাশের পাশাপাশি সফটওয়্যার প্রস্তুত না থাকলে মাঠপর্যায়ে বেতন বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হতে পারে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে পে-ফিক্সেশন ও আইবাস++-সংক্রান্ত কারিগরি প্রস্তুতিকে গেজেট বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
গেজেট নিয়ে অপেক্ষায় লাখো চাকরিজীবী
মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর সরকারি চাকরিজীবীদের প্রত্যাশা ছিল দ্রুত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ হবে। কিন্তু খসড়া পর্যালোচনা, আইনগত ভেটিং, বিভিন্ন শ্রেণির জন্য পৃথক বাস্তবায়ন নির্দেশনা এবং আইবাস++ প্রস্তুতির মতো কাজের কারণে প্রক্রিয়াটি সময় নিচ্ছে। সাম্প্রতিক সংবাদেও গেজেট প্রকাশের সময় নিয়ে একাধিক সম্ভাব্য তারিখের আলোচনা এবং প্রস্তুতিমূলক কাজ চলার কথা উঠে এসেছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গেজেট প্রকাশের আগে কোনো নির্দিষ্ট তারিখকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং এবং প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পরই সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজ্ঞাপন জারি করতে পারবে।
শেষ কথা
সব মিলিয়ে নতুন পে-স্কেলের বাস্তবায়ন এখন আর শুধু বেতন বাড়ানোর ঘোষণার পর্যায়ে নেই; এটি ধীরে ধীরে গেজেট, পৃথক এসআরও, আইবাস++-এ বেতন পুনর্নির্ধারণ এবং পেনশন তথ্য হালনাগাদের সমন্বিত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পরবর্তী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে আইনগত ভেটিং শেষ করে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ।
তাই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এখন মূল অপেক্ষা—কবে গেজেট প্রকাশ হবে এবং গেজেটে নতুন বেতন কাঠামোর চূড়ান্ত বাস্তবায়ন নির্দেশনা কীভাবে নির্ধারণ করা হবে।

