৯ম পে স্কেল নিউজ

১১ থেকে ২০ গ্রেডে বেতনের পার্থক্য কি মাত্র ৫০০ টাকা? যে হিসাবটি সামনে এলো

নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা এখন গ্রেডভিত্তিক মূল বেতনের পার্থক্য নিয়ে। বিশেষ করে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রে এক গ্রেড থেকে পরের গ্রেডে মূল বেতনের ব্যবধান অনেকটাই কম হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—পদ, দায়িত্ব ও গ্রেডের পার্থক্য থাকলেও বেসিক বেতনে কেন মাত্র কয়েকশ টাকা ব্যবধান?

তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন—প্রশ্নে দেওয়া ছবির হিসাব অনুযায়ী ১১ থেকে ২০ গ্রেডে প্রতিটি ধাপে ঠিক ৫০০ টাকা পার্থক্য নয়। কোথাও ৩০০, কোথাও ৪০০, ৫০০, ৭০০ কিংবা ৯০০ টাকা ব্যবধান রয়েছে। অর্থাৎ মূল বিতর্কটি হলো, নিচের ১০টি গ্রেডের মধ্যে বেতন ব্যবধান সামগ্রিকভাবে খুব সংকুচিত।

সাম্প্রতিক প্রকাশিত পে-স্কেলসংক্রান্ত তথ্যেও ১১ থেকে ২০ গ্রেডের প্রস্তাবিত/প্রকাশিত বেতন কাঠামোতে এই কাছাকাছি ব্যবধানের চিত্র দেখা যায়।

ছবির হিসাব অনুযায়ী ১১–২০ গ্রেডে বেসিক কত?

প্রশ্নে দেওয়া চার্টের তথ্য বিশ্লেষণ করলে চিত্রটি দাঁড়ায়—

গ্রেড প্রস্তাবিত বেসিক পরবর্তী গ্রেডের সঙ্গে পার্থক্য
১১ ২৫,০০০ টাকা ৭০০ টাকা
১২ ২৪,৩০০ টাকা ৩০০ টাকা
১৩ ২৪,০০০ টাকা ৫০০ টাকা
১৪ ২৩,৫০০ টাকা ৭০০ টাকা
১৫ ২২,৮০০ টাকা ৯০০ টাকা
১৬ ২১,৯০০ টাকা ৫০০ টাকা
১৭ ২১,৪০০ টাকা ৪০০ টাকা
১৮ ২১,০০০ টাকা ৫০০ টাকা
১৯ ২০,৫০০ টাকা ৫০০ টাকা
২০ ২০,০০০ টাকা

অর্থাৎ ১১ থেকে ২০ গ্রেডের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন প্রস্তাবিত মূল বেতনের পার্থক্য মাত্র ৫ হাজার টাকা—২৫ হাজার টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা।

এখানেই মূল প্রশ্নটি সামনে আসে।

১১তম গ্রেড থেকে ২০তম গ্রেড—পুরো ১০ গ্রেডে পার্থক্য মাত্র ৫ হাজার!

একজন ১১তম গ্রেডের কর্মচারীর প্রস্তাবিত মূল বেতন ২৫ হাজার টাকা এবং ২০তম গ্রেডের কর্মচারীর মূল বেতন ২০ হাজার টাকা হলে দুই প্রান্তের ব্যবধান দাঁড়ায় মাত্র ৫ হাজার টাকা

অর্থাৎ ১১ থেকে ২০—এই পুরো ১০টি গ্রেডকে যদি একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়, তাহলে গড়ে প্রতি গ্রেডে ব্যবধান প্রায় ৫৫৬ টাকা

তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “১১ থেকে ২০ গ্রেডে ৫০০ টাকা ডিফারেন্স” বলা হলেও এটি প্রতিটি গ্রেডের ক্ষেত্রে হুবহু সঠিক নয়। বরং বলা বেশি নির্ভুল হবে—

১১ থেকে ২০ গ্রেডের মধ্যে এক গ্রেড থেকে পরের গ্রেডে মূল বেতনের ব্যবধান কয়েকশ টাকা; পুরো ১০ গ্রেডে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেসিকের পার্থক্য ৫ হাজার টাকা।

সবচেয়ে কম ব্যবধান ১২ ও ১৩ গ্রেডে

চার্টের সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো ১২তম ও ১৩তম গ্রেডের ব্যবধান মাত্র ৩০০ টাকা।

১২তম গ্রেডের প্রস্তাবিত বেসিক ২৪ হাজার ৩০০ টাকা।
১৩তম গ্রেডের প্রস্তাবিত বেসিক ২৪ হাজার টাকা।

অর্থাৎ মাত্র ৩০০ টাকা ব্যবধান।

একইভাবে—

  • ১৩ ও ১৪ গ্রেডে ব্যবধান ৫০০ টাকা
  • ১৪ ও ১৫ গ্রেডে ৭০০ টাকা
  • ১৫ ও ১৬ গ্রেডে ৯০০ টাকা
  • ১৬ ও ১৭ গ্রেডে ৫০০ টাকা
  • ১৭ ও ১৮ গ্রেডে ৪০০ টাকা
  • ১৮ ও ১৯ গ্রেডে ৫০০ টাকা
  • ১৯ ও ২০ গ্রেডে ৫০০ টাকা

ফলে দেখা যাচ্ছে, নিচের দিকের গ্রেডগুলোতে গ্রেড পরিবর্তনের সঙ্গে মূল বেতনের ব্যবধান খুব বেশি বাড়ছে না।

তাহলে কি এটি বেতন বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ?

এখানে বিষয়টি দুইভাবে দেখা যায়।

একদিকে, নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন গ্রেডের বেতন বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে প্রায় ২০ হাজার টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ মূল বেতনের অনুপাত প্রায় ১:৮ করার কথা বলা হয়েছে।

অন্যদিকে, এক গ্রেড থেকে আরেক গ্রেডে আর্থিক পার্থক্য খুব কম হওয়ায় নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—একজন কর্মচারী পদোন্নতি পেয়ে উপরের গ্রেডে গেলে তার মূল বেতনে প্রত্যাশিত আর্থিক সুবিধা কতটা থাকবে?

এটাই মূল বিতর্ক।

পদোন্নতির ক্ষেত্রে সমস্যা কোথায়?

ধরা যাক, একজন কর্মচারী ১৩তম গ্রেড থেকে ১২তম গ্রেডে পদোন্নতি পেলেন।

ছবির হিসাব অনুযায়ী তার বেসিক—

২৪,০০০ টাকা → ২৪,৩০০ টাকা

অর্থাৎ মূল বেতন বাড়ল মাত্র ৩০০ টাকা

আবার ১৯তম থেকে ১৮তম গ্রেডে গেলে—

২০,৫০০ টাকা → ২১,০০০ টাকা

বাড়ছে মাত্র ৫০০ টাকা

অবশ্য বাস্তবে পদোন্নতির সময় বেতন ফিক্সেশন, ইনক্রিমেন্ট, সংরক্ষিত বেতন, টাইম স্কেল/উচ্চতর গ্রেডসহ অন্যান্য বিধান থাকলে প্রকৃত আর্থিক সুবিধা শুধু এই দুই সংখ্যার ব্যবধান দিয়ে নির্ধারিত হবে না। তাই গ্রেডের বেসিক পার্থক্যকে সরাসরি পদোন্নতির পর হাতে পাওয়া মোট বেতন হিসেবে গণনা করা ঠিক হবে না।

১১তম গ্রেডের সঙ্গে ২০তম গ্রেডের পার্থক্য কত?

এখানেও হিসাবটি গুরুত্বপূর্ণ।

১১তম গ্রেড: ২৫,০০০ টাকা
২০তম গ্রেড: ২০,০০০ টাকা

পার্থক্য: ৫,০০০ টাকা।

অর্থাৎ ১০টি গ্রেডের মধ্যে পুরো বেতনসীমা মাত্র ৫ হাজার টাকার মধ্যে রাখা হয়েছে।

এ কারণে কর্মচারীদের একটি অংশের মধ্যে প্রশ্ন উঠতে পারে—যদি গ্রেডের সংখ্যা ১০টি থাকে, তাহলে গ্রেডভেদে বেতন কাঠামো এত কাছাকাছি কেন?

অন্যদিকে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিকোণ থেকে এর যুক্তি হতে পারে, নিচের গ্রেডগুলোর বেতনকে তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি এনে নিম্নআয়ের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার চাপ কমানো এবং সর্বোচ্চ-সর্বনিম্ন বেতনের বৈষম্য কমানো।

১ থেকে ১০ গ্রেডের সঙ্গে তুলনা করলেই পার্থক্য স্পষ্ট

ছবির উপরের অংশের হিসাব অনুযায়ী ১ থেকে ১০ গ্রেডে ব্যবধান তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

যেমন—

১ম গ্রেড: ১,৬০,০০০ টাকা
১০ম গ্রেড: ৩২,০০০ টাকা

অর্থাৎ ১ থেকে ১০ গ্রেডেই বেতনের পরিসর অনেক বড়।

অন্যদিকে—

১১তম গ্রেড: ২৫,০০০ টাকা
২০তম গ্রেড: ২০,০০০ টাকা।

এখানে পুরো ১০ গ্রেডে ব্যবধান মাত্র ৫ হাজার টাকা।

এই তুলনাটিই পে-স্কেলের কাঠামো নিয়ে সবচেয়ে বড় আলোচনার জায়গা তৈরি করছে।

কর্মচারীদের জন্য এর বাস্তব অর্থ কী?

মূল বেতন ছাড়াও সরকারি কর্মচারীদের মোট বেতন নির্ধারণে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত, উৎসব ভাতা এবং অন্যান্য প্রাপ্যতা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে শুধু বেসিকের ৩০০ বা ৫০০ টাকা পার্থক্য দেখেই একজন কর্মচারীর মোট বেতন কত হবে—তা বলা যাবে না।

তবে মূল বেতন ভবিষ্যতের ইনক্রিমেন্ট, পেনশনযোগ্য বেতন ও বিভিন্ন সুবিধার হিসাবেও গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় গ্রেডভিত্তিক বেসিকের ব্যবধান দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্ব বহন করে।

এ কারণেই ১১–২০ গ্রেডের কর্মচারীদের কাছে প্রশ্নটি শুধু বর্তমান মাসের বেতন বৃদ্ধির নয়; বরং ক্যারিয়ারে এক গ্রেড থেকে অন্য গ্রেডে যাওয়ার আর্থিক মূল্য কতটা থাকবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ আপডেট

এখানে আরেকটি বিষয় পাঠকদের মনে রাখা জরুরি। প্রশ্নে দেওয়া ছবিটি নিজেই “প্রস্তাবিত পে স্কেল–২০২৬” হিসেবে উপস্থাপিত। পে-স্কেল নিয়ে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে পর্যালোচনা ও অনুমোদনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, নবম জাতীয় বেতন স্কেল মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেয়েছে এবং ১২ থেকে ২০তম গ্রেডে বৃদ্ধির হার ১১৫ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

তাই ছবির সংখ্যাগুলোকে চূড়ান্ত গেজেটের বিকল্প হিসেবে না দেখে প্রস্তাবিত কাঠামোর হিসাব হিসেবে উপস্থাপন করাই নিরাপদ।

শেষ কথা

সবচেয়ে সংক্ষিপ্তভাবে হিসাবটি হলো—

১১তম গ্রেড → ২৫,০০০ টাকা
২০তম গ্রেড → ২০,০০০ টাকা
মোট ব্যবধান → ৫,০০০ টাকা

আর প্রতিটি গ্রেডের ব্যবধান ৫০০ টাকা নয়; বরং ৩০০ থেকে ৯০০ টাকা পর্যন্ত ওঠানামা করছে

তাই “১১ থেকে ২০ গ্রেডে মাত্র ৫০০ টাকা ডিফারেন্স”—এটি আংশিকভাবে সত্য হলেও পুরোপুরি সঠিক নয়। সঠিক বক্তব্য হলো, ১১ থেকে ২০ গ্রেডের মধ্যে গ্রেডভেদে বেসিকের ব্যবধান অত্যন্ত কম এবং পুরো ১০ গ্রেডের সর্বোচ্চ-সর্বনিম্ন বেসিকের ব্যবধান মাত্র ৫ হাজার টাকা।

এ কারণেই নতুন পে-স্কেল নিয়ে আলোচনায় এখন শুধু “বেতন কত বাড়ল” নয়, বরং “এক গ্রেড থেকে আরেক গ্রেডে বেতনের যৌক্তিক পার্থক্য কত রাখা হলো”—এই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *