৯ম পে স্কেল নিউজ

নবম পে-স্কেল চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায়, ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরে চার ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। মূল্যস্ফীতি, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা এবং বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন কাঠামো দুই অর্থবছরে মোট চার ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে নতুন কাঠামোর বেতন অক্টোবর থেকে দেওয়া শুরু হতে পারে, তবে কার্যকর তারিখ চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে গণ্য করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সোমবার (৩১ আগস্ট) মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামোসংক্রান্ত প্রস্তাব উপস্থাপনের প্রস্তুতি রয়েছে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন মিললে প্রস্তাবটি পরবর্তী প্রয়োজনীয় যাচাই ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারির দিকে এগোবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির দীর্ঘদিনের দাবি পূরণের পাশাপাশি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে হঠাৎ বড় ধরনের অতিরিক্ত চাপ এড়াতে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কৌশল নেওয়া হয়েছে।

সেপ্টেম্বরেই গেজেট, অক্টোবর থেকে নতুন বেতন পাওয়ার লক্ষ্য

অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, আগামী সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে নবম জাতীয় পে-স্কেলের আনুষ্ঠানিক গেজেট বা প্রজ্ঞাপন প্রকাশের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রক্রিয়া পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে অক্টোবর মাস থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন পেতে শুরু করতে পারেন।

তবে প্রজ্ঞাপন প্রকাশে কিছুটা সময় লাগলেও নতুন বেতন কাঠামোর কার্যকর তারিখ পিছিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নেই বলে জানা গেছে। বরং চলতি বছরের ১ জুলাই থেকেই নতুন পে-স্কেল কার্যকর হিসেবে গণ্য করার চিন্তা রয়েছে

সে ক্ষেত্রে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের বেতন পরবর্তীতে নতুন কাঠামো অনুযায়ী পুনর্নির্ধারণ করা হতে পারে। প্রাপ্য অতিরিক্ত অর্থ বকেয়া হিসেবে পরবর্তী সময়ে সমন্বয়ের সুযোগও থাকতে পারে।

অর্থাৎ, গেজেট প্রকাশে প্রশাসনিক বা আইনি কারণে বিলম্ব হলেও সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির কার্যকর তারিখ ১ জুলাই থেকেই বহাল রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর আইন মন্ত্রণালয়ে যাবে প্রস্তাব

পে-স্কেলের মূল বিষয়গুলো ইতোমধ্যে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

মন্ত্রিসভার অনুমোদন পাওয়ার পর নতুন বেতন কাঠামোর প্রস্তাব প্রয়োজনীয় আইনি যাচাই ও পর্যালোচনার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হতে পারে। সেখানে ভেটিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর নতুন পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারির আনুষ্ঠানিক পথ উন্মুক্ত হবে।

অর্থ বিভাগের একাধিক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের মাধ্যমে নতুন বেতন কাঠামোর আর্থিক ও প্রশাসনিক দিকগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব আলোচনা শেষে বিষয়টি মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

সরকারের সামগ্রিক কার্যপরিকল্পনার অংশ হিসেবে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘জনগণের সরকারের ১৮০ দিন’ শীর্ষক ই-বুকেও এ বিষয়ে পরিকল্পনার তথ্য উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

কমিশনের প্রস্তাব ছিল বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি

নবম জাতীয় বেতন কমিশন বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণের সুপারিশ করেছিল।

কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী—

  • সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছিল।
  • সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব ছিল।
  • বিভিন্ন গ্রেডে বেতন ও ভাতা মিলিয়ে ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশের বেশি পর্যন্ত বৃদ্ধি করার সুপারিশ ছিল।

তবে এত বড় পরিসরে একসঙ্গে বেতন বৃদ্ধি বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকারের বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে—এ বিষয়টি পরবর্তীতে বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়।

বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আয়, উন্নয়ন ব্যয় এবং সরকারের সামগ্রিক বাজেট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে নতুন বেতন কাঠামোর ব্যয় সামঞ্জস্য করার প্রশ্ন সামনে আসে।

উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটির নতুন হিসাব

কমিশনের সুপারিশগুলো পুনর্বিবেচনার জন্য গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটি গঠন করা হয়।

কমিটি কমিশনের সুপারিশগুলো আর্থিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক বাস্তবতা এবং বাস্তবায়ন কৌশলের আলোকে পর্যালোচনা করে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, চূড়ান্ত প্রতিবেদনে প্রথম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

এর অর্থ হলো, জাতীয় বেতন কমিশনের প্রাথমিক সুপারিশ হুবহু বাস্তবায়নের পরিবর্তে সরকারের আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন বৃদ্ধির চূড়ান্ত হার নির্ধারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসতে পারে। তবে কোন গ্রেডে কত টাকা বা কত শতাংশ বৃদ্ধি হবে এবং ভাতাগুলো কীভাবে পুনর্বিন্যাস করা হবে—সে বিষয়ে চূড়ান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।

চার ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন পে-স্কেলের মূল বেতন ও বিভিন্ন ভাতা দুই অর্থবছরে মোট চার ধাপে বাস্তবায়ন করা হতে পারে।

প্রথম ধাপ: ১ জুলাই থেকে ৩০ শতাংশ

পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে নতুন মূল বেতনের ৩০ শতাংশ কার্যকর করা হতে পারে।

এই ধাপের মাধ্যমে নতুন বেতন কাঠামোর বাস্তবায়ন শুরু হবে। যদিও প্রজ্ঞাপন পরে জারি হতে পারে, কার্যকর তারিখ ১ জুলাই ধরে বকেয়া সমন্বয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

দ্বিতীয় ধাপ: আগামী জানুয়ারি থেকে আরও ৩৫ শতাংশ

দ্বিতীয় ধাপে আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে নতুন মূল বেতনের আরও ৩৫ শতাংশ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপ মিলিয়ে নতুন বেতন কাঠামোর একটি বড় অংশ কার্যকর হবে।

তৃতীয় ধাপ: পরবর্তী অর্থবছরের জুলাই

পরবর্তী অর্থবছরের জুলাই থেকে মূল বেতনের অবশিষ্ট অংশের আরেকটি ধাপ কার্যকর করা হতে পারে।

এ ধাপে নতুন বেতন কাঠামোর মূল বেতনের বাকি অংশ বাস্তবায়নের দিকে সরকার এগোবে।

চতুর্থ ধাপ: পরবর্তী অর্থবছরের জানুয়ারি

চতুর্থ ও শেষ ধাপে বিভিন্ন ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার অবশিষ্ট অংশ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থাৎ পুরো নতুন বেতন কাঠামো একদিনে কার্যকর না করে পর্যায়ক্রমে মূল বেতন এবং ভাতাগুলো বাস্তবায়নের কৌশল নেওয়া হচ্ছে।

কেন একবারে নয়, চার ধাপে?

নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সরকারের অতিরিক্ত আর্থিক ব্যয়।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়লে শুধু মাসিক বেতন ব্যয়ই বৃদ্ধি পায় না; এর সঙ্গে অবসরভাতা, পেনশন, বিভিন্ন ভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক দায়ও বাড়তে পারে।

একবারে বড় অঙ্কের বেতন বৃদ্ধি কার্যকর করলে সরকারের পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর প্রভাব বাজেট ঘাটতি, সরকারি ঋণ গ্রহণ এবং সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপরও পড়তে পারে।

এ ছাড়া দেশের মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতিও সরকারের নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় রয়েছে। বড় অঙ্কের বেতন বৃদ্ধি একসঙ্গে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত ভোগব্যয় সৃষ্টি করতে পারে—এমন আশঙ্কাও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে গুরুত্ব পায়।

এ কারণে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার একদিকে কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির দাবি পূরণের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে অর্থনীতির ওপর আকস্মিক চাপ কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে।

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য কী বার্তা?

নতুন পে-স্কেল নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার মধ্যে সর্বশেষ এই অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষ করে কার্যকর তারিখ ১ জুলাই থেকে ধরা হলে গেজেট প্রকাশের সময় নিয়ে কর্মচারীদের উদ্বেগ কিছুটা কমতে পারে। কারণ অক্টোবর বা তার পরে নতুন হারে বেতন দেওয়া শুরু হলেও পূর্ববর্তী মাসগুলোর বর্ধিত অর্থ বকেয়া হিসেবে পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

তবে বকেয়া অর্থ একসঙ্গে দেওয়া হবে, নাকি কিস্তিতে সমন্বয় করা হবে—সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রজ্ঞাপন বা সরকারের পরবর্তী নির্দেশনায় স্পষ্ট হবে।

একইভাবে, সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতন কত হবে, বিভিন্ন গ্রেডে কত শতাংশ বৃদ্ধি হবে এবং কোন কোন ভাতায় পরিবর্তন আসবে—এসব বিষয়ও চূড়ান্ত অনুমোদনের পরই পরিষ্কার হবে।

এখন নজর মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে

সব মিলিয়ে নবম জাতীয় পে-স্কেল এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে।

মন্ত্রিসভার অনুমোদন, আইনি ভেটিং এবং প্রজ্ঞাপন জারির প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হলে সেপ্টেম্বরের মধ্যেই নতুন বেতন কাঠামোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী অক্টোবর থেকে নতুন হারে বেতন দেওয়া শুরু হলেও তা ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরে হিসাব করার সম্ভাবনা রয়েছে

তবে চার ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব, বেতন বৃদ্ধির চূড়ান্ত হার এবং ভাতা কাঠামোর বিস্তারিত এখনো সরকারি প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষায়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের এই কৌশল সফল হলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের পাশাপাশি সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনা ও সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর হঠাৎ বড় ধরনের চাপ এড়ানো সম্ভব হবে।

এখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চোখ মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং নবম জাতীয় পে-স্কেলের আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপনের দিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *