সেপ্টেম্বরের শুরুতেই মন্ত্রিসভায় উঠছে পে স্কেল, দ্বিতীয় সপ্তাহে গেজেটের লক্ষ্য
নবম জাতীয় পে স্কেলের গেজেট প্রকাশ নিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বেতন কাঠামোর অবশিষ্ট জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তি করে সেপ্টেম্বরের শুরুতেই পে স্কেলের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহেই নতুন বেতন কাঠামোর গেজেট প্রকাশ হতে পারে।
এর আগে আগস্টের মধ্যেই গেজেট প্রকাশের আলোচনা থাকলেও বেতন বৃদ্ধির হার, বিভিন্ন ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা, জুডিশিয়াল সার্ভিসের বেতন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে পর্যালোচনার কারণে সময়সূচিতে পরিবর্তন এসেছে। এখন এসব বিষয় দ্রুত চূড়ান্ত করে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের দিকে এগোচ্ছে অর্থ বিভাগ।
সেপ্টেম্বরের শুরুতেই মন্ত্রিসভায় প্রস্তাব
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনায় গঠিত উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে আরও একটি বৈঠকের পর সুপারিশ চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর অর্থ বিভাগ নতুন বেতন কাঠামোর প্রস্তাব মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য পাঠাবে।
মন্ত্রিসভায় প্রস্তাব অনুমোদিত হলে সেটি আইন মন্ত্রণালয়ে আইনগত ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে। ভেটিং ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই গেজেট জারির পথ খুলবে। এ কারণে সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকের মন্ত্রিসভা বৈঠকটি পে স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
গেজেট প্রকাশের সম্ভাব্য সময় সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ
সাম্প্রতিক একাধিক প্রতিবেদনে সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। ২০ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহকে লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ২৬ আগস্টের সর্বশেষ প্রতিবেদনে সেই লক্ষ্য আরও স্পষ্ট করে সেপ্টেম্বরের শুরুতে মন্ত্রিসভায় প্রস্তাব তোলার প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছে।
অর্থাৎ বর্তমান অগ্রগতি অনুযায়ী সম্ভাব্য সময়সূচি দাঁড়াচ্ছে—সেপ্টেম্বরের প্রথম ভাগে মন্ত্রিসভায় অনুমোদন, এরপর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং এবং সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে গেজেট প্রকাশ। তবে এটি এখনো সম্ভাব্য সময়সূচি; চূড়ান্ত গেজেটের তারিখ নির্ভর করবে মন্ত্রিসভার অনুমোদন ও আইনগত প্রক্রিয়া কত দ্রুত শেষ হয় তার ওপর।
অক্টোবর থেকে নতুন বেতনে যাওয়ার পরিকল্পনা
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গেজেট সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রকাশিত হলে অক্টোবর থেকেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন পেতে পারেন। তবে নতুন পে স্কেল কার্যকর ধরা হবে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে। ফলে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসের বেতন নতুন কাঠামো অনুযায়ী পুনর্নির্ধারণের সুযোগ থাকবে।
এতে গেজেট প্রকাশের আগ পর্যন্ত পুরোনো কাঠামো অনুযায়ী পাওয়া বেতন এবং নতুন কাঠামো অনুযায়ী প্রাপ্য বেতনের মধ্যে যে পার্থক্য তৈরি হবে, সেটিই বকেয়া হিসেবে দাঁড়াবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, ওই বকেয়া পরবর্তী সময়ে সমন্বয় বা ধাপে ধাপে পরিশোধ করা হতে পারে।
একসঙ্গে নয়, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা
নতুন পে স্কেল নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে এর আর্থিক প্রভাব। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় পুরো বেতন কাঠামো একবারে বাস্তবায়নের পরিবর্তে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রাথমিক পরিকল্পনায় প্রথম ধাপে মূল বেতন কার্যকর এবং পরবর্তী ধাপে বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। একইভাবে গেজেটের পর জুলাই থেকে জমা হওয়া বকেয়া অর্থও একবারে পরিশোধ না করে পর্যায়ক্রমে সমন্বয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
এর ফলে একদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে সরকারের ওপর এককালীন বড় আর্থিক চাপও কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
বেতন বৃদ্ধির হারেও আসতে পারে পরিবর্তন
নবম জাতীয় পে কমিশনের সুপারিশে যে হারে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছিল, পর্যালোচনার পর সচিব কমিটি সেই হার কিছুটা কমানোর সুপারিশ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সরকারের রাজস্ব আয়, চলমান অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি এবং নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে এই পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এখানেই পে স্কেলের চূড়ান্ত রূপ নির্ধারণের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি রয়েছে—কর্মচারীদের প্রত্যাশিত বেতন বৃদ্ধি এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য তৈরি করা হবে।
ফলে পে কমিশনের সুপারিশ সরাসরি বাস্তবায়ন হবে, নাকি কিছুটা সংশোধন করে নতুন কাঠামো অনুমোদন করা হবে—মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।
জুডিশিয়াল সার্ভিসের সঙ্গে সমন্বয় বড় বিষয়
নবম পে স্কেল চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে জুডিশিয়াল সার্ভিসের বেতন কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জাতীয় বেতন কমিশন, জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামোর মধ্যে সামঞ্জস্য রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে।
বিশেষ করে বিচার বিভাগ ও অন্যান্য সরকারি কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও সুযোগ-সুবিধার মধ্যে কতটা পার্থক্য থাকবে, সেটি নির্ধারণ করা একটি স্পর্শকাতর বিষয়। এই সমন্বয় শেষ না করে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করলে ভবিষ্যতে নতুন জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কাঠামো পর্যালোচনা করছে।
কেন বারবার সময় পিছিয়েছে?
নতুন পে স্কেলের গেজেট নিয়ে আগে জুলাই, পরে আগস্ট—বিভিন্ন সময়ে সম্ভাব্য সময়ের কথা বলা হলেও বাস্তবে গেজেট প্রকাশ হয়নি। এর পেছনে মূলত তিনটি বড় বিষয় কাজ করেছে।
প্রথমত, বেতন বৃদ্ধির হার ও বিভিন্ন ভাতা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সময় লেগেছে। দ্বিতীয়ত, জুডিশিয়াল সার্ভিসসহ বিভিন্ন বেতন কাঠামোর মধ্যে সামঞ্জস্য তৈরির প্রয়োজন হয়েছে। তৃতীয়ত, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে পুরো কাঠামো কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তা নির্ধারণ করতে হয়েছে।
এ কারণে এবার সেপ্টেম্বরের শুরুতে মন্ত্রিসভায় প্রস্তাব তোলার আগে অবশিষ্ট বিষয়গুলো দ্রুত নিষ্পত্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এখন সামনে যে ধাপগুলো
বর্তমান অগ্রগতি বিশ্লেষণ করলে নবম পে স্কেলের গেজেট প্রকাশের আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ রয়েছে—
১. সচিব কমিটির চূড়ান্ত পর্যালোচনা
২. মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে প্রয়োজনীয় বৈঠক
৩. অর্থ বিভাগের মাধ্যমে মন্ত্রিসভায় প্রস্তাব উপস্থাপন
৪. মন্ত্রিসভার অনুমোদন
৫. আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং
৬. চূড়ান্ত প্রশাসনিক অনুমোদন
৭. গেজেট বা প্রজ্ঞাপন প্রকাশ
৮. ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরে নতুন বেতন নির্ধারণ ও বকেয়া হিসাব
অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে গেজেট প্রকাশের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে এসব ধাপ খুব দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এর অর্থ কী?
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবে কবে থেকে হাতে পাওয়া যাবে। গেজেট সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রকাশ হলে অক্টোবরের বেতন নতুন কাঠামোয় পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের বকেয়া কীভাবে এবং কখন দেওয়া হবে—এটি চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট হতে পারে।
একই সঙ্গে মূল বেতন আগে কার্যকর করে ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পরে দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নতুন পে স্কেলের সব সুবিধা একসঙ্গে পাওয়া যাবে না। তাই শুধু গেজেট প্রকাশ নয়, বাস্তবায়নের সময়সূচি ও বকেয়া পরিশোধের পদ্ধতিও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভাতেই
সব মিলিয়ে নবম জাতীয় পে স্কেল এখন আর প্রাথমিক আলোচনার পর্যায়ে নেই; বরং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও অনুমোদনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে বলে সাম্প্রতিক সরকারি সূত্রভিত্তিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে মন্ত্রিসভায় প্রস্তাব তোলা এবং সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে গেজেট প্রকাশ—এটাই বর্তমানে সরকারের লক্ষ্য হিসেবে সামনে এসেছে।
তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—‘গেজেট প্রকাশের লক্ষ্য’ আর ‘গেজেট প্রকাশের নিশ্চিত তারিখ’ এক বিষয় নয়। মন্ত্রিসভায় অনুমোদন, আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং এবং শেষ মুহূর্তের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে সময়সূচিতে আবারও পরিবর্তন হতে পারে।
তবু সাম্প্রতিক অগ্রগতি বিবেচনায় সেপ্টেম্বরই এখন নবম পে স্কেলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাস। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগোলে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হতে পারে এবং অক্টোবর থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামোয় যাওয়ার পথ খুলে যেতে পারে।

