bd Service Rules

মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের ভ্রমণ ব্যয়ে নতুন নির্দেশনা, বিলের সঙ্গে ৭ ধরনের প্রমাণক বাধ্যতামূলক

সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রিগণের সরকারি ভ্রমণ ব্যয়ের অর্থ বরাদ্দ, অগ্রিম অর্থ বরাদ্দ এবং ভ্রমণ শেষে বিল দাখিলের ক্ষেত্রে নতুন করে বেশ কিছু বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এখন থেকে ভ্রমণ ব্যয়ের বিলের সঙ্গে নির্দিষ্ট প্রমাণক সংযুক্ত না করলে সংশ্লিষ্ট বিলের কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে না। একই সঙ্গে আগের ভ্রমণের অগ্রিম বিল সমন্বয় না করলে পরবর্তী ভ্রমণের জন্য অর্থ বরাদ্দ না দেওয়ার বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের এক প্রজ্ঞাপনে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। প্রজ্ঞাপনের স্মারক নম্বর ০৪.০০.০০০০.০০০.৪২২.৯৯.০০০২.২৫.৩২৭। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিজ্ঞপ্তি তালিকাতেও এটি ৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রজ্ঞাপন হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনটি দেখুন

কেন নতুন নির্দেশনা

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রিগণ সরকারি কাজে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ভ্রমণ করে থাকেন। এসব ভ্রমণের ব্যয় নির্বাহের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মন্ত্রীপদ বিষয়ক ইউনিট থেকে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ থেকে অগ্রিম অর্থ বরাদ্দ নেওয়া কিংবা ভ্রমণ শেষে প্রকৃত ব্যয় পরিশোধের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে বিল দাখিল করা হয়।

কিন্তু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যথাযথভাবে সংযুক্ত না থাকলে সংশ্লিষ্ট বিলের কার্যক্রম গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। এ কারণে ভ্রমণ ব্যয়ের বিল দাখিল ও অগ্রিম অর্থ সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কী কী কাগজপত্র দিতে হবে এবং কোন সময়সীমা অনুসরণ করতে হবে—তা নতুন প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট করা হয়েছে।

ভ্রমণ বিলের সঙ্গে ৭ ধরনের প্রমাণক দিতে হবে

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ভ্রমণকারীর স্বাক্ষর ও সিলসহ প্রস্তুতকৃত বিলের সঙ্গে প্রয়োজনীয় প্রমাণক সংযুক্ত করতে হবে। বিশেষ করে বৈদেশিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিচের কাগজপত্রগুলো দিতে হবে—

১. সরকারপ্রধান কর্তৃক অনুমোদিত সারসংক্ষেপের কপি
বৈদেশিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে সরকারপ্রধান কর্তৃক অনুমোদিত সারসংক্ষেপের কপি বিলের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে।

২. সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অফিস আদেশের কপি
দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় বা বিভাগ কর্তৃক জারি করা অফিস আদেশের কপিও দিতে হবে।

৩. যানবাহনের ভাড়ার প্রকৃত পরিমাণসহ টিকিট
যদি যানবাহন ব্যবহার করা হয়, তাহলে প্রকৃত ভাড়ার পরিমাণ উল্লেখ থাকা টিকিট সংযুক্ত করতে হবে।

৪. বিমান ভ্রমণের ক্ষেত্রে বোর্ডিং পাস
বিমান ভ্রমণ করলে টিকিটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বোর্ডিং পাস জমা দিতে হবে।

৫. অনুমোদিত ভ্রমণ বিবরণী ও ভ্রমণসূচি
ভ্রমণের অনুমোদিত বিবরণী এবং সংশ্লিষ্ট ভ্রমণসূচিও বিলের সঙ্গে দিতে হবে।

৬. আবাসিক হোটেলের প্রকৃত পরিশোধিত বিলের কপি বা প্রমাণক
হোটেলে অবস্থানের ক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে পরিশোধ করা বিলের কপি বা যথাযথ প্রমাণক সংযুক্ত করতে হবে।

৭. অন্যান্য সব ব্যয়ের ভাউচার বা প্রমাণক
ভ্রমণসংক্রান্ত অন্যান্য ব্যয়ের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট ভাউচার বা প্রমাণক জমা দিতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রায় ব্যয়ের ক্ষেত্রে টাকার সঙ্গে বিনিময় হারসংক্রান্ত বিবরণও দিতে হবে।

অর্থাৎ, শুধু ভ্রমণ করেছেন—এমন দাবি করলেই ব্যয় পরিশোধের সুযোগ থাকবে না; বরং প্রতিটি ব্যয়ের পেছনে যথাযথ দলিল-প্রমাণ দেখাতে হবে।

অনুমোদিত সময়ের বেশি ভ্রমণ করলে নিতে হবে নতুন অনুমোদন

নতুন নির্দেশনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অনুমোদিত ভ্রমণকাল অতিক্রম করা

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সরকারপ্রধান কর্তৃক অনুমোদিত সারসংক্ষেপে যে ভ্রমণকাল উল্লেখ রয়েছে, তার অতিরিক্ত সময় ভ্রমণ করতে হলে পুনরায় অনুমোদন নিতে হবে। অর্থাৎ অনুমোদিত সফরের সময়সীমা নিজের মতো করে বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই।

এতে সরকারি অর্থে ভ্রমণের সময়সীমা ও অনুমোদনের মধ্যে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

অগ্রিম অর্থ নেওয়ার ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি

অগ্রিম অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের সর্বশেষ জারি করা নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর পাশাপাশি অগ্রিম অর্থ নিয়ে ভ্রমণ করলে সফর শেষ হওয়ার এক মাসের মধ্যে ওই অগ্রিম অর্থের সমন্বয় বিল দাখিল করতে হবে।

এটি নির্দেশনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক জবাবদিহির অংশ। অর্থাৎ কোনো মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী সরকারি সফরের জন্য অগ্রিম অর্থ গ্রহণ করলে সফর শেষ হওয়ার পর দীর্ঘদিন সেই অর্থের হিসাব অসম্পন্ন অবস্থায় রাখা যাবে না।

আগের অগ্রিম বিল সমন্বয় না করলে পরবর্তী ভ্রমণে অর্থ বরাদ্দ নয়

নতুন প্রজ্ঞাপনে আরও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আগের ভ্রমণের অগ্রিম বিল সমন্বয় না করা হলে পরবর্তী ভ্রমণের ক্ষেত্রে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে না

এর ফলে এক সফরের অগ্রিম অর্থের হিসাব নিষ্পত্তি না করেই পরবর্তী সফরের জন্য আবার সরকারি অর্থ বরাদ্দ নেওয়ার সুযোগ সীমিত করা হয়েছে।

বাস্তবে এই বিধানটি ভ্রমণ ব্যয়ের হিসাব দ্রুত নিষ্পত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ পরবর্তী অর্থ বরাদ্দের সঙ্গে আগের অগ্রিমের সমন্বয়কে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে।

বিল দাখিলে সময় হাতে রাখতে হবে

অগ্রিম অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে নথি ব্যবস্থাপনা এবং অর্থ ছাড়ের সুবিধার জন্য প্রয়োজনীয় সময় হাতে রেখে বিল দাখিল করতে বলা হয়েছে।

অর্থাৎ সফরের একেবারে শেষ মুহূর্তে অর্থ বরাদ্দের আবেদন পাঠিয়ে দ্রুত অর্থ ছাড়ের প্রত্যাশা না করে যথেষ্ট সময় হাতে রেখে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

এর উদ্দেশ্য হলো প্রশাসনিক নথি যাচাই, অনুমোদন এবং অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়াকে সুশৃঙ্খল করা।

একটি বিলের সঙ্গে মোট তিন সেট জমা দিতে হবে

বিল দাখিলের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নিয়ম করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মূল কপিসহ মোট তিন সেট বিল দাখিল করতে হবে।

এছাড়া বিলের সঙ্গে সংযুক্ত সব ফটোকপি যথাযথভাবে সত্যায়িত হতে হবে।

ফলে শুধু বিলের মূল কপি জমা দিলেই হবে না; প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের সত্যায়িত অনুলিপিসহ নির্ধারিত সংখ্যক সেট প্রস্তুত করতে হবে।

আগের পরিপত্র প্রতিস্থাপন

নতুন প্রজ্ঞাপনটি শুধু নতুন নির্দেশনা জারি করেনি; একই সঙ্গে আগের একটি পরিপত্রও প্রতিস্থাপন করেছে।

প্রজ্ঞাপনের শেষাংশে উল্লেখ করা হয়েছে, ৪ মে ২০২৫ তারিখে জারি করা সংশ্লিষ্ট পরিপত্রটি এতদ্বারা প্রতিস্থাপিত হলো। অর্থাৎ ২০২৫ সালের ওই নির্দেশনার পরিবর্তে এখন ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জারি করা নতুন নির্দেশনাই অনুসরণ করতে হবে।

কারা নির্দেশনা বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত

প্রজ্ঞাপনটি সংশ্লিষ্ট সব সিনিয়র সচিব ও সচিব, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের একান্ত সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিবের একান্ত সচিব, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা (ডিডিও) এবং সংশ্লিষ্ট আইসিটি কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে। বাসসের প্রতিবেদনেও এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওয়েবসাইটের সংশ্লিষ্ট পরিপত্র অংশে এটি আপলোড করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

মূল পরিবর্তনগুলো এক নজরে

বিষয় নতুন নির্দেশনা
ভ্রমণ বিল প্রয়োজনীয় প্রমাণকসহ দাখিল করতে হবে
বৈদেশিক ভ্রমণ অনুমোদিত সারসংক্ষেপ ও অফিস আদেশের কপি দিতে হবে
বিমান ভ্রমণ টিকিটের সঙ্গে বোর্ডিং পাস দিতে হবে
হোটেল ব্যয় প্রকৃত পরিশোধিত বিল/প্রমাণক দিতে হবে
বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় বিনিময় হারসংক্রান্ত বিবরণ দিতে হবে
অনুমোদিত সময়ের অতিরিক্ত ভ্রমণ পুনরায় অনুমোদন নিতে হবে
অগ্রিম অর্থ অর্থ বিভাগের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে
অগ্রিম সমন্বয় ভ্রমণ শেষের ১ মাসের মধ্যে বিল দিতে হবে
আগের অগ্রিম অনিষ্পন্ন পরবর্তী ভ্রমণে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে না
বিলের কপি মূলসহ মোট ৩ সেট
ফটোকপি যথাযথভাবে সত্যায়িত হতে হবে

সার্বিক বিশ্লেষণ

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এই প্রজ্ঞাপনকে মূলত মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রিদের সরকারি ভ্রমণ ব্যয়ের হিসাবকে আরও নথিনির্ভর, সময়সীমাবদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক করার প্রশাসনিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা যায়। এখানে নতুন কোনো ভ্রমণভাতা বা ভ্রমণ ব্যয়ের হার ঘোষণা করা হয়নি; বরং বিদ্যমান সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অনুমোদন, প্রমাণক, অগ্রিম সমন্বয় এবং বিল নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া আরও স্পষ্ট করা হয়েছে।

বিশেষ করে আগের অগ্রিম সমন্বয় না হলে পরবর্তী ভ্রমণে অর্থ বরাদ্দ না দেওয়ার বিধান এবং সফর শেষ হওয়ার এক মাসের মধ্যে অগ্রিম সমন্বয়ের বাধ্যবাধকতা সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। পাশাপাশি তিন সেট বিল, সত্যায়িত ফটোকপি এবং টিকিট-বোর্ডিং পাস-হোটেল বিলসহ নির্দিষ্ট প্রমাণক বাধ্যতামূলক করায় ভ্রমণ ব্যয়ের প্রতিটি দাবির বিপরীতে যাচাইযোগ্য নথি রাখার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রজ্ঞাপনটি ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত হয়েছে এবং ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তা হালনাগাদ তথ্য হিসেবে দেখানো হয়েছে।

সুতরাং, নতুন নিয়মের মূল কথা হলো—সরকারি ভ্রমণের জন্য অগ্রিম নিলে সময়মতো হিসাব দিতে হবে, ভ্রমণ শেষে যথাযথ প্রমাণক দিতে হবে, অনুমোদিত সময়ের বাইরে গেলে নতুন অনুমোদন নিতে হবে এবং আগের অগ্রিমের হিসাব নিষ্পত্তি না করে পরবর্তী সফরের জন্য সরকারি অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যাবে না।

Source File

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *