নতুন আয়কর হার ২০২৬: করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার, ন্যূনতম কর ৫ হাজার টাকা
২০২৬-২৭ করবর্ষে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য আয়কর ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন কার্যকর হয়েছে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী সাধারণ করদাতার করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। তবে এই সীমা অতিক্রম করলে নিয়মিত হিসাবের কর ৫ হাজার টাকার কম হলেও নির্ধারিত ন্যূনতম কর দিতে হবে। সাধারণ করদাতার ক্ষেত্রে সেই ন্যূনতম আয়কর ৫ হাজার টাকা। নতুন করদাতাদের জন্য ন্যূনতম কর রাখা হয়েছে ১ হাজার টাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ২০২৬-২৭ সালের আয়কর পরিপত্রেও বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।
২০২৬-২৭ করবর্ষে করমুক্ত আয়সীমা কত?
নতুন আয়কর কাঠামোয় সাধারণ ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার বার্ষিক ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত। অর্থাৎ এই সীমার মধ্যে আয় থাকলে সাধারণ আয়কর দিতে হবে না।
তবে করমুক্ত সীমা অতিক্রম করলেই করের হিসাব শুরু হবে। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষে এই করমুক্ত আয়সীমা কার্যকর থাকবে।
এর আগে সাধারণ করদাতার করমুক্ত আয়সীমা ছিল ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। নতুন ব্যবস্থায় তা ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে।
নতুন আয়কর হার ২০২৬-২৭
নতুন কাঠামো অনুযায়ী সাধারণ ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার করহার হলো—
| মোট বার্ষিক আয় | প্রযোজ্য করহার |
|---|---|
| প্রথম ৩,৭৫,০০০ টাকা | ০% |
| পরবর্তী ৩,০০,০০০ টাকা | ১০% |
| পরবর্তী ৪,০০,০০০ টাকা | ১৫% |
| পরবর্তী ৫,০০,০০০ টাকা | ২০% |
| পরবর্তী ২০,০০,০০০ টাকা | ২৫% |
| অবশিষ্ট আয় | ৩০% |
অর্থাৎ করমুক্ত সীমার পর প্রথম ৩ লাখ টাকা আয়ের ওপর ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। এরপরের ৪ লাখ টাকায় ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখ টাকায় ২০ শতাংশ এবং পরবর্তী ২০ লাখ টাকায় ২৫ শতাংশ হারে কর প্রযোজ্য হবে। অবশিষ্ট আয়ের ওপর করহার ৩০ শতাংশ।
৫ শতাংশ করের ধাপ আর নেই
নতুন কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো—আগের ৫ শতাংশের প্রথম করধাপ বিলুপ্ত করা হয়েছে। ফলে করমুক্ত আয়সীমার পর প্রথম করযোগ্য ধাপেই ১০ শতাংশ কর আরোপ হচ্ছে।
এর ফলে করমুক্ত সীমা বাড়লেও সীমার সামান্য ওপরে আয় করা কিছু করদাতার করের বোঝা আগের তুলনায় বাড়তে পারে। অর্থাৎ শুধু করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়েছে—এমনভাবে নতুন কাঠামোকে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না।
ন্যূনতম আয়কর কত টাকা?
২০২৬-২৭ করবর্ষ থেকে ন্যূনতম করের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে।
আগে করমুক্ত সীমা অতিক্রম করলে করদাতার অবস্থানভেদে ন্যূনতম কর ছিল ৩ হাজার, ৪ হাজার বা ৫ হাজার টাকা। নতুন ব্যবস্থায় সেই এলাকাভিত্তিক পার্থক্য তুলে দিয়ে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষে ফ্ল্যাট ৫ হাজার টাকা ন্যূনতম কর নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ একজন সাধারণ করদাতার আয় করমুক্ত সীমা অতিক্রম করলে তার হিসাব করা আয়কর ৫ হাজার টাকার কম হলেও ন্যূনতম করের কারণে ৫ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হতে পারে।
তবে নতুন করদাতাদের জন্য আলাদা নিয়ম
যারা প্রথমবার করদাতা হিসেবে আয়কর ব্যবস্থায় আসছেন, তাদের জন্য ন্যূনতম কর ১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কর প্রদান সংস্কৃতি বাড়ানো এবং নতুন করদাতাদের উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে এই সুবিধা রাখা হয়েছে।
উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক
ধরা যাক, একজন সাধারণ করদাতার বার্ষিক আয় ৪ লাখ টাকা।
তার করমুক্ত আয়:
৩,৭৫,০০০ টাকা
করযোগ্য অংশ:
৪,০০,০০০ – ৩,৭৫,০০০ = ২৫,০০০ টাকা
প্রথম করধাপের হার ১০ শতাংশ হওয়ায় হিসাবি কর দাঁড়াবে:
২৫,০০০ × ১০% = ২,৫০০ টাকা
কিন্তু সাধারণ করদাতার জন্য ন্যূনতম কর ৫ হাজার টাকা। ফলে প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী তাকে ২,৫০০ টাকার পরিবর্তে ৫,০০০ টাকা ন্যূনতম আয়কর দিতে হবে। এনবিআরের পরিপত্রে বলা হয়েছে, করমুক্ত সীমার ওপরে আয় থাকা করদাতার হিসাবি কর বা বিনিয়োগজনিত রেয়াতের পর কর ৫ হাজার টাকার কম, শূন্য বা ঋণাত্মক হলেও ন্যূনতম কর প্রযোজ্য হবে।
৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকা আয় হলে কর কত?
আরেকটি উদাহরণ নেওয়া যাক।
বার্ষিক আয় ৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকা হলে—
করমুক্ত আয় = ৩,৭৫,০০০ টাকা
করযোগ্য আয় = ৩,০০,০০০ টাকা
প্রথম করধাপের হার ১০ শতাংশ।
তাই কর:
৩,০০,০০০ × ১০% = ৩০,০০০ টাকা
এ ক্ষেত্রে হিসাবি কর ৫ হাজার টাকার বেশি হওয়ায় ন্যূনতম করের বিধান আলাদা করে প্রভাব ফেলবে না। অর্থাৎ অন্যান্য প্রযোজ্য রেয়াত, উৎসে কর বা সমন্বয় বিবেচনার আগে করের পরিমাণ হবে ৩০ হাজার টাকা।
১০ লাখ টাকা আয় হলে
বার্ষিক আয় ১০ লাখ টাকা হলে হিসাব হবে—
প্রথম ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা = করমুক্ত
পরবর্তী ৩ লাখ টাকা × ১০% = ৩০,০০০ টাকা
পরবর্তী ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা × ১৫% = ৩৩,৭৫০ টাকা
অতএব মোট হিসাবি কর:
৩০,০০০ + ৩৩,৭৫০ = ৬৩,৭৫০ টাকা
এটি একটি সরল হিসাব। বাস্তবে বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত, উৎসে কর্তিত করসহ প্রযোজ্য অন্যান্য বিধান বিবেচনা করে চূড়ান্ত কর নির্ধারণ করতে হবে।
নারী ও প্রবীণ করদাতার করমুক্ত আয়সীমা বেশি
নতুন কাঠামোয় সব করদাতার করমুক্ত আয়সীমা এক নয়।
নারী করদাতা এবং ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী করদাতার করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা।
গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও গেজেটভুক্ত আহত জুলাই যোদ্ধার করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
এ ছাড়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পিতা-মাতা বা আইনানুগ অভিভাবকের করমুক্ত আয়সীমা প্রত্যেক প্রতিবন্ধী সন্তান বা পোষ্যের জন্য অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা বাড়বে।
কেন ন্যূনতম কর গুরুত্বপূর্ণ?
ন্যূনতম করের নিয়মটি বিশেষ করে সেইসব করদাতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যাদের আয় করমুক্ত সীমার সামান্য ওপরে।
উদাহরণ হিসেবে, কারও আয় যদি ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা হয়, তাহলে করমুক্ত সীমার অতিরিক্ত আয় মাত্র ৫ হাজার টাকা। ১০ শতাংশ হিসাবে হিসাবি কর মাত্র ৫০০ টাকা। কিন্তু সাধারণ করদাতার ক্ষেত্রে ন্যূনতম কর ৫ হাজার টাকা হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ন্যূনতম করের বিধানই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
অর্থাৎ—
করযোগ্য আয় সামান্য হলেই করের দায় সামান্য হবে—এমনটি সব ক্ষেত্রে নয়।
ন্যূনতম করের বিধান থাকায় করমুক্ত সীমা অতিক্রম করার পর একটি নির্দিষ্ট ন্যূনতম অর্থ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়।
নতুন আয়কর কাঠামোয় কার ওপর বেশি প্রভাব পড়তে পারে?
নতুন ব্যবস্থার দুটি পরিবর্তন পাশাপাশি দেখতে হবে।
প্রথমত, সাধারণ করদাতার করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, করমুক্ত সীমার পরের প্রথম ধাপের ৫ শতাংশ করহার বাদ দিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে।
ফলে যাদের আয় করমুক্ত সীমার কাছাকাছি, তাদের ক্ষেত্রে বাড়তি করমুক্ত সীমা কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু সীমা অতিক্রম করার পর প্রথম করযোগ্য অংশে ১০ শতাংশ হার এবং ন্যূনতম ৫ হাজার টাকার বিধান কার্যকর হওয়ায় পরিস্থিতি করদাতাভেদে ভিন্ন হতে পারে। এ বিষয়ে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কিছু করদাতার করের চাপ বাড়ার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।
২০২৬-২৭ করবর্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো
নতুন আয়কর কাঠামোকে সহজভাবে মনে রাখলে মূল বিষয়গুলো হলো—
- সাধারণ করদাতার করমুক্ত আয়সীমা: ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা
- নারী ও ৬৫+ বয়সী করদাতার সীমা: ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা
- প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের করদাতার সীমা: ৫ লাখ টাকা
- যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও আহত জুলাই যোদ্ধার সীমা: ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা
- প্রথম করযোগ্য ধাপ: ১০ শতাংশ
- দ্বিতীয় ধাপ: ১৫ শতাংশ
- তৃতীয় ধাপ: ২০ শতাংশ
- চতুর্থ ধাপ: ২৫ শতাংশ
- সর্বোচ্চ ধাপ: ৩০ শতাংশ
- সাধারণ করদাতার ন্যূনতম কর: ৫ হাজার টাকা
- নতুন করদাতার ন্যূনতম কর: ১ হাজার টাকা।
শেষ কথা
২০২৬-২৭ করবর্ষের নতুন আয়কর কাঠামোয় সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা এবং করমুক্ত সীমা অতিক্রম করলে সাধারণ করদাতার জন্য ন্যূনতম কর ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা।
তবে আয়কর নির্ধারণের সময় শুধু মোট আয় দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। করদাতার শ্রেণি, করমুক্ত সীমা, ধাপভিত্তিক করহার, বিনিয়োগজনিত রেয়াত, উৎসে কর্তিত কর এবং অন্যান্য প্রযোজ্য বিধান বিবেচনা করে চূড়ান্ত করের হিসাব করতে হবে।
বিশেষ করে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার সামান্য বেশি আয় করা করদাতাদের জন্য ৫ হাজার টাকার ন্যূনতম করের বিধানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে যারা প্রথমবার করদাতা হচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম কর ১ হাজার টাকা—এটি আলাদা সুবিধা।
সুতরাং ২০২৬-২৭ করবর্ষে সাধারণ করদাতার জন্য সহজ ভাষায় উত্তর হলো: বছরে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত; এই সীমা অতিক্রম করলে প্রযোজ্য ন্যূনতম আয়কর ৫ হাজার টাকা।

