সরকারি কর্মচারীদের পে-স্কেল নিয়ে সরব CPD: নিজেদের আকাশচুম্বী বেতনের তথ্য গোপন কেন?
সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদি ও পে-স্কেল নিয়ে নিয়মিত কঠোর সমালোচনা ও বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন প্রকাশ করে আলোচনায় থাকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)। সরকারি বেতন কাঠামো নিয়ে তাদের বিভিন্ন সময় দেওয়া নেতিবাচক মন্তব্যে মাঠ পর্যায়ে অসন্তোষ থাকলেও, এবার প্রকাশ্যে এসেছে সংস্থাটির নিজস্ব বেতন কাঠামোর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সিপিবির এই ‘দ্বিমুখী’ অবস্থান নিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছে তীব্র প্রশ্ন।
৭৮ জনের বেতন ৮ কোটি টাকা: প্রশ্নবিদ্ধ নৈতিকতা
বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সিপিবির মাত্র ৭৮ জন কর্মীর বাৎসরিক বেতন বাবদ ব্যয় হয় প্রায় ৮ কোটি টাকা। গাণিতিক হিসাব করলে দেখা যায়, চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে পিয়ন পর্যন্ত সংস্থাটির প্রতিটি কর্মীর গড় মাসিক বেতন প্রায় ৮৬ হাজার টাকা। যে সংস্থাটি সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধিতে নানা অজুহাতে আপত্তি জানায়, তাদের নিজেদের বেতন কাঠামো কীভাবে এত উচ্চবিত্ত পর্যায়ে থাকে—তা নিয়ে সাধারণ সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বেঁধেছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও দীর্ঘমেয়াদী স্থবিরতা
প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সময়ে তিনবার নতুন পে-স্কেল কার্যকর করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১৬ সাল থেকে ২০২৬—এই দীর্ঘ এক দশকে সরকারি কোনো নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়নি। অথচ, এই ১০ বছরে বাজারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম থেকে শুরু করে স্বর্ণের মতো মূল্যবান জিনিসের দাম বেড়েছে প্রায় সাত গুণ। মুদ্রাস্ফীতির এই বিশাল চাপে সরকারি কর্মচারীরা যখন টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন, তখন সিপিবির মতো প্রভাবশালী নীতি-গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বেতন কাঠামো নিয়ে নীরবতা পালন করছে।
সিপিবির ‘দ্বিমুখী’ নীতি কি স্বচ্ছতার অভাব?
সাধারণত যেকোনো দেশের নীতি-নির্ধারণী বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান জনস্বার্থে নিরপেক্ষ মতামত প্রদানের জন্য পরিচিত। কিন্তু সিপিবির ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। একদিকে তারা সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বা পে-স্কেল নিয়ে উচ্চকণ্ঠ এবং নানা নেতিবাচক মন্তব্য করেন, অন্যদিকে নিজেদের সংস্থার হাজার হাজার টাকার বেতন নিয়ে তারা একেবারেই নিশ্চুপ।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সরকারি কর্মকর্তা বলেন, “আমরা যারা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখি, আমাদের জীবনযাত্রার মান নিয়ে যারা প্রতিনিয়ত প্রশ্ন তোলেন, তাদের নিজেদের বার্ষিক রিপোর্ট দেখলে বোঝা যায় তারা কোন স্তরের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। নিজেদের বেতন নিয়ে কথা না বলে সরকারি কর্মীদের বেতন নিয়ে সমালোচনা করা কি নৈতিকভাবে শোভন?”
তথ্যের উৎস ও প্রেক্ষাপট
সম্প্রতি আনিসুর রহমান শ্রাবণ (বিসিএস প্রশাসন) কর্তৃক সিপিবির বার্ষিক রিপোর্ট বিশ্লেষণের পর এই তথ্যগুলো জনসমক্ষে উঠে আসে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, একটি দেশের প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের বেতন নিয়ে মন্তব্য করার আগে, সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদের আর্থিক স্বচ্ছতা ও নৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
দীর্ঘ এক দশকে সরকারি বেতন কাঠামোতে পরিবর্তন না আসায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রায় যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা অনস্বীকার্য। এমতাবস্থায়, উন্নয়ন বা আর্থিক নীতি নির্ধারণের নামে কেবল একপক্ষের ওপর মন্তব্য না করে, সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় এবং মুদ্রাস্ফীতির সামঞ্জস্য রেখে একটি বাস্তবসম্মত বেতন নীতি প্রণয়নই এখন সময়ের দাবি।

