৯ম পে স্কেল নিউজ

গ্রেড হতে গ্রেডে বেতনের পার্থক্য: কোথাও ২৮ হাজার, কোথাও মাত্র ৩০০ টাকা—নবম পে-স্কেল নিয়ে নতুন আলোচনা”

সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় বেতন স্কেল নিয়ে আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে এক গ্রেড থেকে পরবর্তী গ্রেডে মূল বেতনের পার্থক্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি চার্টে দেখা যাচ্ছে, উচ্চতর গ্রেডগুলোর মধ্যে বেতনের ব্যবধান যেখানে কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার টাকা, সেখানে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রে ব্যবধান অনেকটাই সংকুচিত।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ছবিতে থাকা তালিকাটি মূলত প্রস্তাবিত কাঠামোর চার্ট। এরই মধ্যে ৩১ আগস্ট ২০২৬ মন্ত্রিসভা নবম জাতীয় বেতন স্কেল অনুমোদন করেছে এবং কিছু অঙ্ক প্রস্তাবের তুলনায় পরিবর্তিত হয়েছে।

১ম থেকে ১০ম গ্রেডে ব্যবধান কোথায় কত?

ছবিতে প্রদর্শিত প্রস্তাবিত মূল বেতন অনুযায়ী—

গ্রেড প্রস্তাবিত প্রারম্ভিক মূল বেতন পরবর্তী গ্রেডের সঙ্গে ব্যবধান
১ম ১,৬০,০০০ ২৮,০০০
২য় ১,৩২,০০০ ১৯,০০০
৩য় ১,১৩,০০০ ১৩,০০০
৪র্থ ১,০০,০০০ ১৪,০০০
৫ম ৮৬,০০০ ১৫,০০০
৬ষ্ঠ ৭১,০০০ ১৩,০০০
৭ম ৫৮,০০০ ১০,৮০০
৮ম ৪৭,২০০ ২,১০০
৯ম ৪৫,১০০ ১৩,১০০
১০ম ৩২,০০০ ৭,০০০

অর্থাৎ প্রস্তাবিত তালিকায় ১ম থেকে ১০ম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতনের মোট পার্থক্য ১ লাখ ২৮ হাজার টাকা। অন্যদিকে ১০ম গ্রেড থেকে ১১তম গ্রেডে ব্যবধান মাত্র ৭ হাজার টাকা।

১১ থেকে ২০তম গ্রেডে ব্যবধান আরও সংকুচিত

ছবির তালিকায় ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন যথাক্রমে ২৫ হাজার, ২৪ হাজার ৩০০, ২৪ হাজার, ২৩ হাজার ৫০০, ২২ হাজার ৮০০, ২১ হাজার ৯০০, ২১ হাজার ৪০০, ২১ হাজার, ২০ হাজার ৫০০ এবং ২০ হাজার টাকা।

এখানে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের বেশ কয়েকটি পাশাপাশি গ্রেডের মধ্যে পার্থক্য মাত্র ৩০০ থেকে ৯০০ টাকার মতো

যেমন—

  • ১১তম ও ১২তম গ্রেড: ৭০০ টাকা
  • ১২তম ও ১৩তম গ্রেড: ৩০০ টাকা
  • ১৩তম ও ১৪তম গ্রেড: ৫০০ টাকা
  • ১৪তম ও ১৫তম গ্রেড: ৭০০ টাকা
  • ১৫তম ও ১৬তম গ্রেড: ৯০০ টাকা
  • ১৬তম ও ১৭তম গ্রেড: ৫০০ টাকা
  • ১৭তম ও ১৮তম গ্রেড: ৪০০ টাকা
  • ১৮তম ও ১৯তম গ্রেড: ৫০০ টাকা
  • ১৯তম ও ২০তম গ্রেড: ৫০০ টাকা

অর্থাৎ ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতনের ব্যবধান সামগ্রিকভাবে মাত্র ৫ হাজার টাকা—এমনটাই ছবিটির মন্তব্যে দাবি করা হয়েছে। তবে তালিকার সংখ্যাগুলো সরাসরি যোগ-বিয়োগ করলে এই ব্যবধান ৪ হাজার ৫০০ টাকা হয়। ফলে চার্টটির ওই অংশে গাণিতিক অসঙ্গতিও রয়েছে।

কিন্তু অনুমোদিত পে-স্কেলে কী হয়েছে?

এখানেই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত নবম জাতীয় বেতন স্কেলে ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হয়েছে। অনুমোদিত কাঠামোয় ১ম গ্রেডের প্রারম্ভিক/নির্ধারিত মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, আর ২০তম গ্রেডে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

অনুমোদিত কাঠামোর ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন হলো—

১০ম: ৩২,০০০
১১তম: ২৫,০০০
১২তম: ২৪,৩০০
১৩তম: ২৪,০০০
১৪তম: ২৩,৫০০
১৫তম: ২২,৮০০
১৬তম: ২১,৯০০
১৭তম: ২১,৪০০
১৮তম: ২১,০০০
১৯তম: ২০,৫০০
২০তম: ২০,০০০ টাকা।

ফলে বাস্তব অনুমোদিত কাঠামোতেও ১১–২০ গ্রেডের মধ্যে ব্যবধান খুব বেশি নয়। ১২তম ও ১৩তম গ্রেডের মধ্যে পার্থক্য মাত্র ৩০০ টাকা। ১৭তম ও ১৮তম গ্রেডে পার্থক্য ৪০০ টাকা। ১৮তম থেকে ১৯তম এবং ১৯তম থেকে ২০তম গ্রেডেও ব্যবধান ৫০০ টাকা করে

তাহলে কি ‘ধনী আরও ধনী, গরিব আরও গরিব’?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন মন্তব্য স্বাভাবিকভাবেই দেখা যাচ্ছে। কারণ একই পে-স্কেলে একদিকে ১ম গ্রেডের সঙ্গে ২য় গ্রেডের ব্যবধান ২৪ হাজার টাকা, আবার নিচের দিকে ১২তম ও ১৩তম গ্রেডের ব্যবধান মাত্র ৩০০ টাকা।

কিন্তু বিষয়টি শুধু টাকার অঙ্ক দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। শতাংশের হিসাব করলে নতুন পে-স্কেলে নিম্ন গ্রেডের বেতন তুলনামূলকভাবে বেশি হারে বেড়েছে। সরকারি সিদ্ধান্তের তথ্য অনুযায়ী, ১ম থেকে ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন প্রায় ১০০ শতাংশ বাড়লেও ১২তম থেকে ২০তম গ্রেডে বৃদ্ধির হার প্রায় ১১৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত হয়েছে।

অর্থাৎ নিচের গ্রেডের কর্মচারীরা শতাংশের হিসাবে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছেন, যদিও এক গ্রেড থেকে আরেক গ্রেডে নামমাত্র টাকার ব্যবধান খুব কম।

এ কারণে এটিকে সরাসরি ‘ধনী আরও ধনী, গরিব আরও গরিব’—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখতে হবে: বেতনের মোট অঙ্ক এবং বৃদ্ধির শতকরা হার

বড় প্রশ্ন: গ্রেডের মধ্যে এত কম ব্যবধানের প্রভাব কী?

১১ থেকে ২০তম গ্রেডের মধ্যে ব্যবধান কয়েকশ টাকা হওয়ায় ভবিষ্যতে পদোন্নতি ও গ্রেড পরিবর্তনের আর্থিক প্রণোদনা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। একজন কর্মচারী উচ্চতর গ্রেডে উন্নীত হওয়ার পর মূল বেতনে যদি মাত্র কয়েকশ টাকা পার্থক্য পান, তাহলে পদোন্নতির আর্থিক সুফল কতটা দৃশ্যমান হবে—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়।

তবে একজন কর্মচারীর প্রকৃত আয় শুধু মূল বেতনের ওপর নির্ভর করে না। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, উৎসব ভাতা, অন্যান্য সুবিধা এবং ভবিষ্যতে ইনক্রিমেন্টের প্রভাবও মোট প্রাপ্তিতে যুক্ত হবে। নতুন পে-স্কেলের সঙ্গে বিভিন্ন ভাতা ও আর্থিক সুবিধা সমন্বয়ের বিষয়ও সরকারের সিদ্ধান্তে রয়েছে।

তিন ধাপে বাস্তবায়ন

নতুন পে-স্কেল একবারে পুরোপুরি কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মূল বেতনের ৩০ শতাংশ প্রথম ধাপে, পরের বছরের শুরুতে আরও ৩৫ শতাংশ এবং পরবর্তী অর্থবছরের জুলাইয়ে অবশিষ্ট অংশ কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর ভাতার বিষয়ও ধাপে বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।

ফলে চার্ট দেখে যে বেতন পুরোপুরি একসঙ্গে হাতে আসবে—এমন ধারণা করাও ঠিক হবে না।

শেষ কথা

নতুন পে-স্কেলের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হচ্ছে গ্রেডে গ্রেডে বেতনের ব্যবধান। উচ্চতর গ্রেডে কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার টাকার পার্থক্য থাকলেও ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে ব্যবধান অনেক ক্ষেত্রেই মাত্র কয়েকশ টাকা।

তবে এটিকে শুধু বৈষম্য হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা ধরা পড়বে না। কারণ নতুন কাঠামোয় নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের শতাংশের হিসাবে বেতন বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে বেশি। আবার অন্যদিকে পদোন্নতির পর মূল বেতনে সামান্য পার্থক্য থাকা নিয়ে বাস্তব কর্মজীবনে নতুন প্রশ্ন তৈরি হওয়াও স্বাভাবিক।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—প্রস্তাবিত চার্ট, মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত কাঠামো এবং শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত সরকারি প্রজ্ঞাপন—এই তিনটি এক বিষয় নয়। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো চার্টকে চূড়ান্ত ধরে বেতন নির্ধারণ না করে সরকারি প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত বেতন কাঠামোই চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। অর্থ বিভাগ প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন ও নির্দেশনায় বেতন নির্ধারণের বিস্তারিত বিধান দেবে বলে সরকার জানিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *